
‘ট্রাম্পিজম’ যেভাবে বিশ্ব ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এমন কিছু আদর্শের দাপট দেখা গেছে, যেগুলো থেকেই অনেক বহুপাক্ষিক সংস্থা আর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল।
সব ভাষাতেই বুলি আছে, সেই সাথে গালিও আছে। গালি আর বুলি অনেকটা পাশাপাশি হাঁটে। কোনো ভাষা কেবলই ‘মার্জিত’ রূপ নিয়ে বাঁচে না। কিন্তু মানুষ কোন রূপটি বেশি গ্রহণ করবে, সেটাই নির্ধারণ করে দেয় কীসের চর্চা বেশি হবে, সেই বিষয়টি।
আমাদের দেশে এখন গালি নিয়ে আলোচনা একটু বেশি হচ্ছে। বিষয়টা এমন না যে, এই প্রথম বাংলা গালি সামনে এল। গালির ব্যবহার আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে গত কয়েক বছরে ‘ইনফরমাল’ থেকে ‘ফরমাল’ আলাপে গালির আতিশয্য একটু বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। জনপরিসরে বক্তব্য, বক্তৃতা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাস–সবখানেই তাই গালির বাজার বেশ রমরমা এখন। এই ‘রমরমা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হচ্ছে, কারণ গালি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ইচ্ছা করেই, উদ্দেশ্যমূলকভাবে উচ্চস্বরে, এবং কখনও কখনও অহেতুক হিসেবেও।
তবে বিশ্বজুড়েই গালি আসলে অক্ষমের ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই পরিচিত। এখানে অক্ষম বলতে আসলে তাদেরকেই বোঝানো হয়, যারা আসলে ‘হ্যাডম’ দেখাতে পারেন না। এদের হাতে ক্ষমতা দণ্ড থাকে না বা এর আশীর্বাদপুষ্টও তারা নন। কিন্তু ক্ষোভ তাদের মধ্যে জমা থাকে। সেটিরই প্রকাশ ঘটে গালির মাধ্যমে। ক্ষোভ এমন এক বস্তু, যারা উদগীরণ ঘটেই, মাধ্যম এবার যাই হোক না কেন।
যে কারণে আমাদের দেশ এখন গালি নিয়ে সরগরম, সেটিতে এবার যাওয়া যাক। সম্প্রতি ফেসবুকে একজন কলেজশিক্ষার্থী গালি দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, বিদ্যুতের বাড়তি বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারকে নিয়ে ‘কটূক্তির’ অভিযোগ ওঠে গাজীপুরের সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয় কলেজের একজন শিক্ষার্থী। ২৫ বছর বয়সী সিফাত আব্দুল্লাহ নগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার তিনি ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওতে সিফাত দাবি করেন, তার বাসায় চলতি মাসে চার হাজার টাকা এবং আগের মাসে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। তার দাবি, এই বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত। ভিডিওতে সরকার সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে গালিগালাজ করতে দেখা যায় তাকে। এরপর ওই দিন রাতেই সিফাতকে আটক করে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। সেই মামলাতেই এখন সিফাত কারাগারে।
ভিডিওতে দেওয়া গালিগুলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের খারাপ। বলাই যায় যে, গালি আবার কখনো ভালো হয় নাকি! হ্যাঁ, তা হয় না। গালি মানেই খারাপ। কারণ, গোলাপ বা রজনীগন্ধার সুরভিত আবেশে আসলে ক্ষোভ প্রকাশ করা যায় না। তার জন্য ভাষাগতভাবেও কটু পরিবেশই সৃষ্টি করতে হয়। তবে খারাপের মধ্যেও তো মাত্রাগত দিক থেকে বেশি, কম থাকে। সেই দিক থেকে বলতে গেলে ওই কলেজশিক্ষার্থীর দেওয়া গালিগুলো যে অত্যন্ত অশালীন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ আসলে নেই। যারা বাংলা বোঝেন এবং যারা ভিডিওটি দেখেছেন, তাদের জীবনে মা-বোন যদি সম্মানীয় হয়ে থাকেন, নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে তারা দ্বিমত হবেন না। বাবার বিষয়টি নাহয় বাদই দিলাম!
অর্থাৎ, ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ফেসবুকে এসে দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্য করে গালি দিয়েছেন দেদারসে। প্রাথমিকভাবে কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসা এবং সেই সংক্রান্ত ক্ষোভের বিষয়টিই সামনে এসেছে। সিফাত নিজেও ভিডিওতে কারণ হিসেবে তেমনটাই উল্লেখ করেছেন। যদিও এখন নানামাত্রিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে, আসছে। পুলিশও আনছে। তবে সেসব বাদ দিয়ে যদি শুধুই অভিযুক্ত ক্রিয়াতে মনোনিবেশ করা হয়, তাহলে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসা এবং তদসংশ্লিষ্ট ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই প্রধান রূপে ধরা দেয়।
সমস্যা হলো, যেকোনো কারণে এমন খারাপ খারাপ গালি একজন দিলে আইনি প্রতিক্রিয়া আসলে কেমন হওয়া উচিত? নিশ্চয়ই উপযুক্ত অনেক বিকল্প আছে, উপায় আছে। কিন্তু সেসবের কোনো কিছুর মধ্যে কি সন্ত্রাসবিরোধী আইন পড়ে? যদিও ওই আইনেই মামলা হয়েছে সিফাতের বিরুদ্ধে। পুলিশ তুলছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। মানে একজন ফেসবুকে এসে গালিগালাজ করল, আর তার পরই পুলিশ আবিষ্কার করল একটি ‘সংশ্লিষ্টতা’? কেউ কি বিশ্বাস করবে এতটা?
উল্টো এটি যেন হয়ে উঠছে সেই আগের মতোই একটি ‘সাজানো’ বিষয়। তখনও কটূক্তির অভিযোগ উঠত, এমন মামলা হতো, কিছু সংশ্লিষ্টতা আসত এবং গ্রেপ্তার হতো। এটা তো কটূক্তির ক্ষেত্রে সম্প্রতিও আমরা এসব ঘটনা ঘটতে দেখেছি। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হতে দেখেছি। দেখেছি যে, মাইকে ভাষণ বাজানোও হয়ে গেছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড! তো, আসল আলাপ হলো–সরকারে যেই থাকুক, এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটা বন্ধ হয় না কখনো। যখন যেটি যাদের বিরুদ্ধে যায়, তারা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে তখন। কিন্তু পক্ষে হলে স্পিকটি নট।
গালির ক্ষেত্রেও চিত্র একইরকম। গালি যদি পক্ষে থাকে, তাহলে তা ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ হিসেবে গণ্য হতে দেখা যায়। আর যদি গালি বিপক্ষে চলে যায়, তখন বলা হয় এটি ‘অপরাধ’। সব রাজনৈতিক বা সামাজিক পক্ষই আমাদের দেশে এই নীতিই মেনে চলে। এই একটা জায়গায় সবার মধ্যেই মিল দারুণ।

তাই সিফাতের ক্ষেত্রেও আসলে দুটি পক্ষই তৈরি হয়ে গেছে। এক পক্ষ অপরাধ বলছে, আরেক পক্ষ বলছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এখানে যে প্রশ্নটি আসে, সেটি হলো–মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানেই কি গালি দেওয়ার স্বাধীনতা? এই স্বাধীনতায় কতটা খারাপ গালি দেওয়া যাবে? নাকি কোনো গালিই দেওয়া যাবে না? নাকি সব গালিই দেওয়া যাবে নির্বিশেষে?
সারা দুনিয়াতেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ধরনের কটু মন্তব্য চলে। সেগুলো অনেক সময় ভব্যতার সীমা অতিক্রমও করে। তবে সেসব চলতে দেওয়া হয়। সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে আমরা এসব ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধ প্রয়োগ হতে দেখি না। আবার সরকার বা সরকার সংশ্লিষ্ট, কিংবা ক্ষমতা বা ক্ষমতার প্রতীকের প্রতি নানা মাত্রার কটু সমালোচনা হতে দেখা যায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে এসব আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষমতা বা সরকার যদি দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে, তাহলে তা আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার মতোই কাজ হয়। কারণ, ক্ষমতার বাইরের মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য কেবল ওই মুখটিই থাকে। সেটিও যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে আর নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশের পথ পায় না।
তবে এর বিপরীতে একটি সম্পূরক জিজ্ঞাসাও দিন দিন বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে প্রবলভাবে। তা হলো, ক্ষোভ বা সমালোচনা প্রকাশ করতে গেলেই কাউকে অন্যের বাবা, মা’কে নিয়ে বাজে কথা বলতে হবে কি না বা সেটিই আবশ্যিক কি না। সমালোচনার ভাষা এমনটাই হওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও বিতর্ক ব্যাপক। বাংলাদেশের সামাজিক পরিসরে কখনোই প্রকাশ্যে খারাপ খারাপ গালি দেওয়াটা সুআচরণ হিসেবে দেখা হয় না। যদিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের যত প্রসার হয়েছে, তত এসব মানদণ্ড ফিকে হতে শুরু করেছে। অনলাইন থেকে এখন সেই গালির তোড় আসছে অফলাইনেও। রাজনৈতিকভাবে ঢের অশালীন মন্তব্য এই দেশের মানুষ শুনেছে বটে এবং শুনছেও। তবে সেগুলো কখনোই ঠিক ‘প্রশংসিত’ হতে দেখা যায়নি। বরং সমালোচনাই বেশি হয়েছে। কিন্তু ইদানীং গালিকেও ‘গ্রহণযোগ্য’ করে তোলার পক্ষে নানা যুক্তি হাজির করার চেষ্টা হয়, এবং অবশ্যই তা কেবলই কোনো পক্ষের উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হলেই। এখন এই ‘সিলেকটিভ’ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই প্রকৃত স্বাধীনতা কিনা, তা নির্ধারণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরাহার বিষয়। এটি কোনো একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নয়। সেই সর্বজনীন সুরাহার আগে আমাদের এটি মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের সংবিধান এই দেশের নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে এবং সেই স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারও দিয়েছে।
সুতরাং, সমালোচনার ভাষা কেমন হবে–সেটি কখনও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার দিয়ে নির্ধারণ বা নির্দিষ্ট করা আসলে সম্ভব নয়। কটূক্তি করার পর সিফাতকে এমন আইনে জেলে পাঠিয়ে দমনমূলক আচরণেরই প্রকাশ পেয়েছে প্রচণ্ডভাবে। সংস্কারের কথা যদি কর্তৃপক্ষ ভাবেও, সেটি করতে হবে সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে। ধরে ধরে জেলে পুরে দিলে বরং উল্টোটা হওয়ারই শঙ্কা বেশি। আর তাতে সার্বিকভাবে শুধুই ক্ষতিই হবে, লাভ নয়। এখন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তা বুঝলেই হয়!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

‘ট্রাম্পিজম’ যেভাবে বিশ্ব ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এমন কিছু আদর্শের দাপট দেখা গেছে, যেগুলো থেকেই অনেক বহুপাক্ষিক সংস্থা আর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল।

সুখ খোঁজার নাটকীয় ফাঁদ: ‘হ্যাপিনেস প্যারাডক্স’
আজকের আধুনিক পুঁজিবাদী যুগে সুখকে যেন একটি বিক্রিযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। চারপাশের রঙচঙে বিজ্ঞাপন আর সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন পর্দাগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে নিখুঁত জীবনের এক কৃত্রিম ছবি তুলে ধরে।

প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে কোথায়?
বিজ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেও যদি আমরা মানুষের ভালো থাকার মূল রহস্য অনুসন্ধান করি, তবে কয়েকটি প্রধান উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিএনপির ৬ মাসে যেখানে বাংলাদেশ
বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মাথায় এসে জনগণের বৃহত্তর অংশ যে হতাশ হয়ে পড়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন জনজীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছিল না, তখন তারা এই বলে আশায় বুক বেঁধেছিল যে নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি বদলাবে।