রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে গত কয়েক মাসে একাধিক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। প্রশাসনের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাতাহাতি, শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে উত্তেজনা এবং প্রকাশ্য সভায় ক্ষোভ প্রকাশ– সব মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার নাম বারবার আলোচনা ও সমালোচনায় এসেছে।
আম্মারনামা: কখন কী কারণে বিতর্কে
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সালাহউদ্দিন আম্মারের আচরণকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল’ বলে অভিযোগ তোলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। সংগঠনটির দাবি ছিল, আম্মারের আচরণ ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করছে। এ অভিযোগের পর থেকেই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে আলোচিত চরিত্র হিসেবে সামনে আসেন।
এরপর ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ইস্যুতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পোষ্য কোটায় ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করে। ওই দিন দিনভর অনশন, ধস্তাধস্তি, উপ-উপাচার্যকে অবরুদ্ধ রাখা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব রাতের দিকে এসে পোষ্য কোটা স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সিন্ডিকেট সভার ঘোষণা দেন।
পোষ্য কোটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওই দিনের উত্তেজনায় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার সঙ্গে সালাহউদ্দিন আম্মারের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই সময় জুবেরী ভবন ও উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
পরের ঘটনা ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বরের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদের সঙ্গে সালাহউদ্দিন আম্মারের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের একটি ফাইল নিয়ে জটিলতার কথা জানিয়ে আম্মার রেজিস্ট্রারের দপ্তরে যান। তখন সেখানে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয় এবং সেই ঘটনার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময়ে আম্মার দাবি করেন, রেজিস্ট্রার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং তিনি প্রতিনিধি হিসেবে বিষয়টি যাচাই করতে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম বলেন, আম্মার অনুমতি ছাড়া তার দপ্তরে ঢুকে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ ঘটনায় জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া আসে।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণভোটবিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় সালাহউদ্দিন আম্মার হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ শিক্ষকের নাম ঘোষণা করেন। সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি উপস্থিত কিছুসংখ্যক ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পরে ১৬১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দেন।
ওই দিন তিনি দাবি করেন, তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের কেউ কেউ জুলাই আন্দোলনে বিরোধিতা করেছেন, কেউ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, আবার কেউ পুলিশের হামলায় মদদ দিয়েছেন। উপাচার্য পরে তাকে থামানোর চেষ্টা করেন এবং অনুষ্ঠান শেষে কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। পরে আম্মার সংবাদ সম্মেলন করে ওই ১৬১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এরপর ২০২৬ সালের ২ মার্চ রাকসু ভবনে ছাত্রঅধিকার পরিষদের নেতা মেহেদী মারুফের সঙ্গে আম্মারের বাকবিতণ্ডা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি মন্তব্য, বিশেষ করে ‘চুলকানি শুরু? মলমের নাম নুরু’ ধরনের পোস্টকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে দুই পক্ষই একে অন্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
গত ১৭ জুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ প্রদর্শনের সময় হল সংসদের এক নেতাকে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে। লতিফ হল সংসদের জিএস নূরুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অভিযোগ করেন যে, খেলা দেখতে বসার পর আম্মার তাকে স্থান ছেড়ে দিতে বলেন এবং একপর্যায়ে তার গেঞ্জির কলার ধরে টান দেন।
তবে সালাহউদ্দিন আম্মার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। তার দাবি, মাঠের শৃঙ্খলা ও নির্ধারিত জায়গার শর্ত ঠিক রাখতেই নুরুল ইসলামকে স্থান পরিবর্তনের অনুরোধ করা হয়েছিল।
সবশেষে গত ২৭ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে। প্রক্টর কার্যালয়ে তাদের ডাকার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে রাকসু ভবন ও লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে সংঘর্ষে একজন রাকসু প্রতিনিধিসহ তিনজন আহত হন।
সব মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সালাহউদ্দিন আম্মার এখন এমন এক নাম, যাকে ঘিরে প্রশাসন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন চলছেই। তার সমর্থকরা ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখালেও সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনায় তার ভূমিকাই বারবার বিতর্ক বাড়িয়েছে।
রাকসু ভিপির বক্তব্য ও আম্মারের সমর্থন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ও ছাত্রলীগের পক্ষে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ এনে বলেছেন, এমন সব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘আমরা ব্যবস্থা নেব।’ এর প্রতিবাদে সংবাদমাধ্যম আজ ভিপির ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে, রাকসুর সব কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণাও দিয়েছে।
তবে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার আজ ভিপি জাহিদের সমর্থনেই বলেন, “রাকসু ভিপির কথা ক্লিয়ার। উনি যেটা বলছেন, ‘যারা এই যে ছাত্রলীগের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করতেছেন, তাদের ডকুমেন্টস জড়ো করে আমরা আপনাদের প্রয়োজনে বিচারের আওতায় নিয়ে আসব।’ তাতে তার ভুল কী আছে? এখানে উনি ভুল কী বলছেন? ইচ্ছা করে নিজেদের গায়ে কেন মাখায় নিচ্ছেন ব্যাপারটা? উনি মেনশন করছেন, যারা ছাত্রলীগকে পজিটিভলি দেখাইতে গিয়ে রাকসুকে নেগেটিভলি দেখাচ্ছেন, বা একটা প্রতিরোধকে আপনারা ‘হামলা’ বলতেছেন বা এই করতেছেন, এদেরকে শাস্তির আওতায় আনার কথা বলছেন। তো রাকসু ভিপির এখানে ভুল কোথায়? আর এখন রাকসু ভিপি কার কাছে ক্ষমা চাইবে?”
উল্টো রাকসু ভিপির তৈরি করা শর্তের মারপ্যাঁচেই সংবাদমাধ্যম ও অন্য রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের দিকে তির ছুঁড়লেন আম্মার, “প্রথম ব্যাপার হচ্ছে, রাকসু ভিপি বলছেন যে, যারা ছাত্রলীগের পক্ষে কথা বলতেছে…এখন তিন ছাত্র সংগঠন কি মেনেই নিল যে আমাদেরকে মিন করছে? ‘ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাইনি’ ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে কি না? সো, তারা এখন বলতেই পারে যে... কিন্তু আমি পার্সোনালি মনে করি না যে, রাকসু ভিপির এটা কোনোভাবেই উচিত যে আপনাদের—বা তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া।”
“কারণ রাকসু ভিপি মেনশন করে বলে নাই যে, ‘‘প্রেস ক্লাব’, ‘রাবিশা’, ‘সুরুক’…এরা (ছাত্রলীগের) পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করতেছে, এদের নামে মামলা দিব।’ রাকসু ভিপি কি এই কথা একবারও বলছে? এটা যদি না বলে থাকে, তাহলে কার কাছে মাফ চাইবে উনি? যাদের কাছে মাফ চাইবে, তাদেরকে এসে আরো স্টেটমেন্ট দিতে হবে যে, ‘হ্যাঁ, আমি ছাত্রলীগের পক্ষে সংবাদ করছি, এজন্য আমাকে রাকসু ভিপি হুমকি দিছে, এজন্য রাকসু ভিপি আমাদের কাছে মাফ চাইবে।’ এটা তাদেরকে ক্লিয়ার করতে হবে। তার মানে তারা তো মেনেই নিছে যে, তারা ছাত্রলীগের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করছে, বা ছাত্রলীগের পক্ষে তারা সম্মতি উৎপাদন করছে, বা শব্দ সন্ত্রাস ছড়াইছে।”
আম্মারের সমালোচনা সাবেক ভিপির
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সময় রাকসু একটা আদর্শ ছিল। রাকসুকে যারা প্রতিনিধিত্ব করত, প্রত্যেকের দেশ নিয়ে চিন্তা এবং এক ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছিল। তারা মনে করত যে, রাকসু ক্ষমতার জায়গা এবং এই ক্ষমতাটা ব্যবহার করতে হবে ছাত্রসমাজের কল্যাণে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য। অথচ বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতা ব্যবহার করছে নিজের কর্তৃত্ব এবং স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। ফলে এদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি সঠিক আচরণ বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কিচ্ছু নেই।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা শিক্ষকদের গুরু মনে করতাম। রাকসুর ভিপি হওয়ার পরও শিক্ষকরা যখন দাঁড়াতেন, তখন আমরা সিটে বসে থাকতাম না, দাঁড়িয়ে কথা বলতাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা নিয়েই আমরা কর্মব্যস্ত থাকতাম। অথচ এদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এরা শিক্ষার্থীদের চরম অনিশ্চয়তা ও সন্ত্রাসী ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যে সন্ত্রাস তারা নিজেরাই করছে।”
রাকসুর সাবেক এই ভিপি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আম্মার দ্বারা যা সংঘটিত হয়েছে, তা রাকসুর ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমার লজ্জা লাগছে যে এই রাকসুর আমরা ভিপি-জিএস ছিলাম! যে রাকসুকে তারা চরম সন্ত্রাসী ও নিপীড়নের বস্তুতে রূপান্তরিত করছে, তার সঙ্গে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী কিংবা শিক্ষা ও জ্ঞানের উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। আমি মনে করি, দ্রুত এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো।”
তিনি আরও বলেন, “একটি দুষ্ট মানুষের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে পারে না। প্রতিষ্ঠানকে দুষ্ট মানুষকে দমন করার কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং সেই সুযোগ রাকসুর বিধানে রয়েছে। দ্রুত শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করা উচিত এবং নতুন রাকসু নির্বাচনের আয়োজন করা দরকার। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব এলে অন্যায়-অবিচারের নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান প্রয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”