বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশ আর ভিন্নমত চর্চার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিভাজনকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা। শিক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, ‘ভয় দেখানোর সংস্কৃতি’ এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘নিউ নরমাল’ হয়ে উঠেছে। এমনটাই উঠে এসেছে ব্রিটিশ সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর এক প্রতিবেদনে।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সমর্থনের অভিযোগে ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং আরও চার শিক্ষককে একাডেমিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি।
এখানেই শুরু হয় নতুন বিতর্ক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এসব পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তারা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করছে না। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যথাযথ প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরই ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এই পরিস্থিতি ছড়িয়েছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। গত এক মাসে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে অভিযোগ ওঠা শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্ত করতে কমিটি গঠন করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এর মধ্যেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। তার ভাষায়, এটি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধেরই একটি অংশ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তার কাছে ‘অপ্রত্যাশিত নয়’। তবে কুগেলম্যানের প্রশ্ন, পরিস্থিতিটি কতটা শুধু শিক্ষকদের নিজেদের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে?
তার মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলটি অন্তত প্রকাশ্যে অতীতের প্রতিশোধমূলক রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও ‘ইতিবাচক একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন’।
সেই জায়গা থেকেই কুগেলম্যানের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা বিস্ময়কর। তিনি বলেন, নতুন সরকার প্রকাশ্যে যে ধরনের অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এখন এ ধরনের ঘটনা দেখা যাওয়া ‘লক্ষণীয়’।
আরেকটি বিষয়ও তার নজরে এসেছে—২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা। কুগেলম্যানের মতে, এত সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন রাখতে পারেন—এমন ধারণা থেকেই বোঝা যায়, দলটির প্রতি ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থন’ এখনও থাকতে পারে। অথচ অনেকেই মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভিত্তি ‘ধ্বংস হয়ে গেছে’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টাইমস হায়ার এডুকেশনকে জানান, সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ২৩১ শিক্ষকের ‘বিস্ময়কর’ তালিকা প্রকাশ আসলে ‘অসহিষ্ণুতার বৃদ্ধি’র প্রমাণ।
তার অভিযোগ আরও সরাসরি। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষই নোংরা রাজনীতি করছে।”
ওই শিক্ষকের প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করাই যদি বেআইনি না হয়, তাহলে শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এসব ব্যবস্থা কীভাবে ন্যায্যতা পায়? কারও বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ভয় দেখানোর সংস্কৃতি’ এখন নিউ নরমাল হয়ে উঠেছে। আর এই পরিস্থিতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। এই উদ্বেগের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাও যোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিনাত হুদা। তিনিও ২৩১ জনের তালিকায় রয়েছেন।
জিনাত হুদার ভাষায়, শিক্ষক সমাজের মধ্যে যা ঘটছে, তা ‘খুবই ভয়াবহ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল্যবোধগুলো মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে, সেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ‘হারিয়ে যাচ্ছে বা অনুপস্থিত’।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়েও। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের কারণে একজন শিক্ষক কতটা নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবেন, আর অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াই বা কতটা স্বচ্ছ থাকবে।