পূর্ব জার্মানির একটি ছোট অঙ্গরাজ্যের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচন সমগ্র ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের প্রতিধ্বনি লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট থেকে শুরু করে প্যারিসের এলিসি প্যালেস পর্যন্ত পৌঁছাল এবং ইউরোপের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তার জন্ম দিয়েছে।
যে বিষয়টি এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে তা হলো, দেশটি আর অন্য কোনো সাধারণ ইউরোপীয় রাষ্ট্র নয়, এটি জার্মানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসিবাদের ভয়াবহতার পর থেকে জার্মানি সবসময়ই উগ্র বা সুদূর-ডানপন্থী দলগুলোকে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিল।
তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি ইউরোপে গত এক দশক ধরে ডানপন্থীদের ক্ষমতায় আসার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই একটি চরম রূপ।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরজুড়ে পুরো ইউরোপে বেশ কয়েকটি সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি-র এই জয় উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা ও কৌশলগত নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
তাদের জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশের উগ্র-ডানপন্থী নেতাদের সাথেই মিলে যায়, যেখানে সাধারণ নাগরিকেরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে চরম অসন্তুষ্ট।
নিউইয়র্ক টাইমসের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক সংস্থা ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ বিশেষজ্ঞ মুজতবা রহমানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন যে, উন্নত ইউরোপ মূলত এক ধরনের জটিল ও আধুনিক ‘রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার’ মধ্য দিয়ে চলেছে। তার মতে, ইউরোপের বিদ্যমান সরকারগুলো তাদের নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলা করতে পারছে না।
সাধারণ ভোটারদের মৌলিক চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই চরম অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও উচ্চ বেকারত্বের কারণে জার্মানির আঞ্চলিক নির্বাচনে এএফডি পার্টি ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের মধ্য-ডানপন্থী দলের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়েছে।
মূলত এই ফলটি প্রকাশ করে দিয়েছে ইউরোপের সমাজ ও ভোটারদের স্পষ্ট বিভাজনকে। একদিকে একদল মনে করছে উগ্র-ডানপন্থীদের উত্থান গণতন্ত্রের কাঠামো, ভারসাম্য ও মৌলিক অধিকারের জন্য চরম হুমকি, যা সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে, অন্য একদল ভোটার মনে করছে এই ডানপন্থীরাই মূলধারার বিচ্যুত ও বিচ্ছিন্ন অভিজাতদের হাত থেকে দেশের জাতীয় পরিচয় ও জীবনযাত্রা রক্ষা করতে আসা প্রকৃত ত্রাতা।
জার্মানির সাখসেন-আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যে সংঘটিত এই নির্বাচনে এএফডি চূড়ান্ত বিজয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও একেবারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। ফলে নীতিগতভাবে হয়তো তারা সরাসরি সরকার গঠনে ব্যর্থ হতে পারে। কারণ জার্মানির অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে যে, তারা এএফডির সাথে কোনো ধরনের জোট সরকার গঠন করবে না।
এর মূল কারণ এএফডির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে নাৎসিদের পুরোনো স্লোগান ব্যবহার করা, হোলোকোস্টের মতো ঐতিহাসিক নির্মমতাকে হালকা করে উপস্থাপন করা এবং অভিবাসী পটভূমির জার্মান নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতা পোষণ করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাও তাদের একটি সন্দেহভাজন চরমপন্থী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। তা সত্ত্বেও, নিজ অঙ্গরাজ্যে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর এই পরাজয় চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের রাজনৈতিক অবস্থানকে চরম নড়বড়ে করে দিয়েছে।
চ্যান্সেলরের নিজের দল থেকেই এখন তার পদত্যাগের গুঞ্জন উঠছে। মুজতবা রহমান সতর্ক করে বলেছেন যে, জার্মানির মতো একটি বড় দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যৌথ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে।
জার্মানির রাজনৈতিক সঙ্কটের পাশাপাশি ফ্রান্সেও উগ্র-ডানপন্থীদের প্রভাব দিন দিন অত্যন্ত প্রকট হচ্ছে, যা সমগ্র ইউরোপীয় ঐক্যের জন্য চরম শঙ্কার কারণ। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র-ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মারিন ল্য পেন এগিয়ে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে যে প্রথম দফার ভোটে ল্য পেন বেশ বড় ব্যবধানে শীর্ষে আছেন এবং সম্প্রতি দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য সমীকরণেও তিনি মূলধারার প্রার্থীদের পেছনে ফেলছেন।
তার ১৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি এখন ক্ষমতার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ফ্রান্সে একটি উগ্র-ডানপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেবে যা পূর্বের কোনো নির্বাচন করতে পারেনি। কারণ ফ্রান্স ইইউ-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার পাশাপাশি একটি প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
সর্বপরি, ফ্রান্স ও জার্মানি উভয় দেশেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা ‘অ্যান্টিফ্যাসিস্ট ফ্রন্ট’ বা মূলধারার দলগুলোর মধ্যকার ঐক্যের দেয়াল ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সাল কলেজ লন্ডনের ফরাসি ও ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক ফিলিপ মার্লিয়ার।
ইউরোপের অন্যান্য বড় দেশগুলোতেও একই ধরনের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
স্পেনে দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন সংকটে জর্জরিত বর্তমান সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিপরীতে উগ্র-ডানপন্থী ‘ভক্স’ পার্টি আগামী জোট সরকারের অংশীদার হওয়ার জোরাল সম্ভাবনা তৈরি করছে। অপরদিকে যুক্তরাজ্যেও অভিবাসন ইস্যু ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে সুদূর-ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ তাদের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে। পরিস্থিতির নাজুকতা সামাল দিতে এবং ডানপন্থীদের প্রতিরোধ করতে মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টি তাদের অজনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে সরিয়ে অ্যান্ডি বার্নহামকে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে।
অবশ্য যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনীতিতে আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে দলটির নেতা নাইজেল ফারাজের ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উগ্র দৃষ্টিভঙ্গির আরও একটি নতুন দলের আত্মপ্রকাশ তাদের ভোটব্যাংকে ভাগ বসিয়েছে। কুইন্স মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রাজনীতির অধ্যাপক টিমোথি বেল মন্তব্য করেছেন যে, উগ্র-ডানপন্থীদের এই উত্থান কতখানি স্থায়ী হবে তা নির্ভর করবে তারা ক্ষমতায় এসে শাসনকাজ কতটা দক্ষতার সাথে ও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ইতালি ও হাঙ্গেরির একদম ভিন্ন দুটি চিত্র তুলে ধরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যা ডানপন্থী রাজনীতি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, যার দলের ঐতিহাসিক নব্য-ফ্যাসিবাদের সাথে যুক্ত, তিনি ক্ষমতায় আসার পর কিছুটা সংযত অবস্থান গ্রহণ করেন।
তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইইউ নীতি নিয়ে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে ইতালির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী টানা শাসন পরিচালনা করা নেতাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তবে নিজ দলের ডান দিক থেকে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে আসায় তিনি এখন আবারও অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন, যা সম্প্রতি স্পেনের ভূখণ্ডে আসা মরোক্কার অভিবাসীদের ইস্যুতে তার উগ্র প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যদিকে, হাঙ্গেরিতে টানা ১৬ বছর ধরে রাজত্ব করার পর গত এপ্রিলে উগ্র-ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের কারণে তার পতনে ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা স্বস্তি ও আশার আলো খুঁজে পেয়েছে যে উগ্র-ডানপন্থীদেরও নির্বাচনে হারানো সম্ভব।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। ছবি: রয়টার্স
তবে ফ্রান্সে মারিন ল্য পেনের জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যদি একটি শক্তিশালী ঐকমত্যে পৌঁছে মধ্য-ডানপন্থী এদুয়ার ফিলিপের মতো নেতাকে যৌথভাবে সমর্থন করতে পারে, তবেই হয়তো দ্বিতীয় পর্বে ল্য পেনকে আটকানো সম্ভব হবে। কিন্তু ফরাসি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রভাগ যদি এভাবে বিভক্ত থেকে যায়, তবে ল্য পেনের বিপরীতে কট্টর-বামপন্থী প্রার্থী জঁ-লুক মেলাঁশোঁ দ্বিতীয় দফায় পৌঁছে যেতে পারেন, যা মূলধারার রাজনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।