
‘আমরা জেনারেশন নাইন ইলাভেন’
ইতিহাসের পাতায় হয়তো ঘটনাটি এক দিনের। কিন্তু এর প্রভাব আমরা বহন করছি বছরের পর বছর ধরে–আমাদের চিন্তায়, প্রবাসে থাকা প্রিয়জনদের অভিজ্ঞতায়, নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় আর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।
কয়েক দিন আগে উত্তরবঙ্গে অবস্থিত একটি বিশেষায়িত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ‘পদত্যাগী’ শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে এক যুগ কাজ করে আসছিলেন।
কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষক একসময় সাংবাদিকতাও করতেন। সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তার কারণে তিনি শিক্ষকতায় যোগ দিলেও স্থিত হতে পারলেন না।
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি প্রিয় শিক্ষক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার লেখালেখি ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কর্তৃপক্ষের আপত্তি ছিল। একজন শিক্ষককে তার লেখালেখি বা সৃজনশীল কাজ নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা যায় না। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়ের সুযোগ নিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। তিনি এখনো বেকার।
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেখানে অনেক পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কলেজের অধ্যক্ষকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, অনেকে শিক্ষাঙ্গনেই অপদস্ত হয়েছেন, সেখানে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্র নেওয়া তো কোনো বিষয় নয়। এ রকম কত শিক্ষক যে সে সময়ে তাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তার হিসেব নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ছবি এসেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন ও লজ্জিত করে। যে জাতি শিক্ষককে মর্যাদা দিতে জানে না, সে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না।
তবে এই দুঃসময়েও কেউ কেউ সাহসের প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্যদের পথ দেখান। এ রকমই একজন শিক্ষক হলেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাকে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এর বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা করলে বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন যে, শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্র নেওয়া অবৈধ।
একই সঙ্গে আদালত জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন হাইকোর্ট।
এই আদেশের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক শিক্ষক যাদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল তাদেরও পুনর্বহালের পথ খুলে গেল। আর শুধু শিক্ষক কেন, সাংবাদিকসহ অনেক পেশার মানুষই সে সময় চাকরি হারিয়েছেন।
রায়ে আদালত বলেছেন, রিটকারীর (শিক্ষকের) পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল এবং এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন বা বিধি জোরপূর্বক বা চাপের মুখে প্রাপ্ত পদত্যাগ সমর্থন করে না।
মামলার বিবরণ থেকে আরও জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী আলকাছ উদ্দিন আহমেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পর দিন এ বিষয়ে তিনি কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে তিনি লিখিতভাবে আবেদন করেন। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করেন তিনি। পরে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করতে নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।
কিন্তু সেই আদেশ যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উপযুক্ত প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া ওই পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের আইনি কোনো বৈধতা ছিল না; রিট আবেদনকারী ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তার এমপিও অংশ (বেতন-ভাতা) পাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ (ম্যানেজিং কমিটি) আলকাছ উদ্দিনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল করতে আইনিভাবে বাধ্য এবং তিনি অবিলম্বে পুনর্বহাল হওয়ার অধিকারী ছিলেন।
পর্যবেক্ষণ বলা হয়েছে, আদালত মনে করেন, একটি নির্দেশনাসহ রুলটি নিষ্পত্তি করা হলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হলো। সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা রিটকারীকে পুনর্বহাল করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নির্দেশনা অমান্যকারী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের (যিনি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সচিব) এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সুযোগে একশ্রেণির লোক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ চারিতার্থ করতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব সন্ত্রাস করে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করে। কোনো কোনো শিক্ষক তাদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি নারী শিক্ষকেরাও এর থেকে রেহাই পাননি।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা অন্যায় করলে আইনানুগভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া যেত। কিন্তু সেসব না করে মব সহিংসতা করা হয়েছে। এই মবের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষক পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
গাজীপুরের ওই শিক্ষকের মতো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও যাদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে, তাদের জন্য আদালতের এই রায় একটি সুখবর হতে পারে। পরিস্থিতির চাপে যারা সে সময় আইনের আশ্রয় নিতে পারেননি, তারা এখন সুযোগটি নিতে পারেন।
তারপরও কথা থাকে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের কেউ কেউ হয়তো আইনের আশ্রয় নিয়ে ছিনতাই হওয়া পদ ফিরে পাবেন। কিন্তু যাদের জন্য তারা পদ ও মর্যাদা হারালেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের স্বার্থেই আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। যে দেশে জবরদস্তি করে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, সে দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ায়নি, যদিও ওই সরকারের দুজন শিক্ষা উপদেষ্টাই ছিলেন শিক্ষক। আশা করি নির্বাচিত সরকার শিক্ষকদের হতাশ করবে না; তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার করবে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা

‘আমরা জেনারেশন নাইন ইলাভেন’
ইতিহাসের পাতায় হয়তো ঘটনাটি এক দিনের। কিন্তু এর প্রভাব আমরা বহন করছি বছরের পর বছর ধরে–আমাদের চিন্তায়, প্রবাসে থাকা প্রিয়জনদের অভিজ্ঞতায়, নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় আর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

এইটিজের ফ্যাশনে মেতে পরিবেশের কী ক্ষতি করছেন জানেন?
আজ সকালে আমার বন্ধু বলছিল, ফেসবুক খুললেই সবাই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে ৮০’র দশকের মতো করে ছবি দিচ্ছে। জানতে চাইছিল–এসব নিয়ে আমার মতামত কী? আমি বললাম, “আমরা এমন একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবদিক থেকে; যেমন–বিদ্যুৎ নাই, গ্যাস নাই, বাজার মূল্য অনিয়ন্ত্রিত, চাঁদাবাজি, লং মার্চ, ফুটপাত দখল

রক্ত-মাংসের মানুষকে আস্ত গিলে খাওয়ার এক দেশে!
আত্মহত্যা বা আত্মহনন। এই কাজটি কোনো সমাজেই খুব একটা দুর্লভ কোনো বিষয় নয়। বরং সব ধরনের সমাজেই প্রবলভাবে বিরাজমান যেসব বৈশিষ্ট্য আমরা দেখি, সেগুলোর মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। সে কারণে আত্মহত্যার চেষ্টাও একটি পরিচিত ঘটনা। তবে কোন সমাজ এই দুটি কাজকে কোন দৃষ্টিতে দেখে বা বিবেচনা করে, সেটিই বলে দেয় কোন

আজও কেন প্রাসঙ্গিক অরওয়েলের ‘১৯৮৪’
জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর। তবে বইটিকে কেবল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। অরওয়েলের চিন্তার পেছনে ছিল ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান