বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে তাৎক্ষণিক সরকার পতনের আন্দোলন হিসেবে দেখছে না বিএনপি সরকার। তবে কর্মসূচিটিকে গুরুত্বহীনও মনে করছে না তারা। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে বরং লংমার্চকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট।
লংমার্চে বড় কোনো বাধা না দিয়ে সরকার এখন এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে সংসদকে বিরোধী দলের দাবি জানানোর উপযুক্ত জায়গা হিসেবে সামনে আনছে বিএনপি।
অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্য বলছে, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকার পাশাপাশি জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলনও প্রয়োজন। ছয় দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও এসেছে।
ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ শেষ হলেও এর রাজনৈতিক হিসাব শেষ হয়নি। বরং এখন প্রশ্ন-এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এটি ছয় দফার মধ্যে থাকে, নাকি সরকার পতনের এক দফায় গড়ায়।
‘সংসদে আসুন’, বিএনপির পাল্টা বার্তা
লংমার্চের বিরুদ্ধে বিএনপির সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য এসেছে সংসদকে সামনে রেখে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, “জাতীয় সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় সংসদীয় বিতর্ককে রাজপথে নিয়ে গিয়ে লংমার্চ করা সাধারণ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বিরোধী দলকে সংসদে এসে সরকারের নীতির সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “লংমার্চ নিয়ে সরকারের আলাদা করে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সরকার জনগণের ভোটে দায়িত্ব নিয়ে সারাক্ষণ জনগণের কথা চিন্তা করছে এবং দেশের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধানে কাজ করছে। আমাদের রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, “বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণের কথা বলা এবং দেশের সমস্যাগুলো সমাধানের পথ দেখানো। সেই কাজটি সংসদের ভেতরেই আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। সংসদে এসে তারা সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরতে পারে, সমস্যাগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে এবং কীভাবে সেসব সমস্যা সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে। সেটিই একটি কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
সরকারের এই মন্ত্রী বলেন, “তা না করে মাত্র কয়েক মাসের মাথায় রাজপথে লংমার্চ, আন্দোলন বা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনজীবনে ভোগান্তি তৈরি করা কোনোভাবেই ভালো দেখায় না। সরকার বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান করে। তবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সমস্যা সমাধান করা, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো নয়।”
সরকারের বিভিন্ন মহলের এই বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবে এর অর্থ হলো–বিএনপি লংমার্চকে সরাসরি সংঘাতের কর্মসূচি হিসেবে মোকাবিলা করতে চাইছে না। বরং ‘সংসদ বনাম রাজপথ’ এই বিতর্ক সামনে এনে কর্মসূচিটির রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছে।
জনদুর্ভোগ ও জ্বালানি অপচয়ের প্রশ্ন
লংমার্চকে ঘিরে সরকারের আরেকটি পাল্টা বয়ান হলো জনভোগান্তি। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেছেন, “লংমার্চের কারণে সড়ক বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে।” তার দাবি, এতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। কারণ, ১১ দলের ছয় দফার অন্যতম বিষয় জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট।
বিরোধী জোট যেখানে বলছে, সংকটের প্রতিবাদেই তারা রাজপথে এসেছে, সেখানে সরকারের পাল্টা বক্তব্য হলো–সংকটের সময় লংমার্চ করে আরও জ্বালানি ব্যয় ও জনদুর্ভোগ তৈরি করা হচ্ছে।
সরকার কি লংমার্চকে হুমকি হিসেবে দেখছে?
সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরোধী দলের এই কর্মসূচিগুলোকে এখনই সরাসরি সরকার পতনের হুমকি হিসেবে দেখছেন না তারা। বরং বর্তমান কর্মসূচির চেয়ে পরবর্তী কর্মসূচির গতিপথ নিয়ে বেশি উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ, ১১ দলের কর্মসূচি এখানেই শেষ নয়। সামনে আরও লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে।
তাদের মতে, প্রথম লংমার্চে অংশগ্রহণ কতটা ছিল, তার চেয়ে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণের ধরন।
বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি
সরকারের একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তাদের কর্মসূচি যদি দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সরকার সেটিকে বিরোধী দলের নিয়মিত কর্মসূচি হিসেবে মোকাবিলা করতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লে রাজনৈতিক হিসাব বদলাতে পারে।”
ছয় দফা থেকে এক দফার শঙ্কা
এই লংমার্চ থেকে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত এসেছে ১১ দলের নেতাদের বক্তব্যে।
লংমার্চের আগে ও সমাপনী কর্মসূচিতে জোটের নেতারা বলেছেন, ছয় দফা দাবি না মানলে আন্দোলন এক দফায় রূপ নিতে পারে। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সরাসরি সরকার পতনের এক দফার কথা বলেছেন।
জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও বলেছেন, ছয় দফা বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। এখানেই সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ছয় দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের মতো বিষয়।
এসব নিয়ে সরকারকে আলাদাভাবে রাজনৈতিক জবাব দিতে হয়। কিন্তু দাবিগুলো যদি এক দফা–সরকারের পদত্যাগে গিয়ে ঠেকে, তখন আন্দোলনের চরিত্রই বদলে যাবে।
এই আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা চরচাকে বলেন, “এখনই সেই আশঙ্কা দেখছি–এমনটা ঠিক না। তবে রাজনীতিতে নানা ইকুয়েশন থাকে। ছোট বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিয়েই পর্যালোচনা করা উচিত। জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া এই সরকার দেশের স্বার্থে যেকোনো অরাজকতা মোকাবিলায় প্রস্তুত।”
এখন সরকারের কৌশল কী?
এখন পর্যন্ত সরকারের অবস্থানকে বলা যায়–প্রশাসনিক বাধার বদলে রাজনৈতিক মোকাবিলা।
কর্মসূচি ঠেকানোর বদলে বিএনপি প্রশ্ন তুলছে এর জনভিত্তি নিয়ে। সংসদকে বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে সামনে আনছে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ, জ্বালানি অপচয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় সামনে এনে মানুষের মধ্যে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
অন্যদিকে ১১ দলও পিছু হটার সংকেত দিচ্ছে না। বরং তাদের বক্তব্যে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি স্পষ্ট।
ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি বরং ১১ দলের ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রথম বড় পরীক্ষা।
সরকারের জন্য এখন মূল প্রশ্ন লংমার্চ কত বড় হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো–এর পরের কর্মসূচিগুলো কত বড় হয়।
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে কি না, দাবিগুলো নিয়ে জনমত তৈরি হয় কি না এবং ছয় দফা শেষ পর্যন্ত এক দফায় রূপ নেয় কি না–এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ১১ দলের লংমার্চ বিএনপি সরকারের জন্য নিয়মিত বিরোধী কর্মসূচি হয়েিণত হবে।”সরকার কি লংমার্চকে হুমকি হিসেবে দেখছে?
সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরোধী দলের এই কর্মসূচিগুলোকে এখনই সরাসরি সরকার পতনের হুমকি হিসেবে দেখছেন না তারা। বরং বর্তমান কর্মসূচির চেয়ে পরবর্তী কর্মসূচির গতিপথ নিয়ে বেশি উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ, ১১ দলের কর্মসূচি এখানেই শেষ নয়। সামনে আরও লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে।
তাদের মতে, প্রথম লংমার্চে অংশগ্রহণ কতটা ছিল, তার চেয়ে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণের ধরন।
সরকারের একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তাদের কর্মসূচি যদি দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সরকার সেটিকে বিরোধী দলের নিয়মিত কর্মসূচি হিসেবে মোকাবিলা করতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লে রাজনৈতিক হিসাব বদলাতে পারে।”
ছয় দফা থেকে এক দফার শঙ্কা
এই লংমার্চ থেকে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত এসেছে ১১ দলের নেতাদের বক্তব্যে।
বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে বক্তব্য দেন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
লংমার্চের আগে ও সমাপনী কর্মসূচিতে জোটের নেতারা বলেছেন, ছয় দফা দাবি না মানলে আন্দোলন এক দফায় রূপ নিতে পারে। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সরাসরি সরকার পতনের এক দফার কথা বলেছেন।
জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও বলেছেন, ছয় দফা বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। এখানেই সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ছয় দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের মতো বিষয়।
এসব নিয়ে সরকারকে আলাদাভাবে রাজনৈতিক জবাব দিতে হয়। কিন্তু দাবিগুলো যদি এক দফা–সরকারের পদত্যাগে গিয়ে ঠেকে, তখন আন্দোলনের চরিত্রই বদলে যাবে।
এখন সরকারের কৌশল কী?
এখন পর্যন্ত সরকারের অবস্থানকে বলা যায়–প্রশাসনিক বাধার বদলে রাজনৈতিক মোকাবিলা।
কর্মসূচি ঠেকানোর বদলে বিএনপি প্রশ্ন তুলছে এর জনভিত্তি নিয়ে। সংসদকে বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে সামনে আনছে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ, জ্বালানি অপচয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় সামনে এনে মানুষের মধ্যে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
অন্যদিকে ১১ দলও পিছু হটার সংকেত দিচ্ছে না। বরং তাদের বক্তব্যে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি স্পষ্ট।
ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি বরং ১১ দলের ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রথম বড় পরীক্ষা।
সরকারের জন্য এখন মূল প্রশ্ন লংমার্চ কত বড় হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো–এর পরের কর্মসূচিগুলো কত বড় হয়।
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে কি না, দাবিগুলো নিয়ে জনমত তৈরি হয় কি না এবং ছয় দফা শেষ পর্যন্ত এক দফায় রূপ নেয় কি না–এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ১১ দলের লংমার্চ বিএনপি সরকারের জন্য নিয়মিত বিরোধী কর্মসূচি হয়ে থাকবে, নাকি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে।”