ট্রাম্প প্রশাসন ও ভেনেজুয়েলার মধ্যকার প্রস্তাবিত তেল চুক্তিটিকে কঠোরভাবে পর্যালোচনা করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসি। পত্রিকাটির জিওইকোনমিক্স ও জ্বালানি বিষয়ক সিনিয়র স্টাফ রাইটার কিথ জনসন একে অবাস্তব ও ক্রুটিপূর্ণ উদ্যোগ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখক ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ এবং উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী বাসনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন।
হোয়াইট হাউসের দাবি অনুযায়ী, এই সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে। এই তেলের মূল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন রিফাইনারিগুলোর জন্য কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমানো এবং ট্রাম্প ও তার পূর্বসূরিদের আমলে খালি হয়ে যাওয়া স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ পুনরায় পূর্ণ করা। কিন্তু কিথ জনসনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবে অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, আইনি সমস্যায় জর্জরিত এবং কারিগরিভাবে অবাস্তব।
চুক্তির প্রেক্ষাপট ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
এই চুক্তির পটভূমি গঠিত হয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান এবং দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা থেকে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইরাকের তেল হস্তগত না করতে পারার জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করে আসছিলেন এবং ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তিনি সেই আক্ষেপ দূর করার চেষ্টা করছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই বিশাল ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক তেল কোম্পানিকে বেছে না নিয়ে বার্বাডোজ-ভিত্তিক একটি তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠান ‘নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স’-কে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছে।
কোম্পানিটি ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় দ্বিতীয় বৃহত্তম অপারেটর হলেও এর প্রধান নির্বাহী হলেন ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেজান্দ্রো বেটানকোর্ট। তিনি কারাকাস ও ওয়াশিংটন উভয় দরবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে ভেনেজুয়েলা, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের নানা অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছে। যদিও তার আইনি দল দাবি করেছে যে, বেটানকোর্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আদালতে অপরাধ প্রমাণিত বা চার্জ গঠিত হয়নি। তবুও এমন একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই জাতীয় চুক্তি সম্পাদন মার্কিন নীতির স্বচ্ছতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আইনি জটিলতা ও সার্বিক বৈধতার সংকট
ফরেন পলিসির এই নিবন্ধে চুক্তির বৈধতা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ, যিনি সাবেক কর্তৃত্ববাদী শাসক নিকোলাস মাদুরোর উত্তরসূরি—ট্রাম্পের মতে অত্যন্ত সম্মানিত হলেও, তিনি কোনো আইনানুগ নির্বাচিত সরকারের বৈধ প্রধান নন। এর ফলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলায় যদি কোনো গণতান্ত্রিক বা নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে তারা এই চুক্তি বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে। এমন অনিশ্চয়তা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ও বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলার সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য এবং বর্তমান সরকারের সমালোচক পেড্রো বুরেলির মতে, যে ডেলসি রদ্রিগেজকে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল করেছিল, তাকেই আবার ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখে তার সাথে চুক্তি করা ট্রাম্পের একটি কৌশলগত ভুল বা মূল পাপ।
আইনি পর্যালোচনায় আরও কিছু গুরুতর অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে, এই চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল ক্ষেত্রগুলো ১০০ বছরের জন্য ইজারা পাবে এবং সেগুলোর মালিকানা অর্জন করবে। অথচ ভেনেজুয়েলার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো বিদেশি সংস্থাকে ২৫ বছরের বেশি সময়ের জন্য তেল উত্তোলনের ইজারা দেওয়া সম্ভব নয়। উপরন্তু, ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের মালিকানা রাষ্ট্রীয় সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। মার্কিন দাবির মুখে ডেলসি রদ্রিগেজ নিজেও স্পষ্ট করতে বাধ্য হয়েছেন যে দেশের ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ সম্পূর্ণভাবে ভেনেজুয়েলার মালিকানাধীন থাকবে।
তাছাড়া, বিগত দিনে হুগো চাভেজ বা মাদুরোর আমলেও তেল ব্লকের জন্য যেভাবে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র বা নিলাম আহ্বান করা হতো, এবার সেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নিলাম করা হলো না। ভেনেজুয়েলার আইনে যেকোনো যৌথ উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিভিএসএ-র সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। মার্কিন বা আন্তর্জাতিক অন্য কোনো বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের এককভাবে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। পেড্রো বুরেলির ভাষায়, এটি ১৯৯০-এর দশকের বরিস ইয়েলৎসিনের আমলের রাশিয়াতে প্রচলিত ক্রনি-অয়েল পলিটিক্সের মতো বিশৃঙ্খল ও নিয়মবহির্ভূত একটি প্রক্রিয়া।
উৎপাদন ও ভূগর্ভস্থ রিজার্ভ সম্পর্কিত কারিগরি বাস্তবতা
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ১৭টি তেল ব্লকে খনন কাজ চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক ব্লক ওরিনোকো অঞ্চলের অত্যন্ত ভারী ও ঘন তেলের খনিতে অবস্থিত এবং বাকি অংশ মারাকাইবো অঞ্চলের তুলনামূলক হালকা তেল ক্ষেত্রে অবস্থিত। উভয় ক্ষেত্রেই খনিগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে বিশাল পরিমাণ মূলধনের প্রয়োজন। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিভ্রম তৈরি হয়েছে তেলের মজুত নিয়ে। ট্রাম্প যে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর অধিকার দাবির কথা বলছেন, তা এক অবাস্তব উত্তোলন হারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। হুগো চাভেজের আমলে ভেনেজুয়েলা সরকারের নির্দেশে তেলের রিকভারি রেট ২০ শতাংশ ধরা হলেও বাস্তবে সেখানকার খনিগুলোর প্রযুক্তিগত উত্তোলন হার মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি নয়।
উৎপাদন বৃদ্ধি ও আর্থিক মূলধনের হিসাবও বেশ জটিল। ডেলসি রদ্রিগেজ নিজে স্বীকার করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান দৈনিক ১১ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনকে মাত্র ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতেই অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন—যে হিসাব ট্রাম্প প্রশাসনও গ্রহণ করেছে। অথচ মাদুরোর পতনের পর বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন যে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা গেলে দেশটির উৎপাদন সমাজতন্ত্র ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পূর্ববর্তী স্তর অর্থাৎ দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। সময়ের সাথে সাথে উৎপাদন প্রত্যাশা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং খরচের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার সেন্টারের সাবেক নির্বাহী লুইস পাচেকোর মতে, ১০০ বছরের ইজারা, রিজার্ভের স্বত্ব লাভ এবং একক নিয়ন্ত্রণের এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও সস্তা রাজনৈতিক প্রচার মাত্র। কারণ মার্কিন মেরিন সেনারা কখনো তেল উৎপাদন করতে পারে না, এর জন্য বিশাল টেকনিক্যাল ও কৌশলগত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজার ও কৌশলগত রিজার্ভের ওপর প্রভাব
কিথ জনসনের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই চুক্তি মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দিতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পেট্রোল ও গ্যাসের দাম কমানো বা মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ-এর খালি হয়ে যাওয়া সল্ট ক্যাভার্ন বা গুদামগুলো পূর্ণ করার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা এই চুক্তির মাধ্যমে পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল উত্তোলন, তা মার্কিন রিফাইনারিগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারে সরবরাহ করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির ও দীর্ঘমেয়াদি। চলতি বছর বা আগামী বছরের মধ্যে মার্কিন পাম্পগুলোতে তেলের দাম কমার কোনো যৌক্তিক সম্ভাবনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ এই চুক্তির স্থায়িত্বকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মার্কিন হস্তক্ষেপের পর থেকেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে প্রতি কয়েক বছর পর পর জাতীয়করণ, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন কিংবা বিদেশী নির্বাহীদের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৬ সালের পর থেকে কোনো ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্টের পুরো মেয়াদজুড়েও কোনো বিদেশি কোম্পানির চুক্তি টিকে থাকেনি।
এই উচ্চ ঝুঁকির কারণে শেভরন ব্যতীত বড় বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে নতুন করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বড় কোম্পানিগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলেই ট্রাম্প প্রশাসন বাধ্য হয়ে এনএবিইপির মতো ছোট ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছে।
কিথ জনসনের এই নিবন্ধটি প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বিশ্ব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ তেল চুক্তি’ আদতে একটি অকার্যকর ও বিভ্রান্তিকর উদ্যোগ। আইনি ভিত্তিহীনতা, অবাস্তব রিকভারি রেটের হিসাব, প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব এবং দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই পরিকল্পনা থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ঐতিহাসিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই ভেনেজুয়েলা তেল নীতি কেবল একটি রাজনৈতিক ফাঁপা বুলি ও স্বল্পমেয়াদি প্রচারণার বেশি কিছু নয়।