দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এমন কিছু আদর্শের দাপট দেখা গেছে, যেগুলো থেকেই অনেক বহুপাক্ষিক সংস্থা আর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল।
তবে সেই বিশ্বব্যবস্থা এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদের শাসনামলে গড়ে ওঠা পররাষ্ট্রনীতি অতীতের সব প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়ম থেকে স্পষ্টভাবেই আলাদা। একতরফা সিদ্ধান্ত, লেনদেনভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং ঐতিহাসিক জোটগুলোর হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়া…দুই দফায় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি এগুলোই। এর সঙ্গে বলপ্রয়োগে সুবিধা আদায় আর প্রচারমাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে প্রভাবিত করা মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতির যে নতুন ধারার দেখা মিলছে, সেটাই ‘ট্রাম্পিজম।’
জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়ে এবং এর সঙ্গে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধ আওয়াজ জুড়ে দিয়ে ‘ট্রাম্পিজম’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বৈশ্বিক নিয়মকানুনের ভিত্তিকেই বদলে দিচ্ছে।
সহজ কথায়, ট্রাম্পিজমের মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একচ্ছত্র বিশ্বব্যবস্থা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরে আসা এবং তার বদলে আরও স্বার্থকেন্দ্রিক, ইস্যুভিত্তিক এবং নির্দিষ্ট লেনদেননির্ভর বিশ্বব্যবস্থায় চলে যাওয়া।
স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতির মূল ভিত্তি
বহুপাক্ষিক চুক্তির প্রথাগত ধারা থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক কূটনীতি ও কঠোর জাতীয় স্বার্থকে প্রধান হাতিয়ার করাই ট্রাম্পিজমের মূল কৌশল। এখানে পররাষ্ট্রনীতিকে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক লক্ষ্য, অর্থাৎ, শিল্প খাতের পুনর্জাগরণ, সামরিক খাতের শক্তি বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য এবং আর্থিক খাতে নিজেদের নেতৃত্ব বজায় রাখার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এসব উদ্দেশ্য হাসিলে ট্রাম্প প্রশাসন বড় কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতায় না গিয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পথ বেছে নেয়। আর এসবের প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয় চড়া শুল্ক আরোপ, বাণিজ্যিক চাপ তৈরি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো আর নিজেদের দেশের আইন আন্তর্জাতিকভাবে চাপিয়ে দেওয়ার এই নীতি বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন, দেশের সার্বভৌমত্ব আর কোনো দেশের ক্ষমতার সীমা আসলে কতটুকু হতে পারে–তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
‘শক্তির মাধ্যমেই শান্তি’–এই নীতিকে সামনে রেখে ট্রাম্পিজম আইনি, অর্থনৈতিক ও সামরিক কৌশলগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে মিত্র কিংবা শত্রু, উভয় পক্ষকেই চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। এমনকি সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোকেও সোজা পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
এই লেনদেনভিত্তিক মানসিকতা প্রভাব ফেলেছে ন্যাটোর মতো যৌথ সামরিক জোটগুলোর ওপরও। সামরিক ব্যয়ের ভাগাভাগি নিয়ে শক্ত প্রশ্ন তুলেছে ট্রাম্পিজম। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে একাই ন্যাটোর সিংহভাগ খরচ আর ঝুঁকির বোঝা টেনে এসেছে, সেটাও বারেবারে মনে করিয়ে দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ধাক্কা ও অচলাবস্থা
বিশ্ব পরিচালন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই ট্রাম্পিজমের প্রভাব বেশ ভালোভাবে টের পাওয়া গেছে।
বহুপাক্ষিক মঞ্চগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ছিল বেশ অস্থিতিশীল–কখন কী করবে, তা বুঝে ওঠা যায় না। অনেক পুরনো আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে তারা হুটহাট বেরিয়ে গেছে, আবার নানা বৈশ্বিক সংস্থা থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
নেতৃত্বের এই খামখেয়ালি আচরণ বিশ্ব পরিচালনা ব্যবস্থার নাজুক দিকগুলোকে প্রকাশ্যে এনেছে এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতিসংঘ, বিশেষ করে এর নিরাপত্তা পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের আসল কার্যকারিতা, গ্রহণযোগ্যতা আর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে তর্ক আগে থেকেই ছিল, ট্রাম্পের নীতি তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং ঔপনিবেশিক আমলের নিয়মনীতির কারণে সংস্থাটি আগেই অচল হয়ে পড়েছিল–সংস্কারের কাজটা মূল জায়গায় না গিয়ে কেবল আলোচনার মাঝেই আটকে ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা ও সরে দাঁড়ানোর নীতি সেই অচলবস্থাকে আরও তীব্র করেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর স্থায়ীত্ব ও ক্ষমতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
অবশ্য সমর্থকদের দাবি, পুরো বিশ্বব্যবস্থা না ধরে কেবল প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সংস্কার আনতে চেয়েছে–যেমন সমমনা মিত্র দেশগুলো এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থ নিয়ে কাজ করা। তবে সমালোচকদের সোজা কথা–বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার চেয়ে নিজেদের তাৎক্ষণিক সুবিধা নেওয়াকেই বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বহুকেন্দ্রিক ও আঞ্চলিক ব্যবস্থার উত্থান
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব মোড়লের ভূমিকা থেকে পিছু হটায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে দিয়েছে। বৈশ্বিক নেতৃত্বের এই ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে এখন মধ্যম সারির ক্ষমতাধর দেশ আর আঞ্চলিক জোটগুলো ধীরে ধীরে সামনের সারিতে চলে আসছে।
পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলোর ঘাটতি মেটাতে কিংবা সেগুলোর বিকল্প হিসেবে এই শক্তিগুলো এখন নিজেদের মতো আঞ্চলিক কাঠামো আর নতুন নতুন জোট গড়ে তুলছে। বিশ্বরাজনীতির এই নতুন মোড় ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ও নীতিপ্রণেতাদের দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এক দলের মতে, বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প যে ধাক্কা দিয়েছেন, তা মূলত ইতিবাচক সংস্কারেরই পথ খুলে দিয়েছে। এতে মধ্যম সারির ক্ষমতাধর আর অ-পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের এলাকার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিজেরা নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একটি বহুপক্ষীয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তববাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যা বর্তমান ভূ-রাজনীতির আসল রূপটিকে তুলে ধরে।
অন্য দলের মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পশ্চিমা নেতৃত্বের এই দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং এক বিপজ্জনক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে।
মহাশক্তির নতুন রূপ
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষণিকের কোনো পরিবর্তন বা স্রেফ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি যে নতুন এবং অনুসরণযোগ্য ধারা তৈরি করেছে, সে কারণেই একে ‘ট্রাম্পিজম’ হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসঙ্গত।
অনিশ্চিত কূটনীতিকেই একটা অস্ত্র বানিয়ে ফেলা, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের তোয়াক্কা না করে জাতীয় সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার এবং বিশ্বশাসনের নানা চ্যালেঞ্জের বিপরীতে জাতীয় সার্বভৌমত্বকে আরও জোরাল করার চেষ্টার মাধ্যমে ট্রাম্পিজম স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে–আধুনিক যুগে এক পরাশক্তি কীভাবে নিজস্ব প্রভাব ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে।
বিশ্বরাজনীতিতে এই পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব থাকবে সুদূরপ্রসারী। প্রথাগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলো ভেঙে দিয়ে এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেই বদলে দিয়েছে। বিশ্বকে আজ এমন এক নতুন সময়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে একচ্ছত্র নেতৃত্বের বদলে গড়ে উঠছে বিকেন্দ্রীভূত শক্তি, বাড়ছে আঞ্চলিক প্রভাব আর তৈরি হচ্ছে শাসন পরিচালনার নতুন সব পথ।
লেখক: জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক গবেষক