‘লেট দেয়ার বি লাইট’ চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের একটি অসম্পূর্ণ সিনেমা। শেষ করতে পারেননি। শেষ হওয়ার আগেই তিনি শহীদ হন। ঋত্বিক ঘটক যখন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমা করতে ঢাকায় এলেন, তাকে জহির রায়হানের অসম্পূর্ণ কাজটি শেষ করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ঋত্বিক ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর রাশ প্রিন্ট দেখে বলেছিলেন, এটি যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক। “আমি যদি এটাকে নিয়ে কাজ করি, তাহলে এটি আমার ছবি হবে, জহিরের ছবি হবে না।”
জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হানেরও একই মত। তিনিও চান জহিরের এই কাজের ওপর কেউ ‘কারিকুরি’ না করুক। যেমন আছে, তেমনই থাকুক। কেননা, এটি ছিল জহির রায়হানের স্বপ্নের সিনেমা। অন্য কেউ বুঝবে না। ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর ঘোষণা আসে ১৯৬৯ সালে। ১৯৭০ সালে এই ইংরেজি সিনেমার আংশিক দৃশ্যধারণ এবং ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মহরতও হয়েছিল। মহরতে নায়ক-নায়িকা হিসেবে ওমর চিশতি ও অলিভিয়া গোমেজকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরে অবশ্য অলিভিয়াকে বাদ দিয়ে ববিতাকে সিনেমার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছিল।সিনেমাটি পরিচালনার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও প্রযোজনায়ও ছিলেন জহির রায়হান। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ। ‘ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল’-এর ব্যানারে সিনেমার কাজ চলতে থাকে। নির্মাতা আলমগীর কবির জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ধনকুবের ও চিত্রব্যবসায়ী জগদীশ চাঁদ ওরফে জে সি আনন্দ এই সিনেমার পুরো অর্থ জোগান দিয়েছিলেন।
কী ছিল এই সিনেমায়? এটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। জহির রায়হানের উপন্যাসিকা ‘আর কত দিন’ ছিল এর মূল ভিত্তি। এটি অনুবাদ করেছিলেন আলমগীর কবির। ‘আর কত দিন’-এর ইংরেজি অনুবাদের নামই ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। অনুবাদটি ‘দ্য এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। সেই অনুবাদকেই সিনেমায় রূপ দিতে চেয়েছিলেন জহির। সিনেমাটিকে আরও ৫-৬ ভাষায় ডাবিং করার ইচ্ছে ছিল তার। তিনি বলতেন, “এটাই আমার জীবনের শেষ ছবি। এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল ছবি হবে। সারা পৃথিবীর মানুষ দেখবে।”
যা হোক। এই সিনেমায় তিনি ধর্ম, বর্ণ ও জাতিবাদের নামে বিশ্বজুড়ে মানুষ যে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তা-ই তুলে ধরতে এবং শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের আহ্বান জানাতে চেয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী জহির রায়হানের সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন তার চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্মে কম-বেশি দেখা যায়। সম্ভবত সেই চিন্তা প্রকটভাবে পড়েছিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এ। সাহিত্য ও শিল্পসমালোচক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কথায়ও তা বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, “স্লোগানের উত্তাপ, প্রতিবাদের দুর্বার বচনকে সিনেমার শিরায়-ধমণীতে বইয়ে দেবার কাজটি তিনি অসম্ভব স্পিরিটের সাথে ব্যবহার করেছিলেন তার অসম্পূর্ণ/অসমাপ্ত সিনেমা ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এ। এই সিনেমাটি যদি তিনি শেষ করে যেতে পারতেন, তবে আমি বলব বাংলা সিনেমায় জহিরের একটা ধারা তৈরি হতো।”
সিনেমাটি সম্পর্কে আলমগীর কবিরের মত, স্বাধীনতার চেতনা জাগাতে ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ বলেছেন, “লেট দেয়ার বি লাইট নিউ টেস্টামেন্ট যেন, বাইবেলের ছিন্নপাতা থেকে বাংলার মাটিতে খোদিত স্বপ্নের ঠিকানা ও প্রত্যয়, অহংকার ও গ্রাফিতি”। এই সিনেমার রাশ প্রিন্ট দেখে সত্যজিৎ রায়ও নাকি জহির রায়হানের প্রশংসা করেছিলেন।
জহির রায়হান অনেক করে চেয়েছিলেন ছবিটি শেষ করতে, লেখক শহীদুল হক খানকে তিনি বলেছিলেন, “তাড়াহুড়ো করে যদি লেট দেয়ার বি লাইট শেষ না করতে পারি, তাহলে এ ছবি বানানোর কোন মানে থাকবে না।” শেষ আর করা গেল না। জহির রায়হানের জীবনের মতোই তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিও অসম্পূর্ণ থেকে গেল।
অনল রায়হানের মতে, এই সিনেমাটি অন্য কেউ করতে গেলে ‘একজন মেধাবী বাঙালি চলচ্চিত্রকারের অসামান্য কাজটির ঐতিহাসিক মূল্য বিনষ্ট হবে’।
অসমাপ্ত না হয় থাকল, কিন্তু জহির রায়হান যতটুকুই করেছিলেন, তা দেখার সুযোগ কই? কে কবে ঘটা করে প্রদর্শনের সুযোগ করে দেবে সেই আশায় দর্শকদের বসে থাকতে হবে? ‘লেট দেয়ার বি লাইট’কে যদি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখি—তাহলে তা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে দিতে বাধা কোথায়? কেউ যদি জহির রায়হানের কাজ নিয়ে গবেষণা করতে চায়, তার চলচ্চিত্রচিন্তাকে বুঝতে চায়, সে কোথায় যাবে?
তথ্যসূত্র—
- চলচ্চিত্রযাত্রা, তারেক মাসুদ
- আন্ওয়ার আহমদ সম্পাদিত রূপম: একটি অনুপম সংকলন, ১৯৬৭
- বিস্ময়ে ববিতা, সাজ্জাদ হুসাইন
- জহির রায়হানের নৃতত্ত্ব ইত্যাদি, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ
- আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহ (১), আগামী প্রকাশনী
- লেট দেয়ার বি লাইট যেমন আছে, তেমনই থাকতে হবে, অনল রায়হান, দৈনিক দেশ রূপান্তর
- আকাশ আমায় ভরলো আলোয়, সৈয়দ হাসান ইমাম
- জহির রায়হানের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এখন কোথায়, মকফুল হোসেন
- জহির রায়হান : গুমনাম আত্মার সতীর্থ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও ইমরান ফিরদাউসের আলাপচারিতা, গানপার ডটকম