সারা দেশেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই প্রাণহানিসহ আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। খুলনার অবস্থাও বেশ নাজুক। এমন পরিস্থিতির জন্য খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে নগর বিএনপি।
গত সোমবার এক সভায় এমনটা বললেও গতকাল মঙ্গলবার অভিযোগ অস্বীকার করেছে নগর বিএনপি। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কাউকে দায়ী করছে না। সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করছে।
এ বিষয়ে নগর বিএনপি সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা জানান, তিনি ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন না।
এদিকে, বিএনপির সভায় এ ধরনের মন্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, “এ ধরনের অযৌক্তিক অভিযোগ করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করা হচ্ছে।”
গতকাল মঙ্গলবার খুলনা প্রেস ক্লাবে খুলনা মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও ডেঙ্গু রোগীদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সম্মেলনে বিএনপির ছাড়াও ডক্টর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার খুলনা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সাদীর সভাপতিত্বে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নগর সভাপতি উপস্থিত ছিলেন না। তবে সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবি পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অনলাইনে যোগদান করেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ্য করা হয়।
ওই সভায় মশা নিধনে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আজ খুলনা ডেঙ্গুর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সিটি করপোরেশনকে সরাসরি দায়ী করে মশা নিধনে সংশ্লিষ্টরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। বলা হয় সিটি করপোরেশন ফগিং মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধনে সংশ্লিষ্টরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সভায় অনতিবিলম্বে খুলনাকে ‘ডেঙ্গু মহামারি এলাকা’ ঘোষণা করারও দাবি জানানো হয়।
এদিকে, বিএনপির এ ধরনের বিবৃতিতে দলের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দলের এক প্রবীণ নেতাকে বসানো হয়েছে। সেজন্য সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা তুলে ধরায় খুলনা বিএনপিতে গ্রুপিং ফের প্রকাশ্যে এসেছে বলে মনে করেন দলের তৃণমুল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন নেতা বলেন, “খুলনা মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিনের। কোন্দলের কারণে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসন বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় দলের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পক্ষে মহানগর বিএনপির বর্তমান কমিটি প্রচার-প্রচারণায় নামেনি এবং গোপনে মঞ্জুর বিপক্ষে কাজ করেছে। যে কারণে জামায়াত প্রার্থীর কাছে মঞ্জু পরাজিত হন।”
পরবর্তীতে পরাজিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে মঞ্জু দলীয় বর্তমান কমিটির সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি নজরে এনে আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনাকে প্রশ্ন করে হলে তিনি বলেন, “গতকালকে মিটিংয়ে আমি ছিলাম না। এটা নিয়ে কিছু বলতে পারব না। তবে আজ আমরা কারো সাথে বিরোধ করার জন্য প্রেস কনফারেন্স করছি না, আমরা কাউকে দায়ী করছি না, সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করছে। করোনা মহামারিতে আমরা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, ঠিক সেভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে দাঁড়াব।”
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু চরচাকে বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি গত তিন মাস ধরে ২১টি ওয়ার্ডে কাজ করছে। সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হচ্ছে। জোন ভাগ করে মশক নিধনে স্প্রে করা হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানের পাশাপাশি জরিমানা করা হচ্ছে। মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সমন্বয় করে দিন-রাত কাজ করা হচ্ছে।”
মঞ্জু বলেন, “মিটিংয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। এটি একটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। কাজেই এ ধরনের অভিযোগ করাটা অযৌক্তিক। দলের কিছু মানুষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা সফল হবে না। এসব মিথ্যা অভিযোগ না তুলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নগর উন্নয়নে সকলের সহযোগিতা চাই।”
ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে বিএনপির কর্মসূচি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্থানীয় স্কুল-কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ড্যাবের সহযোগিতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ক্যাম্পেইন ও প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মশক নিধনের জন্য ফগার মেসিনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধ/কীটনাশক সরবরাহ, জলাভূমি পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীর প্রত্যক্ষ সেবায় সরাসরি চিকিৎসা সহায়তা, প্রয়োজনে বাড়িতে চিকিৎসা পরামর্শ অবস্থা বুঝে চিকিৎসক সেবা ও ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসা চলাকালীন আপডেট রাখা ও রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং কার্যক্রম পরিচালনা করা।
এছাড়াও, আরও বেশ কিছু কর্মসূচির কথা বলা হয়।
ডেঙ্গু কার্যক্রমে ডা. রফিকুল ইসলাম বাবলুর নেতৃত্বে মেডিকেল পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। মো. মাসুদ পারভেজ বাবুর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে প্রতিরোধ সমন্বয় পর্ষদ। খুলনা মহানগর বিএনপির পাঁচটি থানা শাখার নেতাদের সদস্য করা হয়েছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রধান উপদেষ্টা রয়েছেন হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা এবং সদস্য সচিব রয়েছেন নগর সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।
এদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন খুলনা-২ আসনের জামায়াতের এমপি শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল। খুলনা সদর থানার রোকনদের সঙ্গে সম্প্রতি এক বিশেষ বৈঠকে মতবিনিময়কালে তিনি এমন অভিযোগ করেন।
শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, “নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের অন্যতম দায়িত্ব। খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছালেও তা মোকাবিলায় নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।”
খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত খুলনা বিভাগে নতুন করে ২০২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৫৬ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৪৬ জন ভর্তি হন। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৬ জনেই অপরিবর্তিত রয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৮০৬ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন চার হাজার ৮৯ জন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬১৮ জন রোগী। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে খুলনায় ৮৩ জনকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, খুলনা জেলায় সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। এই জেলায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫৪৯ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হাজার ১৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া বাগেরহাটে হাজার ২৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।