Advertisement Banner

লোডশেডিং হচ্ছেই, বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট আসলে কোথায়?

লোডশেডিং হচ্ছেই, বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট আসলে কোথায়?
২০১৭ সালে বাংলাদেশ এবং আদানি পাওয়ারের মধ্যে এই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ছবি: বাসস

দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঢাকায় লোডশেডিং হতে পারে বলে গতকাল রোববার সংসদে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এক দিন বাদেই অবশ্য মন্ত্রী আবার জানিয়েছেন ‘পরিস্থিতির উন্নতি’ ঘটেছে।

বিপিডিবিসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে রামপাল তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ আছে। আরেকটি ইউনিট থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা তা থেকে ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও ২০০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম দিচ্ছে। রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট থেকে কমবেশি ৮৬০ মেগাওয়াট আর এসএস পাওয়ারের এক হাজার মেগাওয়াট, অর্থাৎ ২০৬০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে বিপিডিবি।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে মন্ত্রী যে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা বলেছেন, তার সাথে ‘দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র’-এর তথ্য মেলনো সম্ভব না। তবে শনিবার মধ্যরাতে লোডশেডিং যে অনেকটাই হয়েছে-সেটা নিশ্চিত। তার সাথে মন্ত্রীর কথার কিছুটা মিল পাওয়া যায়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, শনিবার দিবাগত রাত বা রোববার মধ্যরাতে (রাত ২টা) সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেড করা হয়েছে। তখন চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট!

আজ সোমবার সংসদে মন্ত্রী বলেছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান কমে ৩৩৯ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

গত ৭ জুন সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদই দাবি করেছিলেন, লোডশেডিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ ঘাটতি দায়ী নয়, বরং ঝড়-বৃষ্টিই দায়ী এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে, তিন সপ্তাহ পর লোডশেডিং এর ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা গ্রাহকদের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে তা সময় বলে দেবে।

এ বিষয়ে বিদুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন চরচাকে বলেন, “পরিস্থিতি যে খারাপ হতে পারে তা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত তথ্য সরবরাহে গড়িমসি না করা কিংবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য না দেওয়া। বিদ্যুৎ মূলত সেবা খাত। গ্রাহক সময়মতো বিল দিচ্ছেন কিন্তু সেবা পাচ্ছেন না। তার ওপর তথ্যবিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জাটিল করে তুলতে পারে।”

গত ২৬ জুনের পর থেকে দিনের বিদ্যুৎ চাহিদা ও লোডশেডিং এবং উৎপাদন চিত্রের কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না বিপিডিবি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছুঁতে পারে। বিপরীতে বর্তমান উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে। এই হিসাবে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটে।

যদিও সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, “আল্লাহর রহমতে আজকে আনন্দের সাথে হাউসকে এবং জনগণকে জানাতে পারি, এখন আমাদের জেনারেশন ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আর ডিমান্ড এখন ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। আমার লোডশেডিং হবে এখন ৩৩৯ মেগাওয়াট।”

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য বলছে, গত তিন সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেও (শুক্র-শনি) গড়ে কমবেশি দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে এই চিত্র ব্যতিক্রম। কারণ ছুটির দিনে চাহিদা কমে যাওয়ার কথা।

পরিস্থিতি যে ভয়াবহ আর অসহনীয় আকার ধারন করেছে তা বোঝা যায় সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ আর বিক্ষোভের ঘটনা থেকে। গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে, নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় রোববার সকালে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে ভাঙচুর চালান। নীলফামারীর ডিমলায় ৯ মিনিটের মধ্যে তিনবার লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করেও সাড়া মেলেনি বলে গ্রাহকদের অভিযোগ। এর আগে ২৫ জুন লোডশেডিং ও বাড়তি বিলের প্রতিবাদে একটি বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটে।

ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে গতকাল রোববার ঝালকাঠি মানব কল্যাণ সোসাইটি মানববন্ধন করে। ২৭ জুন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে এলাকাবাসী। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর ও কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার খবর পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় ২৬ জুন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিক্ষোভ করেন গ্রাহকরা। পরে তারা ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ মৌচাক জোনাল অফিস ঘেরাও করেন।

বিদ্যুতের এমন আসা যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীরা। লোকসান গুনছেন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ময়মনসিংহে দিনে রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সেখানে গড়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকসান হচ্ছে বেশি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গত দুই মাস ধরে দিনের ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ, মানববন্ধন আর বিক্ষোভ যখন চলছে, তখন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঢাকায় লোডশেডিং এর একটি আগাম পূর্বাভাস দিয়েছেন। এ বিষয়ে রাজধানীর সোবহানবাগের ব্যবসায়ি মাহদী ইমরান বলেন, “কেন! ঢাকায় তো লোডশেডিং হচ্ছে। তা হয়তো কম সময়ের জন্য, কিন্তু হচ্ছে তো।” তিনি আরও বলেন, “পরশু ময়মনসিংহ থেকে ফিরলাম, গরমে ত্রাহি অবস্থা। মানুষের অনেক কষ্ট হচ্ছে।”

অন্য এক গ্রাহক রুবেল ইসলাম মনে করিয়ে দেন পুরনো দিনের কথা। তিনি বলেন, “যাত্রাবাড়ীতে এক সংসদ সদস্য বিদ্যুৎ-পানির দাবিতে এলাকার মানুষের কাছে নাজেহাল হয়েছিলেন। বিএনপিই তখন সরকারে ছিল। সম্ভবত সেই অবস্থা এড়াতে মন্ত্রী আগাম লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দিলেন।”

এই দুই জনেরই আক্ষেপ সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তাদের অভিযোগ, সব সরকারই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরহ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাম বাড়ায় কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজারের মতো। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না কেন?

এর উত্তরে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বাধা অর্থ সংকট। পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তারা পিডিবির কাছে ৭-৮ মাসের বিল পাওনা আছে। বিল পাওয়া সাপেক্ষে আবার উৎপাদনে গিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশে থাকতে চান বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপপা) সদস্যরা।

এদিকে, লোডশেডিং কমাতে রোববারের বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতে কমপক্ষে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, ক্যাপটিভসহ বিদ্যুৎ খাতে দেশের উৎপাদিত ৬০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পসহ বিভিন্ন খাত এমনিতেই বিপাকে আছে। এছাড়া, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সম্পর্কিত