জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট প্রথম দফায় ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ শেষ করেছে। তাদের দাবিনামা যে ছয়টি দফায় সাজিয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই ষাটের দশকে ইতিহাস বদলে দেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত কর্মসূচির প্রতি সম্মান দেখাতে নয়। কেননা সেই সময়ের ছয় দফাওয়ালাদের সঙ্গে আজকের ছয় দফাওয়ালাদের পথ ও মতের বিস্তর ফারাক আছে।
ষাটের দশকের ছয় দফার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক দফা, তথা দেশের স্বাধীনতায় রূপ নিয়েছিল। আজকের ছয় দফার উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। ১১ দলের নেতারা একদিকে আওয়াজ দিচ্ছেন, ছয় দফা না মানলে এক দফার দিকে যাবেন, আরেকদিকে বলছেন, এটা সরকার পতনের আন্দোলন নয়।
ইতিমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা কঠোর ভাষায় একে অপরকে আক্রমণ করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে সীমানা অতিক্রমের বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থায় লুকিয়ে ছিল, এখন তাদের মধ্য থেকে স্বৈরাচারীরা দেশে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর জবাবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করে যে মন্তব্য করেছেন, সেটি ইটের বদলে পাটকেল ছোড়ার মতো। তিনি বলেছেন, “আমরা যখন লং মার্চের ডাক দিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। আজ কিছু প্রতিক্রিয়া আপনারা শুনতে পেয়েছেন। আমরা পরিষ্কার একটা কথা বলি, আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।”
এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতারা ঈদের পরে আন্দোলন হবে বলে যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতেন, সেটাই স্মরণ করিয়ে দিলেন জামায়াত নেতা। অর্থাৎ, বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েও আন্দোলন করতে পারেনি। কিন্তু এবার তারা আন্দোলন করেই দাবি আদায় করবেন।
এনসিপির আহ্ববায়ক নাহিদ ইসলাম আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, “আমরা এই অধিবেশনে এখনো সংসদে আছি। পরের অধিবেশনে যাব কি না, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। কারণ, জনগণের অধিকার, জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না।”
এসব কথার মাধ্যমে বিরোধী দল এক দফার; অর্থাৎ, সরকার পতনেরই ইঙ্গিত দিয়েছে।
একটি নির্বাচিত সরকারের যতই ব্যর্থতা বা দুর্বলতা থাকুক, ছয় মাসের মাথায় আন্দোলন করে তার পতন ঘটানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশে অন্তত সে রকম নজির নেই। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক দফার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, একতরফা নির্বাচনের পর। সেটা সফল করতে বিরোধী দলকে আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যা পরিণতি পায় ছিয়ানব্বইয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর। নব্বই দশকের সেই আন্দোলন সম্পর্কে জোটের নবীন সদস্যরা না জানলেও জামায়াতের নেতারা ভালো করেই জানেন। কেননা তখন তারা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, বিরোধী দল এখনই লং মার্চের মতো কঠোর কর্মসূচি কেন নিল, তাও যখন সংসদ অধিবেশন চলমান? সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নির্বাচনের আগে সব দলই সংসদকে কার্যকর করার কথা বলেছিল। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই বিরোধী দল দাবি আদায়ে সংসদের বদলে রাজপথকেই বেছে নিল।
বিরোধী দলের নেতারা জাতীয় সংসদে ‘নরমে গরমে’ কথা বললেও রাজপথে বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী ছেড়ে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু নিশ্চয়ই তাদের জানা আছে যে, গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হয় ধাপে ধাপে। প্রথম দফায় লং মার্চ করলে পরের কর্মসূচি কী হবে? হরতাল-অবরোধ-শাট ডাউন-ব্লকেড? মানুষ কি এই মুহূর্তে এ ধরনের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত? তারা জীবন-জীবিকা নিয়ে এতটাই বিপন্ন অবস্থায় আছে যে, অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় নেই। আগে পেটে ভাত থাকতে হবে, তারপর গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টেকসই করার উদ্দেশ্যে প্রণীত জুলাই সনদের ব্যাখ্যা নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সই হওয়া সনদই চূড়ান্ত, কেউ বলেছেন, গণভোটের রায়ই মূল কথা। গণভোট ও জনগণের রায় পাওয়া রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে তা কীভাবে মীমাংসা হবে, তা জুলাই সনদে লেখা নেই।
সরকারি ও বিরোধী দল প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও সংসদে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল সংসদ বর্জনের ঘোষণা দেয়নি সত্য; তারা সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটিতে নামও দেয়নি, সংসদীয় কমিটিতে গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের খসড়া বিলের আলোচনায়ও অংশ নেয়নি। সংসদীয় কমিটিতে এ ধরনের বর্জনের ঘটনা অস্বাভাবিক না হলেও বিরল।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সব স্থায়ী কমিটি গঠন করার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত যেসব কমিটি গঠিত হয়েছে, তাতে বিরোধী দলকে একটি বাদে কোনোটিতে সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি। বিশেষ কমিটির বিষয়ে ঐকমত্য না হলে বাকি কমিটিগুলোতেও তাদের সভাপতি পদ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি আদায়ের জন্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের যেকোনো পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে তা সম্ভব নয়। কিন্তু এসব কমিটিতে বিরোধী দল আনুপাতিক সভাপতি পদ না পেলে সরকারি দলের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে, যা সংসদীয় ব্যবস্থায় কোনোভাবে কাম্য নয়।
বহু বছর ধরে সরকারি দলের কাছ থেকে ডেপুটি স্পিকার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছিল। অতীতে কোনো দল সেটা পূরণ করেনি। এবারে সরকারি দল প্রস্তাব দিলেও বিরোধী দল গ্রহণ করেনি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অজুহাত তুলে। তাদের এই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না বলেই আমরা মনে করি।
এই মুহূর্তে দেশবাসীর প্রত্যাশা-জুলাই সনদ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সরকারি ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। অন্যথায় সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌল চেতনা অধরাই থেকে যাবে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা