পর্ব-৩
তুহিন কান্তি দাস

টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এর ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্স র্যাঙ্কিং’-এ অনন্য গৌরব অর্জন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহুমুখী যৌথ গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষিণ এশিয়ায় ১ম এবং বিশ্বজুড়ে ৫২তম স্থান অধিকার করেছে। এ ছাড়া, টাইমস হায়ার এডুকেশনের এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ৩৮.৩ থেকে ৪০.১ পয়েন্ট পেয়ে ৩০১-৩৫০ তম স্তরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাথে যৌথভাবে দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ঢাবি।
তবে আন্তর্জাতিক এই অর্জনেই কি সন্তুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা? নাকি আরও বহুদূর যাওয়ার সুযোগ রয়েছে?
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘সীমাবদ্ধতা ও যৎসামান্য বাজেটের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজস্ব উদ্যোগে আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনের মাধ্যমে যে মানের গবেষণা ও প্রকাশনা (পাবলিকেশন) করছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এর পাশাপাশি আমাদের আত্মসমালোচনাও করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সময় দেওয়া এবং গবেষণায় আরও নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ও মানসম্মত অর্জন সম্ভব।’’
উল্লেখ্য, সামগ্রিক ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১–১,০০০ স্তরে স্থান পেয়েছে, যা এই সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সমান পয়েন্ট নিয়ে এই স্তরে দেশের আরও ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করছে। এর আগে, ২০২৫ সালের র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ১০০১-১২০০ স্তরে। সেই তুলনায় এবার গবেষণার অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান হয়েছে।
বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বৈশ্বিক তালিকায় এবার ১১৫টি দেশ ও অঞ্চলের ২ হাজার ১৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় পাবলিক ও প্রাইভেট মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম স্থান পেয়েছে।
তবু আমরা প্রায়ই শুনি যে, গবেষণা হয় না। উচ্চমানের তো একদমই নয়। আসলেই কি হয় না–
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কো-অর্ডিনেশন ও মনিটরিং সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে, এটি খুব স্পষ্ট। আমি যদি আমার আশেপাশের ৫০ জন শিক্ষকের দিকে তাকাই প্রত্যেকেরই অন্ততঃ ১/২টা করে পাবলিকেশন প্রতিবছর হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই আছেন। এইখানে একটা সংস্কৃতিগত পরিবর্তন ঘটেছে। আমি যদি ১৫ বছর আগে যাই, তখন একজন গবেষকের ধারণা ছিল যে আমার একটা পাবলিকেশন করলেই হবে। সেটা সে যেকোনো জায়গায় করে ফেলতো। কিন্তু এখন এই সচেতনতা গবেষকদের খুব ভালোভাবে এসেছে যে আমার পেপারটা একটা ভালো প্লাটফর্মে যাক, আমার আর্টিকেলটা একটা ভালো প্লাটফর্মে পাবলিশ হোক। এখন কি-১ লেভেলের জার্নালে আমাদের গবেষকরা প্রকাশ করছেন।
গবেষণা হলেও যতটা হওয়া প্রয়োজন, ততটা হয় না। এ নিয়ে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মধ্যেই অসন্তোষ আছে। তারা বলছেন, অনেক সংকট ডিঙিয়ে গবেষণা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগেই গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়।

ঢাবির উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন , ‘‘আমাদের এইখানে অধিকাংশ গবেষণা ব্যক্তিগত গবেষণা। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা খুব সামান্য। যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সেগুলোও ব্যক্তি উঠসাহের কারণে। ব্যক্তি গবেষণা কতটা উপরে নিয়ে যেতে পারে রাষ্ট্রকে দেশকে এসব বিশ্ববিদ্যায়কে? আপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক দিতে হবে। দেশি ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দিতে হবে। সরকার যত বেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ফান্ড দিবে গনেষণার জন্য ততো বেশি ভালো আউটকাম আসবে। ভালো গবেষণা হবে। এর জন্য জবাবদিহিতাও লাগবে।’’
টাইমস হায়ার এডুকেশনের তথ্য বলছে ২০২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতি করেছে। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক স্কোর গত বছরের ৩১.৫-৩৪.৩ থেকে বেড়ে ৩৮.৩-৪০.১ হয়েছে। এই সময়ে গবেষণার গুণগত মান সূচকে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখা গেছে। এই সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ৬৭.২ থেকে ৭৬.৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
কিন্তু শিল্প-সম্পৃক্ততায় বেশ পিছিয়ে। সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির সাথে যৌথ কাজ এবং গবেষণার বাস্তব প্রয়োগের সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ২১.৪ থেকে বেড়ে ৩৩.২ পয়েন্ট হয়েছে। আবার গবেষণার পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ গবেষণার লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত মান ১০.৩ থেকে উন্নত হয়ে ১৩.৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংকট প্রবল। বিশেষত ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশনে বেশ পিছিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ গবেষণার ক্ষেত্রে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকরা। এ বিষয়ে ড. কাজী মতিন উদ্দিন বলেন, ‘‘এইখানে আরেকটা বিষয় যেটা অন্যান্য দেশে হয়, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনে গবেষণা। ইন্ডাস্ট্রি একটা প্রোডাক্ট তৈরি করবে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদেরে সঙ্গে মিলে যদি কাজ করে। তাদের যদি ফান্ড দেয় যে আমাদের এইরকম একটা প্রোডাক্ট তৈরি করে দাও। আমাদের এইখানে এই জায়গাটা খুব দুর্বল।’’
অন্যদিকে শিক্ষাদান পদ্ধতি সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০.১ থেকে কমে ১৭.৭ পয়েন্ট এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি সূচকে ৪৮.৩ থেকে কমে ৪৫ পয়েন্ট হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামোগত এবং শিক্ষার্থী–শিক্ষক অনুপাতে। এর প্রভাব আবার গিয়ে পড়ছে গবেষণা ক্ষেত্রেও। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ না থাকায় শিক্ষকদের অনেক বেশি শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, প্রশ্ন প্রণয়ন, পরীক্ষাসহ দৈনন্দিন কাজে সময় দিতে হয়। এতে গবেষণায় সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, ‘‘আমাদের শিক্ষকদের সময় নাই। আমাদের কোনো টিচার অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ) দেওয়া হয় না, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট দেওয়া হয় না। আমাদের যেসব কাজ করতে হয় সেটা পৃথিবীর কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের করতে হয় না। অ্যাটেন্ডেন্স-মিডটার্মের খাতার নম্বর তোলা থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত যেহেতু আমাদের ছাত্র সংখ্যা অনেক বেশি আমাদের কাজের লোড অনেক বেশি।’’

আর তহবিল সংকটের কথা তো গবেষকরা প্রতিনিয়ত বলেই যাচ্ছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্যই। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন গবেষণা বরাদ্দ নিয়ে আক্ষেপের সুরে চরচাকে বলেন, ‘‘রিসার্চের সাথে জড়িত হচ্ছে ফান্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের ফান্ড (বাজেট) হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। স্যরি টু সে, আমরা প্রায় ২ হাজার টিচার, ৮০টার মতো ডিপার্টমেন্ট, গবেষণা কেন্দ্র আছে ৫০টার উপরে। আপনি যদি এটাকে ভাগ করেন কয় লাখ টাকা করে পড়ে চিন্তা করে দেখেন। সেটা দিয়ে রিসার্চ হয় না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আমি জাপানে যে প্রফেসরের ল্যাবে কাজ করে আসছি, সেই একটা ল্যাবের এক বছরের বাজেট ছিল ১১ কোটি টাকা।’’
অন্যদিকে অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘‘ফান্ডিং আলটিমেটলি ক্রিয়েটিং দ্যা ফ্যাসিলিটিস। ফান্ডিং না থাকলে আপনি ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে পারবেন না। সুযোগ সুবিধা তৈরি করতে পারবেন না। ফান্ডিং না থাকলে আপনি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারবেন না। শিক্ষার্থীরা না থাকলে আপনি গবেষণা করবেন কীভাবে, করাবেন কাকে দিয়ে। সবকিছুর পর এইখানে গবেষণা করার লোক আছে। এক কথায় এইখানে রিসার্চ হয়। লিমিটেড ফ্যাসিলিটিস ব্যবহার করে এইখানে যে গবেষণা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশ হচ্ছে।’’
আছে গবেষণা কাজের স্বীকৃতির অভাব এবং এসব কার্যক্রম সমন্বয়ে কার্যকরি পদক্ষেপের দুর্বলতা। এ বিষয়ে অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘গবেষকদের কাজের স্বীকৃতি নাই। একটা সামাজিক সম্মান দরকার গবেষকদের। এইটা কিন্তু হচ্ছেই না। রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করতে হবে। আমরা একুশে পদক দিই, স্বধীনতা পদক দিই কিন্তু গবেষণাকে যথার্থ মূল্যায়ণের মাধ্যমে যদি পুরষ্কৃত করা হয় তাহলে গবেষণার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে।’’
ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘পুরষ্কৃত করতে না পারলে অন্তত স্বীকৃতি দেয় সেটাও কিন্তু ভালো। বুয়েটের কথা যদি আপনি চিন্তা করেন, দুইটা সেন্ট্রাল বডি আছে। গবেষণার জন্য একটা এবং কনসালট্যান্সির জন্য একটা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো বডি নাই। প্রকৃতপক্ষে যারা গবেষণা করে সেই গবেষকদের নিয়ে যদি সেন্ট্রাল একটা স্ট্রাকচার করা যায়, গবেষকদের মূল্যায়ণ এবং তাদের ইনসেন্টিভ দেওয়া। সে রকম করতে পারলে খুব ভালো হয়।
নেই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ইন্ডেক্সে গবেষকদের একসেস। ফলে ইম্প্যাক্টফুল গবেষণার কাজ ডিজাইন এবং তার ঘাটতি বের করা কঠিন হয়ে যায়। আর সাম্প্রতিক সময়ে আমলাদের গবেষণা কাজে সম্পৃক্ততার ফলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে গবেষণার ফান্ডিং। এতে দেশের উচ্চশিক্ষা পথ হারিয়েছে এমন উদ্বেগ জানাচ্ছেন এই ঢাবির শিক্ষক। এখন সামরিক-বেসামরিক আমলাদের মধ্যে একাডেমিক হয়ে হঠার এক ধরণের চেতনা দেখা যাচ্ছে। এটা আসলে খুবই নেগেটিভ । আমি মনে করি না উনাদের এই লাইনে আসার দরকার আছে। দুই একজন ব্যতিক্রম হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশে যাওয়ার ফান্ডটা ভাগ হয়ে গেছে। আগে এই ফান্ডটা পুরাটাই ছিল ইউনিভার্সিটির টিচারদের যারা নিয়মিয়ত গবেষণা করবেন তাদের জন্য। এখন ভাগ হয়ে গেছে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে হঠাৎ করে যারা মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি করতে চান অনিয়মিত গবেষকদের জন্য। এসব কিছু মিলে দেশের উচ্চশিক্ষা আসলে পথ হারিয়েছে।
তবুও স্কোপাস ডেটাবেজের সর্বশেষ পরিসংখ্যান কিছুটা আশার আলো দেখায়। আগেই বলেছি, ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানটি ধরে রেখেছে। তবে সমসাময়িক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আরও উন্নতির দিকে তাকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানতে চাইলে ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘‘আমি যখন বিদেশে পিএইচডি করতাম যেসব জার্নালে আমাদের পেপার পাবলিশ করতাম এখন আমার ছাত্ররা তাদের পেপার পাবলিশ করছে সেসব জায়গায়। এই জন্য আমার মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আগের থেকে অনেক অনেক ভালোর দিকে। কিন্তু তারপরেও বর্তমান পৃথিবী যেভাবে আগাচ্ছে তার সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো আমরা একটু পিছিয়ে আছি। কারণ আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে গবেষণা করার জন্য এর আনুষাঙ্গিক অনেক জিনিসপত্র লাগে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি জানি অনেক মডার্ন ইকুইপমেন্ট মেশিনারিজ দরকার হয়। এই সুবিধাগুলো আমরা ঠিকমতো যোগান দিতে পারিনি।’’
অধ্যাপক ড. আবদুস সালামের কথার যথার্থতা পাওয়া গেল পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রেকর্ড সংখ্যক মার্কসসহ অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম আরাফাত রহমানের কথায়। মাস্টার্সের থিসিস এখনো চলছে তবে আরাফাত কিউ-১ জার্নালে ২টি এবং কিউ-২ জার্নালে দুটি মিলে মোট ৪টি গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী চরচাকে বলেন, ‘‘আমার প্রথম পেপারটা প্রকাশ হয় ন্যাচারে বিজ্ঞান বিভাগে। মেইনলি এটা ছিল সোলার সেল ও এটার থারমো ইলেক্ট্রিক প্রোপারটিজ নিয়ে আর দ্বিতীয়টি ছিল সেমি-মেটালিক সুপারকনডাক্টিভিটি নিয়ে। আরাফাত জানান, তৃতীয় বর্ষের শেষে এক শিক্ষকের পরামর্শে কাজ শুরু করলে চতুর্থ বর্ষের শেষে এসে কিউ-১ জার্নালে পেপারটি প্রকাশ হয়।’’
এখন পর্যন্ত স্কোপাস ডেটাবেজের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ১,৭৩১ থেকে ১,৭৪৫টি বৈজ্ঞানিক নথিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৫০০ টি এবং তার আগের বছর ২০২৩ সালে এই প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ১,৪১০টি। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মূলত সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। এই প্রবণতাকে এগিয়ে নিতে হলে গবেষকদের চিহ্নিত সংকটগুলো সমাধানের পাশপাশি দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর গবেষণা সংস্কৃতির পরিবর্তন।
এই কথাই বলছেন অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘‘এটা এমন না যে আমাদের বিল্ডিং লাগবে, আমার কাছে মনে হয় যে একটা বড় পরিবর্তনের দরকার আছে। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব। এটা খুবই দুঃখজনক হবে যদি এতোকিছুর পরেও আমরা গবেষণার সংস্কৃতিটা পরিবর্তন করতে না পারি। এটার অন্যতম স্টেপিংস্টোন হবে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এলাউ করা।’’

টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এর ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্স র্যাঙ্কিং’-এ অনন্য গৌরব অর্জন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহুমুখী যৌথ গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষিণ এশিয়ায় ১ম এবং বিশ্বজুড়ে ৫২তম স্থান অধিকার করেছে। এ ছাড়া, টাইমস হায়ার এডুকেশনের এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ৩৮.৩ থেকে ৪০.১ পয়েন্ট পেয়ে ৩০১-৩৫০ তম স্তরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাথে যৌথভাবে দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ঢাবি।
তবে আন্তর্জাতিক এই অর্জনেই কি সন্তুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা? নাকি আরও বহুদূর যাওয়ার সুযোগ রয়েছে?
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘সীমাবদ্ধতা ও যৎসামান্য বাজেটের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজস্ব উদ্যোগে আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনের মাধ্যমে যে মানের গবেষণা ও প্রকাশনা (পাবলিকেশন) করছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এর পাশাপাশি আমাদের আত্মসমালোচনাও করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সময় দেওয়া এবং গবেষণায় আরও নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ও মানসম্মত অর্জন সম্ভব।’’
উল্লেখ্য, সামগ্রিক ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১–১,০০০ স্তরে স্থান পেয়েছে, যা এই সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সমান পয়েন্ট নিয়ে এই স্তরে দেশের আরও ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করছে। এর আগে, ২০২৫ সালের র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ১০০১-১২০০ স্তরে। সেই তুলনায় এবার গবেষণার অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান হয়েছে।
বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বৈশ্বিক তালিকায় এবার ১১৫টি দেশ ও অঞ্চলের ২ হাজার ১৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় পাবলিক ও প্রাইভেট মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম স্থান পেয়েছে।
তবু আমরা প্রায়ই শুনি যে, গবেষণা হয় না। উচ্চমানের তো একদমই নয়। আসলেই কি হয় না–
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কো-অর্ডিনেশন ও মনিটরিং সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে, এটি খুব স্পষ্ট। আমি যদি আমার আশেপাশের ৫০ জন শিক্ষকের দিকে তাকাই প্রত্যেকেরই অন্ততঃ ১/২টা করে পাবলিকেশন প্রতিবছর হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই আছেন। এইখানে একটা সংস্কৃতিগত পরিবর্তন ঘটেছে। আমি যদি ১৫ বছর আগে যাই, তখন একজন গবেষকের ধারণা ছিল যে আমার একটা পাবলিকেশন করলেই হবে। সেটা সে যেকোনো জায়গায় করে ফেলতো। কিন্তু এখন এই সচেতনতা গবেষকদের খুব ভালোভাবে এসেছে যে আমার পেপারটা একটা ভালো প্লাটফর্মে যাক, আমার আর্টিকেলটা একটা ভালো প্লাটফর্মে পাবলিশ হোক। এখন কি-১ লেভেলের জার্নালে আমাদের গবেষকরা প্রকাশ করছেন।
গবেষণা হলেও যতটা হওয়া প্রয়োজন, ততটা হয় না। এ নিয়ে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মধ্যেই অসন্তোষ আছে। তারা বলছেন, অনেক সংকট ডিঙিয়ে গবেষণা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগেই গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়।

ঢাবির উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন , ‘‘আমাদের এইখানে অধিকাংশ গবেষণা ব্যক্তিগত গবেষণা। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা খুব সামান্য। যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সেগুলোও ব্যক্তি উঠসাহের কারণে। ব্যক্তি গবেষণা কতটা উপরে নিয়ে যেতে পারে রাষ্ট্রকে দেশকে এসব বিশ্ববিদ্যায়কে? আপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক দিতে হবে। দেশি ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দিতে হবে। সরকার যত বেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ফান্ড দিবে গনেষণার জন্য ততো বেশি ভালো আউটকাম আসবে। ভালো গবেষণা হবে। এর জন্য জবাবদিহিতাও লাগবে।’’
টাইমস হায়ার এডুকেশনের তথ্য বলছে ২০২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতি করেছে। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক স্কোর গত বছরের ৩১.৫-৩৪.৩ থেকে বেড়ে ৩৮.৩-৪০.১ হয়েছে। এই সময়ে গবেষণার গুণগত মান সূচকে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখা গেছে। এই সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ৬৭.২ থেকে ৭৬.৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
কিন্তু শিল্প-সম্পৃক্ততায় বেশ পিছিয়ে। সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির সাথে যৌথ কাজ এবং গবেষণার বাস্তব প্রয়োগের সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ২১.৪ থেকে বেড়ে ৩৩.২ পয়েন্ট হয়েছে। আবার গবেষণার পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ গবেষণার লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত মান ১০.৩ থেকে উন্নত হয়ে ১৩.৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংকট প্রবল। বিশেষত ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশনে বেশ পিছিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ গবেষণার ক্ষেত্রে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকরা। এ বিষয়ে ড. কাজী মতিন উদ্দিন বলেন, ‘‘এইখানে আরেকটা বিষয় যেটা অন্যান্য দেশে হয়, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনে গবেষণা। ইন্ডাস্ট্রি একটা প্রোডাক্ট তৈরি করবে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদেরে সঙ্গে মিলে যদি কাজ করে। তাদের যদি ফান্ড দেয় যে আমাদের এইরকম একটা প্রোডাক্ট তৈরি করে দাও। আমাদের এইখানে এই জায়গাটা খুব দুর্বল।’’
অন্যদিকে শিক্ষাদান পদ্ধতি সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০.১ থেকে কমে ১৭.৭ পয়েন্ট এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি সূচকে ৪৮.৩ থেকে কমে ৪৫ পয়েন্ট হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামোগত এবং শিক্ষার্থী–শিক্ষক অনুপাতে। এর প্রভাব আবার গিয়ে পড়ছে গবেষণা ক্ষেত্রেও। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ না থাকায় শিক্ষকদের অনেক বেশি শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, প্রশ্ন প্রণয়ন, পরীক্ষাসহ দৈনন্দিন কাজে সময় দিতে হয়। এতে গবেষণায় সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, ‘‘আমাদের শিক্ষকদের সময় নাই। আমাদের কোনো টিচার অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ) দেওয়া হয় না, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট দেওয়া হয় না। আমাদের যেসব কাজ করতে হয় সেটা পৃথিবীর কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের করতে হয় না। অ্যাটেন্ডেন্স-মিডটার্মের খাতার নম্বর তোলা থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত যেহেতু আমাদের ছাত্র সংখ্যা অনেক বেশি আমাদের কাজের লোড অনেক বেশি।’’

আর তহবিল সংকটের কথা তো গবেষকরা প্রতিনিয়ত বলেই যাচ্ছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্যই। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন গবেষণা বরাদ্দ নিয়ে আক্ষেপের সুরে চরচাকে বলেন, ‘‘রিসার্চের সাথে জড়িত হচ্ছে ফান্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের ফান্ড (বাজেট) হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। স্যরি টু সে, আমরা প্রায় ২ হাজার টিচার, ৮০টার মতো ডিপার্টমেন্ট, গবেষণা কেন্দ্র আছে ৫০টার উপরে। আপনি যদি এটাকে ভাগ করেন কয় লাখ টাকা করে পড়ে চিন্তা করে দেখেন। সেটা দিয়ে রিসার্চ হয় না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আমি জাপানে যে প্রফেসরের ল্যাবে কাজ করে আসছি, সেই একটা ল্যাবের এক বছরের বাজেট ছিল ১১ কোটি টাকা।’’
অন্যদিকে অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘‘ফান্ডিং আলটিমেটলি ক্রিয়েটিং দ্যা ফ্যাসিলিটিস। ফান্ডিং না থাকলে আপনি ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে পারবেন না। সুযোগ সুবিধা তৈরি করতে পারবেন না। ফান্ডিং না থাকলে আপনি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারবেন না। শিক্ষার্থীরা না থাকলে আপনি গবেষণা করবেন কীভাবে, করাবেন কাকে দিয়ে। সবকিছুর পর এইখানে গবেষণা করার লোক আছে। এক কথায় এইখানে রিসার্চ হয়। লিমিটেড ফ্যাসিলিটিস ব্যবহার করে এইখানে যে গবেষণা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশ হচ্ছে।’’
আছে গবেষণা কাজের স্বীকৃতির অভাব এবং এসব কার্যক্রম সমন্বয়ে কার্যকরি পদক্ষেপের দুর্বলতা। এ বিষয়ে অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘গবেষকদের কাজের স্বীকৃতি নাই। একটা সামাজিক সম্মান দরকার গবেষকদের। এইটা কিন্তু হচ্ছেই না। রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করতে হবে। আমরা একুশে পদক দিই, স্বধীনতা পদক দিই কিন্তু গবেষণাকে যথার্থ মূল্যায়ণের মাধ্যমে যদি পুরষ্কৃত করা হয় তাহলে গবেষণার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে।’’
ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘পুরষ্কৃত করতে না পারলে অন্তত স্বীকৃতি দেয় সেটাও কিন্তু ভালো। বুয়েটের কথা যদি আপনি চিন্তা করেন, দুইটা সেন্ট্রাল বডি আছে। গবেষণার জন্য একটা এবং কনসালট্যান্সির জন্য একটা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো বডি নাই। প্রকৃতপক্ষে যারা গবেষণা করে সেই গবেষকদের নিয়ে যদি সেন্ট্রাল একটা স্ট্রাকচার করা যায়, গবেষকদের মূল্যায়ণ এবং তাদের ইনসেন্টিভ দেওয়া। সে রকম করতে পারলে খুব ভালো হয়।
নেই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ইন্ডেক্সে গবেষকদের একসেস। ফলে ইম্প্যাক্টফুল গবেষণার কাজ ডিজাইন এবং তার ঘাটতি বের করা কঠিন হয়ে যায়। আর সাম্প্রতিক সময়ে আমলাদের গবেষণা কাজে সম্পৃক্ততার ফলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে গবেষণার ফান্ডিং। এতে দেশের উচ্চশিক্ষা পথ হারিয়েছে এমন উদ্বেগ জানাচ্ছেন এই ঢাবির শিক্ষক। এখন সামরিক-বেসামরিক আমলাদের মধ্যে একাডেমিক হয়ে হঠার এক ধরণের চেতনা দেখা যাচ্ছে। এটা আসলে খুবই নেগেটিভ । আমি মনে করি না উনাদের এই লাইনে আসার দরকার আছে। দুই একজন ব্যতিক্রম হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশে যাওয়ার ফান্ডটা ভাগ হয়ে গেছে। আগে এই ফান্ডটা পুরাটাই ছিল ইউনিভার্সিটির টিচারদের যারা নিয়মিয়ত গবেষণা করবেন তাদের জন্য। এখন ভাগ হয়ে গেছে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে হঠাৎ করে যারা মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি করতে চান অনিয়মিত গবেষকদের জন্য। এসব কিছু মিলে দেশের উচ্চশিক্ষা আসলে পথ হারিয়েছে।
তবুও স্কোপাস ডেটাবেজের সর্বশেষ পরিসংখ্যান কিছুটা আশার আলো দেখায়। আগেই বলেছি, ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানটি ধরে রেখেছে। তবে সমসাময়িক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আরও উন্নতির দিকে তাকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানতে চাইলে ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘‘আমি যখন বিদেশে পিএইচডি করতাম যেসব জার্নালে আমাদের পেপার পাবলিশ করতাম এখন আমার ছাত্ররা তাদের পেপার পাবলিশ করছে সেসব জায়গায়। এই জন্য আমার মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আগের থেকে অনেক অনেক ভালোর দিকে। কিন্তু তারপরেও বর্তমান পৃথিবী যেভাবে আগাচ্ছে তার সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো আমরা একটু পিছিয়ে আছি। কারণ আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে গবেষণা করার জন্য এর আনুষাঙ্গিক অনেক জিনিসপত্র লাগে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি জানি অনেক মডার্ন ইকুইপমেন্ট মেশিনারিজ দরকার হয়। এই সুবিধাগুলো আমরা ঠিকমতো যোগান দিতে পারিনি।’’
অধ্যাপক ড. আবদুস সালামের কথার যথার্থতা পাওয়া গেল পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রেকর্ড সংখ্যক মার্কসসহ অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম আরাফাত রহমানের কথায়। মাস্টার্সের থিসিস এখনো চলছে তবে আরাফাত কিউ-১ জার্নালে ২টি এবং কিউ-২ জার্নালে দুটি মিলে মোট ৪টি গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী চরচাকে বলেন, ‘‘আমার প্রথম পেপারটা প্রকাশ হয় ন্যাচারে বিজ্ঞান বিভাগে। মেইনলি এটা ছিল সোলার সেল ও এটার থারমো ইলেক্ট্রিক প্রোপারটিজ নিয়ে আর দ্বিতীয়টি ছিল সেমি-মেটালিক সুপারকনডাক্টিভিটি নিয়ে। আরাফাত জানান, তৃতীয় বর্ষের শেষে এক শিক্ষকের পরামর্শে কাজ শুরু করলে চতুর্থ বর্ষের শেষে এসে কিউ-১ জার্নালে পেপারটি প্রকাশ হয়।’’
এখন পর্যন্ত স্কোপাস ডেটাবেজের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ১,৭৩১ থেকে ১,৭৪৫টি বৈজ্ঞানিক নথিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৫০০ টি এবং তার আগের বছর ২০২৩ সালে এই প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ১,৪১০টি। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মূলত সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। এই প্রবণতাকে এগিয়ে নিতে হলে গবেষকদের চিহ্নিত সংকটগুলো সমাধানের পাশপাশি দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর গবেষণা সংস্কৃতির পরিবর্তন।
এই কথাই বলছেন অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘‘এটা এমন না যে আমাদের বিল্ডিং লাগবে, আমার কাছে মনে হয় যে একটা বড় পরিবর্তনের দরকার আছে। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব। এটা খুবই দুঃখজনক হবে যদি এতোকিছুর পরেও আমরা গবেষণার সংস্কৃতিটা পরিবর্তন করতে না পারি। এটার অন্যতম স্টেপিংস্টোন হবে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এলাউ করা।’’