ads

২০৩০-এ এআই ডেটাসেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার হবে অকল্পনীয়

এ এইচ এম. বজলুর রহমান
এ এইচ এম. বজলুর রহমান
২০৩০-এ এআই ডেটাসেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার হবে অকল্পনীয়
ছবি: রয়টার্স

বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি ক্রমশ শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চিপ এখন যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ‘ঘাতক রোবট’ ইতিমধ্যেই প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী ও বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

আমরাই হয়তো সেই শেষ প্রজন্ম, যারা এখনো নির্ধারণ করতে পারে মানুষ ও যন্ত্র কোন শর্তে সহাবস্থান করবে। এআই যদি শক্তিশালী হতে চায়, তবে তাকে শাসনব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এআই যদি আস্থা অর্জন করতে চায়, তবে যারা এটি তৈরি করেন, তাদের জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। এআই যদি সত্যিই বৈশ্বিক হতে চায়, তবে তাকে ন্যায্য হতে হবে। আর এআই যদি ভবিষ্যতের সেবা করতে চায়, তবে সেই ভবিষ্যৎকেই গ্রাস করা চলবে না। আসুন, আমরা এমন এক এআই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি, যা হবে মানবতার হাতে নির্মিত, মানবতাকে সঙ্গে নিয়ে এবং সমগ্র মানবতার জন্য।

জেনেভায় জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে বক্তব্য দিতে গিয়ে মহাসচিব বিপ্লবী এই প্রযুক্তির সুযোগ থেকে এখনো বঞ্চিত বিশ্বের শতকোটি মানুষের জন্য এআইকে আরও সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক চুক্তি এমন হতে হবে, যা ‘বিশ্বের আস্থা অর্জনের যোগ্য’ এবং যেখানে সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে শিশুদের ডিজিটালভাবে তৈরি কারসাজি ও নির্যাতন থেকে রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে।

একই আহ্বানের প্রতিধ্বনি করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক এআইয়ের ‘অশুভ ব্যবহার’ মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ ডিপফেক যৌন প্রকৃতির এবং এর ৯৬ শতাংশের লক্ষ্য নারী ও কিশোরী।

ডিজিটাল ব্যবধান কমানো এআইয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের আরেকটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্বশিক্ষণক্ষম এই প্রযুক্তিতে নিশ্চিত প্রবেশাধিকার। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সব এআই ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালিত হওয়া উচিত বলে জোর দেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গুতেরেস বলেন, “এআই আমাদের অভিন্ন ভবিষ্যতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তবে সেই ভবিষ্যৎ এমন হতে হবে, যেখানে যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ এবং জবাবদিহিও করবে মানুষ।”

২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এআই নিয়ন্ত্রণের যে আহ্বান তিনি প্রথম জানিয়েছিলেন, জেনেভার সম্মেলনে সেই অবস্থানই আবার তুলে ধরেন গুতেরেস। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এআই মূলধারায় প্রবেশ করে অর্থনীতি ও সমাজে বিপ্লবী প্রভাব ফেলেছে। এর প্রভাব যেমন ইতিবাচক, তেমনি নেতিবাচকও।

এই বাস্তবতার আগেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই প্রযুক্তির জন্য নিয়ন্ত্রণ ও শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সোমবার জেনেভায় প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স অনুষ্ঠিত হয়।

এ বৈঠকে কোম্পানি, গবেষক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। রূপান্তরমূলক এই প্রযুক্তির কেন্দ্রে কীভাবে মানবতাকে রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দ্বিতীয় গ্লোবাল ডায়ালগ আগামী মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এআইবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের কো-চেয়ার ইয়োশুয়া বেঙ্গিও বলেন, প্রযুক্তিটির বিকাশের গতি শিগগিরই কমবে, এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, “অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলগুলো মানুষকে প্রতারণা করতে এবং কখন তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে, তা বুঝতে সক্ষম।”

এআই নিয়ন্ত্রণের সময়রেখা

২০১৭: এআই নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক এক আহ্বানে মহাসচিব গুতেরেস বিপ্লবী এই প্রযুক্তির ‘অসাধারণ’ সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তবে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, কর্মসংস্থান, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং ‘সমাজের মূল কাঠামোর’ ওপর এর প্রভাব নাটকীয় হতে পারে।

২০২৩: জাতিসংঘ মহাসচিবের এআইবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা সংস্থা স্বশিক্ষণক্ষম এই প্রযুক্তির জন্য বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

২০২৪: প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার এবং গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট এআই শাসনব্যবস্থার একটি বৈশ্বিক মডেল তৈরির ম্যান্ডেট দেয়।

জুন ২০২৬: জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সতর্ক করে বলে, এআই ‘নিজে থেকে অথবা ক্ষতিকর ব্যবহারকারীদের কারণে বিপর্যয়কর ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে’। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটি ‘বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া এবং সরকারের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা উভয়কেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে’।

৬–৭ জুলাই ২০২৬: জেনেভায় প্রথম জাতিসংঘ গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স এবং এআই ফর গুড সামিট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গুতেরেস বলেন, এ আয়োজনগুলোকে এখন বিশ্বকে সামনে এগোনোর ‘দিকনির্দেশনা দিতে হবে’।

‘মহান সমতা সৃষ্টিকারী’

সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং সবার মধ্যে বিস্তৃতভাবে ভাগ করে নেওয়া গেলে এআই ‘কয়েক দশকের উন্নয়নকে কয়েক বছরের মধ্যে সংকুচিত করতে পারে’ এবং ‘একবিংশ শতাব্দীর মহান সমতা সৃষ্টিকারী’ হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিনিধিদের জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।

তবে তা ঘটার আগে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা করতে হবে এবং আইনি দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, “দেশগুলো যখন কীভাবে ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে, ঝুঁকি পরিমাপ করা হবে এবং দায় নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে একমত হয়, তখন প্রযুক্তির সঙ্গে নিরাপত্তাও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তারা যখন একমত হতে পারে না, তখন অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিবিধানের খণ্ডিত ব্যবস্থা ব্যয় বাড়ায়, বিশ্বকে বিভক্ত করে এবং কাউকেই সুরক্ষা দেয় না।”

গুতেরেস বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো এআই শাসন চুক্তিতে শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি দেশগুলোর প্রতি একটি ‘এআই চাইল্ড সেফটি প্লেজ’ বা এআই শিশু সুরক্ষা অঙ্গীকার গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত এআইয়ের পরীক্ষাগারের প্রাণী কোনো শিশু হতে পারে না।’ মহাসচিব আরও বলেন, ‘কোনো ওষুধ নিরাপদ প্রমাণিত হওয়ার আগে আমরা তা শিশুর কাছে পৌঁছাতে দিই না। আমরা প্রতিটি খেলনা পরীক্ষা করি। অথচ এআই আমাদের শিশুদের কাছে পৌঁছে গেছে, তাদের শিক্ষা, বন্ধুত্ব এবং সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নের ভেতরে, আমরা কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই যে এটি তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে।’

শিশু সুরক্ষা অঙ্গীকারে কী থাকবে?

জাতিসংঘের শিশু সুরক্ষা অঙ্গীকার অনুযায়ী, এআই নির্মাতাদের প্রমাণ করতে হবে:

* প্রযুক্তিটি নিরাপদ: শিশুদের জন্য উন্মুক্ত কোনো এআই ব্যবস্থা শিশু-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া কোনো কোম্পানি চালু করতে পারবে না।

* যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা: কোনো কোম্পানি তার এআইকে শিশুদের যৌন ছবি তৈরি করতে দিতে পারবে না। প্রতিটি কোম্পানিকে এ ধরনের উপাদান শনাক্ত, রিপোর্ট করতে এবং সরিয়ে ফেলতে হবে।

* কোনো শিশু মানসিক কষ্ট বা সংকটের লক্ষণ দেখালে, ‘সিস্টেমটিকে থামতে হবে এবং তাকে প্রকৃত মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে’, বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গুতেরেস আরও বলেন, “কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তর কখনোই হতে পারে না, ‘অ্যালগরিদম এটি করেছে’।” মানবাধিকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এআই নিয়ন্ত্রণের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে জাতিসংঘ মহাসচিব জোর দিয়ে বলেন, মানবাধিকার নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না। তিনি বলেন, “এআই কখনোই মানুষের মর্যাদা কেড়ে নিতে বা বৈষম্যকে স্থায়ী করতে পারবে না। আর বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুলিশিংয়ের মতো প্রতিটি উচ্চঝুঁকির সিদ্ধান্তে যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে মানুষকে এবং জবাবদিহিও করতে হবে মানুষকেই।”

এআইয়ে সরকারি অর্থায়ন ‘হিসাবের সামান্য অংশ’

এআই খাতে আরও বেশি সরকারি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মহাসচিব উল্লেখ করেন, এআই অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারি সহায়তা ‘হিসাবের সামান্য অংশমাত্র’।

এই বৈষম্য কমাতে গুতেরেস ঘোষণা করেন, এআই সক্ষমতা উন্নয়নে জাতিসংঘ-সমর্থিত গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ফর এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন অন এআই ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রতিষ্ঠার তার উদ্যোগকে ২০টির বেশি দেশ সমর্থন জানিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ডিজিটাল বিভাজনকে এআই বিভাজনে শক্ত হয়ে যেতে দিতে পারি না। আর এআই বিভাজনকে উন্নয়নগত ব্যবধান, নিরাপত্তাগত ব্যবধান এবং সার্বভৌমত্বের ব্যবধানে পরিণত হতেও দিতে পারি না।”

স্বচ্ছতার আহ্বান

জাতিসংঘ মহাসচিব আবারও বিশ্বের বড় এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি তাদের প্রযুক্তির সম্পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব পরিমাপ এবং জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান। এর মধ্যে রয়েছে কার্বন, পানি এবং ভূমি ব্যবহারের হিসাব। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালনার অঙ্গীকার করার আহ্বান জানান তিনি।

গুতেরেস বলেন, “এআইকে হয়তো অদৃশ্য বা বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এর পরিবেশগত প্রভাব মোটেও অদৃশ্য নয়।” তিনি উল্লেখ করেন, ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।

তিনি আরও বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে, মাত্র পাঁচটি দেশ ছাড়া বিশ্বের সব দেশের চেয়ে তাদের ব্যবহার বেশি হবে। আর তারা যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে পারে, তা সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের পুরো এক বছরের পানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।” এ প্রসঙ্গে তিনি জাতিসংঘের এআই এনভায়রনমেন্টাল ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বও তুলে ধরেন।

সম্পর্কিত