সারা দেশ যখন লোডশেডিং এ ধুঁকছে তখন বেশ স্বস্তিতেই আছেন হোসেনপুর আর ঘোপের মানুষ। কারণ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদরের হোসেনপুর এলাকায়। আর প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বাসা যশোর শহরের ঘোপ এলাকায়। লোডশেডিং সেখানে নেই বললেই চলে।
মন্ত্রীর আসন সিরাজগঞ্জে সদর ও কামারখন্দেও নেই লোডশেডিং। সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কামারখন্দ সাব-জোনাল অফিসে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. মুক্তার হোসেন চরচাকে বলেন, তাদের পিক আওয়ারের সাড়ে পাঁচ এবং অফ পিকে সাড়ে তিন মেগাওয়াটের পুরোটাই সরবরাহ পান তারা।
এই এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) ১-এ কোনো বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই বলে জানান পবিস-১ এর জেনারেল ম্যানেজার নুরুল হুদা। চরচাকে তিনি বলেন, তাদের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াটের প্রায় পুরোটাই তারা পাচ্ছেন। কিন্তু পাশের উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালীতে মানুষ লোডশেডিংয়ে যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। বেলকুচির স্থানীয় ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন, “লোডশেডিং-এর যন্ত্রণা সিরাজগঞ্জের দুই অংশের মানুষের দুই রকম হবে, এটা ঠিক নয়।”
উল্লাপাড়ার একজন সাবেক সরকারি কর্মমর্তা বলেন, “যেকোনো দিন লক্ষ্মীখোলার তাঁতকলের শ্রমিকদের মতো রাস্তায় নেমে যেতে পারে উল্লাপাড়ার সাধারণ মানুষ।”
গত জুন মাসের শেষে লক্ষ্মীখোলা আর রায়গঞ্জের তাঁতকল মালিক ও শ্রমিকেরা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেছে।
অন্যদিকে যশোরের ঘোপ শুধু নয়; পুরো শহরের মানুষই বিদ্যুৎ নিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়, বিশেষ করে গ্রামের তুলনায় অনেকটাই স্বস্তিতে আছেন। যশোর সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওজোপাডিকো। সেখানকার একজন কর্মকর্তা জানান, দৈনিক ৬০ মেগাওয়াট চাহিদার পুরোটাই পাচ্ছে তারা। কোনো লোডশেডিং করতে হচ্ছে না। শহরের অন্য অংশে সেনানিবাস, বিমানঘাঁটি, বিজিবি, সফটওয়্যার পার্ক এলাকায়ও নেই লোডশেডিং-এর ঝক্কি। সেখানে ৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে গড়ে ৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ মিলছে, নির্ধারিত লোডশেডিং নেই।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ আবাসিক এলাকার একটি অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তারাও বলছেন, অন্যান্য জেলার চেয়ে তাদের সরবরাহ ভালো।
কিন্তু শহরের বাইরে পল্লী বিদুৎ-২ এর অবস্থা অনেকটাই বিপরীত। নওয়াপাড়া শিল্প এলাকা হওয়ার পরও সেখানে চাহিদার ৩৫-৪০% পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে জানান পবিস-২ এর একজন কমকর্তা।
সিরাজগঞ্জের হোসেনপুর কিংবা যশোরের ঘোপ আবার শহুরে বিতরণ সংস্থার নেসকো, ওজোপাডিকোর আওতায় থাকার কারণেও লোডশেডিং কম হতে পারে বলে মনে করেন বিতরণ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্টরা।
কোম্পানিগুলো সাধারণত গ্রামীণ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চেয়ে ভালো সরবরাহ পায়।
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিন ছিল বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য আগের কয়েকদিনের তুলনায় অনেকটাই স্বস্তির। এদিন সপ্তাহজুড়ে চলা আড়াই থেকে সাড়ে ৩ হাজার লোডশেডিং ১৯০ মেগাওয়াটে নেমে আছে। খুলনা অঞ্চলে ২৭ মেগাওয়াট, বরিশাল অঞ্চলে ৩৯ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা দেয়। এমন স্বস্তির দিনও পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ দিন-রাত লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
সমিতির একজন কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, ওই দিন ৭৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছেন তারা। অর্থাৎ, ভালো দিনেও ২৩ মেগাওয়াট বা ২৯ শতাংশ ঘাটতি সামাল দিতে হয় তাদের। ওই দিন খুলনার বিতরণ সংস্থা ওজোপাডিকো ছিল অনেকটাই নির্ভার।
চলতি গরমের মৌসুমে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো কতটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তা বোঝা যায় গত ১২ আগস্ট দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জনরোষ ও স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়ায়।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম চরচাকে বলেন, “চাহিদা পূরণে ঘাটতি হলে তা প্রথমে গ্রামে চাপানো হয়–এটি সব সরকারের আমলেই ঘটে আসছে, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্য দূর করার উপায় খুঁজে বের করা উচিৎ বিদ্যুৎ বিভাগের।”