ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন ইতালির বোলোনিয়ায় মরক্কোয় জন্ম নেওয়া এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু সেই বিতর্কের মানবিক দিকটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা ছিটমহলে প্রবেশ করলে ইতালির ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দ্রুত স্পেনের সঙ্গে মুক্ত চলাচল-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেন, যদিও সেউতা ওই চুক্তির আওতায় পড়ে না।
এর দুই সপ্তাহ আগে, ইতালিতে ৩৬ বছর ধরে বসবাসকারী মরক্কোর এক ব্যবসায়ী আবদেররহিম ফকির বোলোনিয়ায় পুলিশি হস্তক্ষেপের পর মারা যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পুলিশ সদস্য তার শরীরের ওপর চেপে বসে আছে। সরকার দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ নেয়।
ডানপন্থী গণমাধ্যম ফকিরকে ‘ঝামেলা সৃষ্টিকারী আরেক অভিবাসী’ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং তার কৈশোরের মাদক-সংক্রান্ত দণ্ডের বিষয়টি সামনে আনে। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনীতিকেরা সরকারকে বর্ণবাদ ও পুলিশি বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তবে খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে জানতে চেয়েছেন, আবদেররহিম ফকির আসলে কে ছিলেন এবং কী কারণে তিনি এত মানসিক চাপে ছিলেন। সমাজবিজ্ঞানী ও শরণার্থী সংস্থাগুলোর মতে, এই প্রবণতা ইউরোপের অভিবাসন বিতর্ককে এমন এক সরলীকৃত চিত্রে পরিণত করছে, যা বাস্তবসম্মত ও মানবিক সমাধানের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে।
‘অভিবাসীদের অমানবিক করে তোলা’
মিলানের স্টাতালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাউরিজিও আমব্রোসিনি বলেন, “অনেক রাজনীতিকের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অভিবাসীদের অমানবিক করে তোলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।”
তিনি বলেন, “যদি আমরা তাদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে না দেখে একটি বিমূর্ত সমস্যা হিসেবে দেখি, তাহলে মানবিক বিবেচনা ছাড়াই বিষয়টি মোকাবিলা করা সহজ হয়ে যায়।”
১৯ জুলাই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ৪২ বছর বয়সী ফকির একটি ছোট ধাতবপণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। পরিচিতদের কাছে সব সময়ের মতোই হাসিখুশি, মিশুক ও প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি এমন এক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন, যা ধীরে ধীরে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
ঘটনার দিন প্রতিবেশীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, দুই পুলিশ সদস্য ও এক স্থানীয় বাসিন্দার সহায়তায় ফকিরকে উপুড় করে মাটিতে চেপে ধরা হয়েছে। সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও কয়েক মিনিট ধরে তাকে সেই অবস্থায় রাখা হয়।
পুলিশ জানিয়েছিল, তারা এমন এক ব্যক্তির খবর পেয়ে সেখানে যায়, যিনি অসংলগ্নভাবে চিৎকার করছিলেন, গ্যারেজের দরজায় লাথি মারছিলেন এবং একটি গাড়িতে চালক থাকা অবস্থায় আঘাত করছিলেন।
পরদিন ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বোলোনিয়ার মধ্য-বামপন্থী মেয়র মাত্তেও লেপোরে জবাবদিহির দাবি ও ফকিরের পরিবারের প্রতি সংহতি জানিয়ে সমাবেশের ডাক দেন।
হাজারো শান্তিপূর্ণ মানুষ সমাবেশে অংশ নিলেও পরে একটি ছোট দল পুলিশ সদর দপ্তরের দিকে মিছিল নিয়ে গেলে সংঘর্ষ বাধে। তারা বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করলে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য আহত হয়।
এরপর সরকারপন্থীরা মেয়রের পদত্যাগ দাবি করে। অন্যদিকে বিরোধীরা মেলোনির কঠোর আইন-শৃঙ্খলা নীতিকে দায়ী করে। ফলে পুরো বিতর্কে ফকির নিজেই যেন আড়ালে পড়ে যান।
তদন্ত ও ময়নাতদন্তের অপেক্ষা
ফকিরের ময়নাতদন্তের ফল এবং তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা দুই পুলিশ সদস্য ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত চারজন রেডক্রস স্বেচ্ছাসেবকের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান।
তার স্বজন, আইনজীবী ও বন্ধুদের সঙ্গে রয়টার্স কথা বলেছে। তাদের কথায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় আঁকা ‘অভিবাসীর’ ছবির সঙ্গে মেলে না।
তারা বলেন, ফকির তার গড়ে তোলা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন। একই সঙ্গে প্রায় সারাজীবন ইতালিতে কাটানোর পরও মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছিল।
তার বড় বোন খাদিজা জানান, সম্প্রতি ফকির নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে এতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তা কেউ বুঝতে পারেননি।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, “সে আমাদের রক্ষা করতে চাইত। ফোন করে আমার ও বাচ্চাদের খোঁজ নিত, আর বলত সব ঠিক আছে।”
ফকিরের আইনজীবী বারবারা স্পিনেল্লি জানান, ২০২১ সালে মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় মরক্কোয় থাকার কারণে তিনি ইতালির আবাসিক অনুমতি হারিয়েছিলেন। সেটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।
স্পিনেল্লি বলেন, “আমরা সমাধানের খুব কাছাকাছি ছিলাম। কিন্তু জুন মাসে মামলার বিচারককে হঠাৎ বদলি করা হয়। এতে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যদিও আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে বিষয়টি শিগগিরই মিটে যাবে।”
একই সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষও তাকে তলব করে তার অবস্থান যাচাই করতে চায়, যদিও আদালতের নির্দেশে তিনি সাময়িকভাবে ইতালিতে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন।
স্পিনেল্লি বলেন, “তাকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হবে, এই আশঙ্কায় সে ভীত ছিল।”
মানসিক সংকটের পূর্বাভাস
১২ জুন বোলোনিয়ার বাইরে কাস্তেলো দ'আর্জিলে পুলিশ ফকিরকে বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে দেখে। স্থানীয় মেয়র আলেসান্দ্রো এররিকেজ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরএআইকে জানান, সেদিন কোনো জটিলতা ছাড়াই ঘটনাটির সমাপ্তি হয়।
কয়েক দিন পর তিনি নিজেকে নিজেই আঘাত করে বোলোনিয়ার একটি হাসপাতালে যান এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা চান বলে জানান পারিবারিক আইনজীবী ফাবিও আনসেলমো।
হাসপাতালের নথিতে তাকে হতাশাগ্রস্ত হলেও শান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি তার ভেতরের গভীর মানসিক অস্থিরতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারেনি।
ছয় বছর বয়সে মরক্কো থেকে ইতালিতে আসা ফকির ১৯৯৫ সাল থেকে বোলোনিয়ায় বসবাস করছিলেন। বন্ধুরা তাকে প্রাণবন্ত এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার সাবেক সহপাঠী রিকার্দো (পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “সে ছিল প্রাণচঞ্চল, ক্লাসে সব সময় উপস্থিত থাকত এবং খুব ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিল।”
কৈশোরে মাদক-সংক্রান্ত দুটি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর ফকির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পরে তিনি নিজেই প্রথমে একটি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান এবং সর্বশেষ একটি ধাতবপণ্য তৈরির ব্যবসা গড়ে তোলেন, যা সম্প্রতি আর্থিক সংকটে পড়ে।
তার ১২ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে ছাঁটাই করতে হওয়ায় তিনি ভীষণ মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানান আইনজীবী স্পিনেল্লি। তবে তিনি পরিবারের কাছ থেকে নিজের কষ্ট আড়াল করে রাখতেন।
ফকিরের ২৩ বছর বয়সী ভাতিজি ইয়োসরা বলেন, “তিনি সব সময় মজা করতেন। আমাদের (ভাগনে-ভাগনিদের} নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন।”
তবে বোন খাদিজা এখনো ভাইয়ের শেষ মুহূর্তের ভিডিওটি দেখতে পারেননি।
তিনি বলেন, “আমার পরিবার ইতালির বিচারব্যবস্থা ও পুলিশের ওপর আস্থা রাখে। আমরা সত্য প্রকাশের অপেক্ষায় আছি।”