বিজ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেও যদি আমরা মানুষের ভালো থাকার মূল রহস্য অনুসন্ধান করি, তবে কয়েকটি প্রধান উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানকে যদি কেবল একটিমাত্র উত্তর বেছে নিতে বলা হয়–মানুষের জীবনে দীর্ঘতম ও গভীরতম সুখের উৎস কী? তবে তার নিটোল, সহজ উত্তর হবে, গভীর ও বিশ্বাসযোগ্য মানবিক সম্পর্ক। প্রায় এক শতাব্দী ধরে পরিচালিত বিশ্ববিখ্যাত ‘হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’-এর মূল নির্যাস হলো–অঢেল সম্পদ, বিপুল খ্যাতি কিংবা শারীরিক পরীক্ষার ফলাফলের চেয়েও মানুষকে আজীবন সুস্থ ও সুখী রাখে তাদের সম্পর্কের গুণমান।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। চিকিৎসাবিজ্ঞান দেখায় যে, একাকীত্ব শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ এবং প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়, যা দৈনিক ধূমপানের মতোই শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
টাকা কি সত্যিই সুখ কিনতে পারে?
এই বহুল চর্চিত প্রশ্নের এক নিরপেক্ষ সমাধান দিয়েছেন নোবেলজয়ী চিন্তাবিদ ড্যানিয়েল ক্যানেম্যান এবং অর্থনীতিবিদ অ্যাঙ্গাস ডিটন। তাদের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, অনাহার, দারিদ্র্য এবং মৌলিক নিরাপত্তার অভাব মানুষকে গভীরভাবে অসুখী করে তোলে। কিন্তু আয় যখন একটি সুনির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে–যেখানে ব্যক্তির অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, আবাসন এবং স্বাধীন বেঁচে থাকার সুযোগটুকু নিশ্চিত হয়ে যায়–তখন অতিরিক্ত অর্থ অর্জনের সঙ্গে প্রতিদিনের আনন্দ বা সুখ বাড়ার হার ক্রমশ কমে আসে (Law of Diminishing Returns)। সহজ কথায়, অর্থ আমাদের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ও পছন্দের স্বাধীনতা দিতে পারে, কিন্তু তা নিজে থেকে ভালোবাসা, জীবনের অর্থ বা আত্মিক প্রশান্তি তৈরি করতে পারে না।
একইভাবে কাজের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা মানুষের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে কাজ করা আর নিজের কাজকে উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে করে ভালোবাসার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের এক বিশাল ফারাক রয়েছে। এর সঙ্গে শরীর আর মন যেহেতু একে অপরের পরিপূরক, তাই নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম মানুষের মানসিক বিষাদ ও হতাশা প্রতিরোধে দারুণ ওষুধ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি, প্রতিদিনের পর্যাপ্ত ঘুম আমাদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো প্রয়োজনীয় হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা আমাদের মনকে শান্ত ও উৎফুল্ল রাখে।