বিশ্বে ভারতের প্রতি জনমত মিশ্র পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। বিশ্বের ৩৬টি দেশে পরিচালিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ গ্লোবাল অ্যাটিটিউডস সার্ভেতে এই তথ্য জানানো হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে বাংলাদেশে মাত্র ৪২ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূলভাবে দেখেছেন। বিপরীতে ৫১ শতাংশ প্রতিকূল মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং ৭ শতাংশ কোনো মতামত দেননি।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর আগে ২০২৪ সালে এই চিত্র ছিল অনেক ভিন্ন। তখন বাংলাদেশে ভারতের প্রতি অনুকূল মতামত ছিল ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অনুকূলতা ১৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে ‘জানি না’ বা উত্তর দিতে অস্বীকারকারীদের সংখ্যাও ২৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
জরিপটি পিউ রিসার্চ সেন্টারের স্প্রিং ২০২৬ গ্লোবাল অ্যাটিটিউডস সার্ভের অংশ। মোট ৪২ হাজার ৯২ জন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ওপর জরিপটি চালানো হয়। বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ঘানা, গ্রিস, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, ইতালি, জাপান, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পেরু, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের প্রতি মতামতের বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রতি অনুকূল মতামত সবচেয়ে বেশি (৭৯ শতাংশ)। ২০২৪ সালে যা ছিল ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, সেখানে ১৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূলভাবে দেখেন, আর ৯১ শতাংশ প্রতিকূল মতামত পোষণ করেন। পাকিস্তানে ‘জানি না’ বলেছেন জরিপে অংশ নেওয়াদের মাত্র ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থানে আছে। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় নেতিবাচক পরিবর্তনের হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের প্রতি মতামত উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। শ্রীলঙ্কায় ভারতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ হিসেবেও দেখা হয়। সেখানকার ৬৩ শতাংশ মানুষ ভারতকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩৬টি দেশের মধ্যে গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূলভাবে দেখেছে, আর ৪১ শতাংশ প্রতিকূল মতামত দিয়েছে। প্রায় ১০ শতাংশ কোনো মতামত দেননি। যুক্তরাজ্যের ৭১ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূল মনে করে। কেনিয়ায়ও একই হার ৭১ শতাংশ। জার্মানিতে ৬৩ শতাংশ, ইসরায়েলে ৬০ শতাংশ, ইতালিতে ৫৬ শতাংশ এবং সুইডেনে ৫৫ শতাংশ মানুষ ভারতকে ইতিবাচকভাবে দেখে।
অন্যদিকে, তুরস্কে অনুকূলতা মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১৮ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় ৪১ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৪৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৪ শতাংশ অনুকূল মতামত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চিত্র কিছুটা নেতিবাচক। দেশটিতে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূল এবং ৫০ শতাংশ প্রতিকূল ভাবেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে অনুকূলতা ছিল ৫১ শতাংশ, যা এখন কমে এসেছে।
ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতেও ভারতের ভাবমূর্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। আর্জেন্টিনায় মাত্র ২৪ শতাংশ, চিলিতে ২৫ শতাংশ এবং মেক্সিকোতে ৩০ শতাংশ মানুষ ভারতকে অনুকূলভাবে দেখেন। অনেক দেশেই বড় অংশ কোনো মতামত দেননি, বিশেষ করে পোল্যান্ডে ৩৮ শতাংশ এবং হাঙ্গেরিতে ২৯ শতাংশ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ দেশে ভারতের প্রতি মতামত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও ১০টি দেশে পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি দেশে অনুকূলতা কমেছে। তুরস্ক ও নাইজেরিয়ায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট করে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোতেও অনুকূলতা কমেছে।
বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ পয়েন্টের পতন সবচেয়ে বড় নেতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি। বিপরীতে যুক্তরাজ্যে ১১ শতাংশ পয়েন্ট, জার্মানিতে ছয় শতাংশ পয়েন্ট এবং শ্রীলঙ্কায় ১৪ শতাংশ পয়েন্ট অনুকূলতা বেড়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে ভারতের ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছে। জার্মানিতে ২০২৩ সালে ৪৭ শতাংশ থেকে এখন ৬৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফ্রান্সেও ৩৯ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে বেড়েছে।
বাংলাদেশে কেন এই পরিবর্তন? এর উত্তর হিসেবে কোনো কারণ জরিপে সরাসরি বিশ্লেষণ করা হয়নি।
জরিপটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বমূলক মতামত পাওয়া যায়। জরিপের প্রশ্নপত্র ও পদ্ধতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের জরিপ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের প্রতি জনমত বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে।