চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক সংস্কারক ঝু রংজির মরদেহ দাহ করেছে চীন। একই সঙ্গে তার মৃত্যুতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। গত সপ্তাহে ৯৭ বছর বয়সে মারা যান এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাকে নিয়ে রয়েছে মিশ্র ধারণা। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ এই মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে যথারীতি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ও সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে শোক প্রকাশ করতে দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো–শোক প্রকাশেও কেন এই নিয়ন্ত্রণ?
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, ঝু রংজির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য মঙ্গলবার শহরজুড়েই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশেষ করে তিয়েনআনমেন স্কয়ার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র ঝংনানহাইয়ের আশপাশে নিরাপত্তা ছিল সবচেয়ে বেশি।
সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এবং পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির অপর ছয় সদস্য নীরবে দাঁড়িয়ে ঝুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর বেইজিংয়ের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও জাতীয় বীরদের জন্য নির্ধারিত কবরস্থানে ঝুর মরদেহ দাহ করা হয়।
কিন্তু সবকিছুতেই এক ধরনের মাপা মাপা ব্যাপার। চীনের সাবেক কোনো নেতার মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে এমন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নতুন নয়। এর কারণও আছে। সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ঝু রংজির মৃত্যু নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কারণটা একটু দেখে নেওয়া যাক।
জটিল উত্তরাধিকার
১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝু ১৯৯০-এর দশকে চীনের কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, কর ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও কঠোর করেন এবং রাষ্ট্রীয় খাতে ব্যাপক পুনর্গঠন চালান। ফলে লোকসানে চলা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত হয়।
এই সংস্কারগুলো ২০০১ সালে চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগদানের পথও সহজ করে দেয়। এর মাধ্যমে চীন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার পথে এগোয়।
১৯৮৮ সালে মেয়র হওয়ার আগে চীনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাংহাইয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে ঝু বলেছিলেন, “আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও আমার পথনির্দেশক নীতি হলো স্বাধীনভাবে চিন্তা করা। আমি বিশ্বাস করি, যা সত্যিই ভাবি, তা আমার বলা উচিত।”
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে মাত্র তিন মিনিটের একটি অসতর্ক বক্তৃতার কারণে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ হারিয়েছিলেন ঝু। এমনটাই তিনি জানিয়েছিলেন। প্রায় দুই দশক পর তার সদস্যপদ পুনর্বহাল করা হয়।
২০১১ সালে তার বক্তব্যের চার খণ্ডের সংকলন প্রকাশিত হলে পাঠকেরা তার ব্যবহৃত ‘টোফু ড্রেগস’ শব্দবন্ধ নিয়ে বিস্মিত হন। নিম্নমানের নির্মাণকাজ বোঝাতে তিনি এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত ‘পরজীবীরা’ নিম্নমানের বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ করেছে। ভুল করা ব্যাংকারদের তিনি ‘অর্ধবুদ্ধি’ বলেও অভিহিত করেছিলেন।
তার মৃত্যুর খবরে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। তবে কেউ কেউ তার মৃত্যুতে স্বস্তিও প্রকাশ করেছে।
চীনের এক্সের সমতুল্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে পরে মুছে ফেলা এক পোস্টে একজন লিখেছিলেন, “ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের সন্তান হিসেবে আজ রাতে আমাকে এক পেয়ালা পানীয় তুলতেই হবে।”
আরেকজন ঝুকে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর জন্য ‘প্রধান দায়ী ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করেন। তবে অন্যরা কঠোর হাতে সংস্কার পরিচালনাকারী এই প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করে।
২০০১ সালে ঝু নিজেই বলেছিলেন, “আমি জানি, চীনে আমার মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আমাকে পছন্দ করেন।”
তবে তিনি আরও বলেছিলেন, “আবার এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা আমাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেন। কীভাবে একজন মানুষকে সবাই ভালোবাসাতে পারে?”
নিয়ন্ত্রিত শোক
গত এক দশকে মারা যাওয়া অন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মতো ঝুর মৃত্যুতেও চীন সংযত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শোক প্রকাশের সুযোগ রেখেছে। বাড়তি নিরাপত্তা, নজরদারি ও সেন্সরশিপের মধ্যে জনগণের শোক প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কেন এই নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সরশিপ? কারণ, চীনা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে, জনপ্রিয় সাবেক নেতাদের মৃত্যু ব্যাপক জনআবেগের জন্ম দিতে পারে। কখনো কখনো মৃত নেতার স্মরণ ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় রূপ নিয়ে অস্থিতিশীলতারও কারণ হতে পারে।
১৯৭৬ সালে চীনের প্রথম এবং ব্যাপক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর পর বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও আশপাশের সড়কগুলোতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। তাদের শোক ক্রমে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বাড়াবাড়ি এবং এর সঙ্গে যুক্ত কট্টরপন্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ নেয়।
১৯৮৯ সালে সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণ সম্পাদক হু ইয়াওবাং, যাকে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা হতো, তার মৃত্যু গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। সেই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নে পরিণত হয়।
এ কারণেই এত সংযম, নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ। যদিও বাড়তি নজরদারি ঝু রংজিকে ঘিরে স্মৃতিচারণের প্রবাহ থামাতে পারেনি।
৩৯ বছর বয়সী আইটি কর্মী ঝাও যেমন বলেছেন, “মানুষ এখনো তাকে নিয়ে বেশ নস্টালজিয়ায় ভোগে... এবং কেউ কেউ সত্যিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন, প্রায় চোখে পানি এসে যাচ্ছিল।”
সেন্সরশিপ বিবেচনায় নিজের পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়া এই আইট কর্মী রয়টার্সকে বলেন, ঝুর মৃত্যু মানুষকে প্রায় ২০ বছর আগের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে–যখন চীন সংস্কার গ্রহণ করে বিশ্বের জন্য নিজেদের অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত করতে শুরু করেছিল এবং অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বাড়ছিল।