কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, ‘সততার ৯৯% হয় না; হয় এক শ, নয় জিরো।’ অনেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সততা কী?’ ভেবে দেখলাম, প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা কঠিন। গ্রন্থগত বিদ্যায় বরাবরই আস্থা কম, প্রশ্নের উত্তর তাই খুঁজতে শুরু করলাম নিজের যাপিত জীবনে, আরও নতুন কিছু প্রশ্ন দিয়ে।
সততা বা অসততার শিক্ষা প্রথম কোথা থেকে পেলাম? আর্থিক স্বচ্ছতাই কি সততার একমাত্র উপাদান? ঘুষ খায় না–কেবল এই কারণেই কি একজন সৎ? নিজের ছেলেটি বাজারে গিয়ে দশ টাকার জিনিস যখন আট টাকায় কিনে আনে, অথবা আট টাকার জিনিস যখন দশ টাকায় বেচে আসে, আমরা তাকে বাহবা দিই- এই লোকঠকানো প্রবণতা কেন আমরা অসততা না বলে স্কিল বা স্মার্টনেস বলি? সততার সংজ্ঞা কি তাহলে প্রত্যকের কাছে আলাদা? দেশভেদে, কালভেদে বদলায়? আমি কি সৎ?
এতসব প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছি আর বায়োস্কোপের মতো নিজের জীবনের অনেক কথা মনে পড়ে গেছে।
সততা বিষয়ে প্রথম খটকা লাগে মুক্তিযুদ্ধের সময়। ছয় বছরের শিশু আমি। মা আমাদের নিয়ে লুকিয়ে আছে নানার বাড়িতে। নানা দরিদ্র ভূমিপুত্র চাষি, বাড়িতে মাটির মালসা বা বড়জোর টিনের থালায় খাওয়া-দাওয়া চলে। একদিন দেখি কাঁসার থালাবাটি। বড়দের কথায় কানপাতা স্বভাব ছিল আমার। আমি ছিলাম সেই শিশু যে বাঁশঝাড়ে বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক আর চারপাশের মানুষের কথা সব মন দিয়ে শুনতাম। কথায় কথায় বুঝলাম বাসনগুলো হিন্দুদের, দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ‘দিয়ে গেছে’। ব্যাপারটার মধ্যে ‘অসততা’ কিছু আছে কি না সেই বয়সে বুঝিনি। কিন্তু কেন যেন মনে হয়েছিল, কিছু একটা ‘ঠিক’ নেই। সেই আমার ঠিক-বেঠিক নিয়ে প্রথম প্রশ্ন।
পরের ঘটনা। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। বেশ বড় হয়ে গেছি। মনোয়ার মিয়া এলাকায় বড়লোক হিসেবে পরিচিত। হাটে যাওয়ার পথে তার বিশাল পাটের আড়ত। আড়তের বারান্দায় বসেই তিনি সকালের বাজার সেরে নেন। হাটে যান না। পথচলতি হাটুরেদের ডেকে থামান, দরদাম করেন, তারপর বারান্দায় বসেই কেনেন। আমি শিশু, আমাকে মনোয়ার মিয়া তেমন পাত্তা দেন না। কিন্তু আমি গভীর মনোযোগে তার দরদাম করার কৌশল দেখি। যেমন গ্রামের একজন চাষি হয়তো চারটে কদু নিয়ে হাটে যাচ্ছে, মনোয়ার মিয়া ডেকে বললেন, ‘কদুগুলার দাম কত?’ ছোট-বড় চার সাইজের চারটে কদু একবারে বিক্রি হয়ে যাবে ভেবে চাষিটি হয়তো বললেন, ‘দুই টাকা’। মনোয়ার মিয়া ধামা থেকে সবচেয়ে বড় দুটো কদু তুলে নিয়ে চাষির হাতে ধরিয়ে দিলেন এক টাকা। হয়তো কোনো জেলে ঝুড়ি ভরে বিল থেকে ধরা মাছ নিয়ে হাটে যাচ্ছেন। মনোয়ার মিয়া বললেন ‘কত করে সের?’ হয়তো রফা হলো প্রতি সের দশ টাকা। মনোয়ার মিয়া এরপর ঝুড়ি থেকে একটা একটা করে বেছে বেছে মাগুর শিং কই পাবদাগুলো তুলে নিয়ে ওজন করলেন। ফর্সা লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা গায়ে আতরের গন্ধওয়ালা মনোয়ার মিয়ার ‘পাওয়ার’-এর কাছে গ্রামের এই সহজ-সরল মানুষগুলোর ঠকে যাওয়া দেখে আমার মনে হতো, মনোয়ার মিয়া কাজটা ‘ঠিক’ করল না।
সরকারি চাকরিতে আমাদের এক উচ্চপদস্থ সহকর্মী খুব ‘সৎ’ ছিলেন। এক পয়সা ঘুষ খেতেন না। একই সাথে ছিলেন প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং হিংসুক। ইচ্ছে করে মানুষকে ‘শিক্ষা’ দিতেন, দেরি করিয়ে, অতিরিক্ত খরচ করিয়ে। আরেকজনকে দেখেছি, তেমন সৎ নন, কিন্তু দয়ালু ও পরোপকারী। দুটো ঘটনা বলি। এক বৃহস্পতিবার, বিকেল প্রায় ৫টা। কর্মকর্তাটি অফিস গুটিয়ে ফেলেছেন। বের হবেন- এমন সময় এক বৃদ্ধ দরজায় এসে বললেন, “স্যার আমার চিঠিটা যদি দয়া করে সই করে দেন, তাহলে আমি আজ রাতেই চট্টগ্রাম চলে যেতে পারি। আমার গায়ে জ্বর, বৃদ্ধ মানুষ, কোম্পানির সামান্য কেরানি। আজ যেতে পারলে শুক্র-শনি দুই দিন আমাকে আর ঢাকায় থাকতে হয় না।” ওই কর্মকর্তা বললেন, না, “৫টা বেজে গেছে, অফিস শেষ। রবিবার সকাল নটায় আসেন।” ব্যাস, উনি বৃদ্ধের পাশ দিয়ে হেঁটে নেমে গেলেন লিফট দিয়ে। পিতার বয়সী বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দিলাম; হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে টের পেলাম, সত্যি ওর গায়ে জ্বর। আচ্ছা, আমার ওই বস কি সৎ?
একবার মোবাইল কোর্ট বসেছে বরিশালে, আমিও টিমে আছি। এক ছোট লঞ্চে ড্রামভর্তি জাটকা পাওয়া গেল। লঞ্চের ডেকে মাস্টার সুপারভাইজার যারা ছিল, পুলিশের বোট দেখে তারা আগেই পালিয়েছে। ধরা ইঞ্জিন রুমে ডিউটি করা ড্রাইভার। বেচারা আর ইঞ্জিন রুম থেকে বেরোতে পারেনি। কালিঝুলি মাখা লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা হতভম্ব ইঞ্জিন ড্রাইভারকে আমরা আটক করলাম। থানায় সোপর্দ করা হবে। লোকটি খুব বিমর্ষ। এক ফাঁকে আমার কাছে এসে জানাল, সে নিচে ছিল, মালামাল লোড-আনলোড তার দায়িত্ব না, সে বোঝেওনি কখন জাটকা লোড করা হয়েছে। কাল তার মেয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষা, আজ যদি সে অ্যারেস্ট হয়ে হাজতে যায়, মেয়েটার পরীক্ষা ভালো হবে না। তাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানাল। আমার মেয়েও তখন আইডিয়াল স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে। ড্রাইভারকে ছেড়ে দিলাম।
প্রায় মাস ছয়েক পর, এক ছুটির দিনে দেখি লোকটি এক পাতিল দই আর একটা রাজহাঁস (ওর উচ্চারণে রাজাহাঁস) নিয়ে আমার বাসায় এসে হাজির। বললেন, মেয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। মেয়ের মা তার পোষা হাঁসটা আমাকে উপহার দিয়েছে, আর তিনি নিয়ে এসেছেন তার এলাকার বিখ্যাত মহিষের দই (ওর উচ্চারণে দধি)।
নিলাম। লোকটিকে দুপুরে ভাত খাওয়ালাম সাথে বসিয়ে। এরপরও অনেকদিন যোগাযোগ ছিল। মেয়েটার লেখাপড়ার খোঁজখবর দিত। এখন আর যোগাযোগ নেই। আচ্ছা, ওই হাঁস আর দই যে নিয়েছিলাম, সেগুলো কি ঘুষ?
পরের গল্পটি বিদেশের। দুই বছরের মাস্টার্স কোর্স শেষ করে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। একদিন মালমো শহরের এক শপিং সেন্টার থেকে কেনাকাটা করছি। কাউন্টারে একুশ-বাইশ বছরের এক সুইডিশ তরুণী। বেছে নেওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে ছিল একটা ফিলিপ্সের ইলেকট্রিক রেজার। এখন মেয়েটি বিল করবে, আমি দাম দিয়ে চলে আসব। কিন্তু মেয়েটি রেজার দেখিয়ে বলল, “ডু ইউ রিয়েলি নিড দিস?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, নিশ্চয়।” মেয়েটি বলল, “তুমি ছাত্র, পড়তে এসেছ, তুমি তো আর করপোরেট এক্সিকিউটিভ নও যে, হাতে সময় নেই, গাড়িতে বসে, প্লেনের ওয়াশরুমে দৌড়ের ওপর তোমাকে শেভ করতে হয়। তোমার হাতে সময় আছে। সাধারণ রেজার দিয়ে শেভ করবা। এত টাকা খরচ করার কী দরকার!”
ইলেকট্রিক রেজার বিলিং কাউন্টারে রেখে চলে এলাম। আজ ২৬ বছর সেই রেজার ছাড়াই আমার জীবন চলছে। মেয়েটা তো সেলস গার্ল, বেশি বিক্রি করাই ওর কাজ। কিন্তু কেন সে দিন আমাকে কিনতে নিষেধ করল? এটাই কি ওর সততা?
‘হোয়াট ইজ অনেস্টি’ লিখে গুগল করলে অনেক একাডেমিক জবাব পাই। তাতে ঠিক সাধ মেটে না। বরং জীবন যা শিখিয়েছে, দেশে দেশে মানুষে মানুষে ভ্রমণ করে যা শিখেছি, তাতে মনে হয়- এটা একটা ডিপলি রুটেড কালচারাল ফেনোমেনন। অন্তরে-অভ্যাসে-বিশ্বাসের গভীরের প্রোথিত থাকা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা আর আত্মনিয়ন্ত্রণ- এই তিনের মিশেলে গড়ে ওঠা এক মৌলিক মানবীয় গুণ। সৎ মানুষ মানেই হচ্ছে এক দরদী স্বনিষ্ঠ পারসোনালিটি। এমনকি যখন কেউ তাকে দেখে না, যখন সে সকল তদারকির বাইরে, তখনও সে তার কাজ, চিন্তা ও আচরণে সুন্দর।
সকল সময়ে সর্বজীবের প্রতি যিনি দয়ালু, তিনিই সৎ। মানুষের জীবনকে সহজ করে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টাই হলো- সততা।
নজরুল জাহিদ: লেখক ও গবেষক