সংকটে পড়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিতে হিড়িক পড়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। টাকা ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরুর মাত্র তিন দিনেই প্রায় ৩৭ হাজার গ্রাহক আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ফেরত চেয়েছেন আমানতকারীরা। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, যত আবেদনই জমা পড়ুক না কেন, এতে কোনো সমস্যা হবে না। গ্রাহকের আমানত ফেরত দেওয়ার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে ভাষ্য ব্যাংকের।
তবে, টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না অনেক গ্রাহক। অনেকে টাকা তোলার আবেদন করলেও ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা গ্রাহকদের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মূল টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় বাড়ছে গ্রাহকদের ভিড়। বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের তারল্যচাপ সৃষ্টি হয়নি বলে দাবি করেছেন ব্যাংকটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবেদুর রহমান সিকদার ।চরচাকে তিনি জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার আবেদন জমা হয়েছে। এসব আবেদনে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা তুলতে চেয়েছেন গ্রাহকরা। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। তবে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি আছে ব্যাংকের। তাই কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের আশ্বাসে আস্থা আনতে পারছেন না গ্রাহকরা। নাজিম উদ্দিন নামের একজন গ্রাহক চরচাকে বলেন, “টাকা তোলার জন্য আমি ১ তারিখেই আবেদন করেছি। তারা বলেছে, ৭ তারিখ থেকে টাকা দেওয়া শুরু করবে। টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি না যে ব্যাংক আসলেই আমাদের টাকা দিতে চায়।”
দীর্ঘ অপেক্ষার পর টাকা ফেরতের সুযোগ
দীর্ঘ সময় ধরে আমানত তুলতে না পারায় পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সঞ্চয়, মেয়াদী আমানত ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের অর্থ আটকে থাকায় অনেক গ্রাহককে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। গত কয়েক মাসে এসব ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় টাকা উত্তোলনের দাবিতে গ্রাহকরা বিক্ষোভও করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৫ আগস্ট সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীদের জন্য টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান ও এমডি আবেদুর রহমান সিকদারের বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান তখন ঘোষণা দেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা নিজেদের হিসাবের প্রয়োজন অনুযায়ী মূল টাকা তুলতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের পর প্রথম দিনেই প্রায় ১৮ হাজার গ্রাহক ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। পর দিন আবেদনকারীর সংখ্যা আরও বাড়ে। তিন দিনে এসে মোট আবেদন প্রায় ৩৭ হাজারে পৌঁছায়।
রাকিবুর ইসলাম নামের একজন গ্রাহক চরচাকে বলেন, “আমি প্রায় ১২ বছর ধরে ফাস্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে টাকা রেখেছি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করায় আমি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। তবে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই যে টাকা পাব কি না। কারণ এর আগেও অনেকবার টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু দেয়নি। তাই আবেদন করেছি, টাকা হাতে পেলেই নিশ্চিত হব যে সরকার টাকা ফেরত দিতে চায়।”
মূল টাকা তোলা যাবে, মুনাফার হিসাব আলাদা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যক্তি আমানতকারীরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব এবং মুদারাবা মেয়াদী আমানত থেকে মূল টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী তুলতে পারবেন। অর্থাৎ, গ্রাহকের প্রয়োজন যতটুকু, সে অনুযায়ী আমানতের মূল অংশ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে কেউ যদি একবারে নিজের পুরো আমানত তুলে নিয়ে হিসাবের নিষ্পত্তি করতে চান, তাহলে সেই অর্থের ওপর প্রাপ্য মুনাফা না নিয়ে মূল টাকা তুলে নিতে পারবেন। পুরো মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আবার কেউ যদি আংশিক অর্থ তুলে নেন, তাহলে অবশিষ্ট টাকার ওপর মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
মেয়াদী আমানতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম রাখা হয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই টাকা তুলে নিলে মূল অর্থ পাওয়া যাবে। তখন ওই অর্থের ওপর মুনাফা পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে, গ্রাহক যদি এখনই টাকা না তুলে হিসাব চালু রাখেন, তাহলে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া পাঁচ ব্যাংকের কাছে কোনো গ্রাহকের ঋণ বা আর্থিক দায় থাকলে আমানত ফেরতের আগে সেই পাওনা অর্থ সমন্বয় করা হবে।
অন্যদিকে, আমানতের মুনাফা থেকে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন করা হবে না বলে আগেই জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের মধ্যে এ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকায় বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানাতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ব্যাংক খাতের বড় পরীক্ষা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি নতুন ব্যাংক নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে এ ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে এখন যে অর্থ উত্তোলনের আবেদন আসছে, তা শুধু একটি ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেনের ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিপুল গ্রাহকের আস্থা কতটা ফিরেছে তারও একটি পরীক্ষা।
এদিকে পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক সংকটের গভীরতাও ছিল ব্যাপক। চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা যা মোট ঋণের প্রায় ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। এমন বিপুল খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতেই ব্যাংক পাঁচটিকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম, ২০২৫’-এর আওতায় এনে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম এবং পরবর্তী সংশোধনের তথ্য রয়েছে।
সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা
নতুন ব্যাংকটিকে দাঁড় করাতে বড় অঙ্কের মূলধন সহায়তাও দিয়েছে সরকার। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দিয়েছে। বাকি অংশ আমানতকারীদের জমার বিপরীতে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনের কাঠামোয় আনা হয়েছে।
একীভূতকরণের পর পাঁচ ব্যাংকের সব শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কও নতুন ব্যাংকের আওতায় এসেছে। পাঁচ ব্যাংকের মোট ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অংশ।
গত ১৬ জুলাই মো. আবেদুর রহমান সিকদার ব্যাংকটির এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসকদের পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামোর হাতে ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন ব্যাংকটিকে তফসিলি ব্যাংকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা। কারণ, বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তোলার আবেদন করলে ব্যাংকের তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হয়।
তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার বলছেন, “আবেদনের সংখ্যা বাড়লেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি। গ্রাহকের আবেদন অনুযায়ী অর্থের প্রয়োজনীয় জোগান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। টাকা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই এখন ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ।”
গ্রাহকদের উদ্দেশে তিনি ব্যাংকের সঙ্গে স্বাভাবিক লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। তার মতে, শুধু টাকা তুলতে পারা নয়, ব্যাংকের স্বাভাবিক আমানত গ্রহণ, অর্থ উত্তোলন এবং অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখতে পারাটাই হবে নতুন প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল পরীক্ষা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও এর আগে জানিয়েছিলেন, “আমানত ফেরতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করার প্রস্তুতি রয়েছে। গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থের চাহিদা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গ্রাহকদের একটি অংশ ইতোমধ্যে পুরো টাকা তুলে নেওয়ার আবেদন করলেও সবাই ব্যাংক ছাড়তে চাইছেন না। বিভিন্ন শাখায় এমন গ্রাহকও দেখা গেছে, যারা জরুরি প্রয়োজনের অর্থ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বাকি আমানত ব্যাংকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে একই সঙ্গে টাকা তোলার চাপ এবং ব্যাংকের প্রতি নতুন করে আস্থা তৈরির দুটি প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।
একজন আমানতকারীর ভাষায়, দীর্ঘদিন অর্থ আটকে থাকার পর এখন অন্তত টাকা ফেরত পাওয়ার একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আরিফ হোসেন খানের প্রত্যাশা, সরকারি মালিকানায় নতুন ব্যাংকটি যদি স্বচ্ছতা ও সুশাসনের সঙ্গে পরিচালিত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে।