এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতি পাঁচ শিশুর একজনের বেশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এক বছরে অন্তত একধরনের যৌন নিপীড়ন বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে শিশুদের যৌনধর্মী ছবি বা ভিডিও তৈরি করায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার এ চিত্র উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গবেষকরা ২১টি দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ২১ হাজার শিশুর ওপর জরিপ চালিয়েছেন। জরিপটি প্রথমে ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এবং পরে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে করা হয়। এছাড়া শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়া ১০০ জন তরুণের সঙ্গে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে ২১টি দেশের প্রায় ২ কোটি শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। আর এসব যৌন নিপীড়নের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিশু অনলাইনে তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন বিষয়বস্তু দেখতে পেয়েছে বা সেগুলো তাদের সামনে চলে এসেছে। ৯০ লাখ শিশুকে যৌন কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত আলাপচারিতায় জড়াতে বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি শেয়ার করতে চাপ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এ ধরনের নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হওয়া শিশুর সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই আরও কয়েক কোটি বেশি বলে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব দেশ থেকে তথ্য নিয়ে ইউনিসেফ এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেগুলো হলো– আর্মেনিয়া, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মন্টেনেগ্রো, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, নর্থ ম্যাসিডোনিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সার্বিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা ও ভিয়েতনাম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে এআই নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। যে ৯টি দেশ থেকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেসব দেশের প্রায় ১১ লাখ শিশু জানিয়েছে, তাদের ছবি ব্যবহার করে এআই দিয়ে যৌনধর্মী ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের শিকাররা অন্য শিশুদের তুলনায় আত্মহত্যার চিন্তা বা নিজের শরীরে আঘাত করার কথা প্রায় চার গুণ বেশিবার ভেবেছে। এ ছাড়া, তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রাও অন্য শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল এক বিবৃতিতে বলেন, এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের গভীর মানসিক ও আবেগগত সংকটের মধ্যে ফেলে। অনেক শিশু নীরবে কষ্ট ভোগ করে, সাহায্যের জন্য কোথায় যাবে, তা বুঝতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন নিপীড়ন
ইউনিসেফ বলেছে, যৌন নিপীড়নের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘটেছে। ফেসবুকে ৫০ শতাংশ, হোয়াটসঅ্যাপে ২৯ শতাংশ, ইনস্টাগ্রামে ২৪ শতাংশ, স্ন্যাপচ্যাটে ১৩ শতাংশ এবং টিকটকে ১২ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। আর ১৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে অনলাইন গেমিংয়ের ক্ষেত্রে।
মেটার এক মুখপাত্র কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, এই প্রতিবেদন তৈরিতে ২০২০ সালের আগের সময়ের জরিপও ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর তারা ইউনিসেফের সুপারিশ অনুযায়ী বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে কিশোরদের অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত রাখা এবং অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের কিশোরদের মেসেজ পাঠানো বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা রয়েছে।
মেটা বলেছে, প্রতিবেদনে নির্যাতনের নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। তবে শিশুদের যৌন শোষণ বন্ধে তারা কাজ চালিয়ে যাবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবে।
মেটা আরও বলেছে, তাদের মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপ একটি ব্যক্তিগত মেসেজিং সেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়। সেখানে কোনো পোস্ট বেশি বা কম মানুষের কাছে দেখানোর জন্য অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয় না। প্রথমবার কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার ফোন নম্বর বা সঠিক ইউজারনেম জানা প্রয়োজন।
আরেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ন্যাপচ্যাটের প্ল্যাটফর্ম সেফটির গ্লোবাল প্রধান জ্যাকলিন বোশেরের একটি ব্লগ পোস্টের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলেছে, আগাম শনাক্তকরণ, অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দেওয়া, ব্যবহারকারীদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থার (ফিচার) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে যৌন হয়রানি করে অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এদিকে, টিকটক কর্তৃপক্ষ বলেছে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় তারা বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু ফিচার ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা, ১৮ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট উন্মুক্ত না রাখা এবং সম্ভাব্য শিশু যৌন নিপীড়নকারী আচরণ শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার করা।
শিশুদের ওপর প্রভাব
ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু যৌন নিপীড়নের অর্ধেকেরও বেশি ঘটনায় শিশুটি আগে থেকে নিপীড়নকারী ব্যক্তিকে চিনত। তাদের মধ্যে ছিল বন্ধু, আত্মীয় বা প্রেমের সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিরা। অন্যদিকে, ৩৮ শতাংশ শিশু প্রথমবার অনলাইনে অপরাধীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
শিশু যৌন নিপীড়নের এসব ঘটনায় মাত্র ১ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে পুলিশ, সমাজকর্মী বা কোনো হেল্পলাইনে জানানো হয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইউনিসেফ বলেছে, শিশুদের ওপর এসব যৌন নির্যাতনের প্রভাব খুবই গুরুতর। অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা যৌন শোষণের শিকার হওয়া শিশুদের মধ্যে অন্য শিশুদের তুলনায় আত্মহত্যার প্রবণতা ও উদ্বেগও বেশি দেখা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেক্সিকো ও উত্তর মেসিডোনিয়ায় নির্যাতনের শিকার শিশুদের আত্মহত্যার চিন্তা বা এমন আচরণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় আট গুণেরও বেশি। আর পাকিস্তানে নিজেকে আঘাত করার ঝুঁকি গড়ের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি। এই নির্যাতনের প্রভাব শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কেও পড়ে।
ইউনিসেফ সরকার ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার, এআই-নির্মিত যৌনধর্মী কনটেন্টসহ (আধেয়) যৌন নিপীড়নের পরিবর্তিত ধরনগুলো মোকাবিলায় আইন হালনাগাদ করা এবং শিশু সুরক্ষা ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আরও উন্নত করার আহ্বান জানিয়েছে।