বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় আজ বুধবার মরক্কোতে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
বিশ্বকাপের মতো ফিফার টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব দেখভাল করার জন্য একটি সংস্থা তৈরি করা এবং সেই সংস্থার কিছু অংশ তৃতীয় একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা গত সপ্তাহে ২১১টি সদস্য দেশের কাছে পাঠায় ফিফা। এরপর থেকেই ইনফান্তিনো তীব্র সমালোচনা, এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মুখে পড়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, নতুন সংস্থাটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ছিল প্রস্তাবটির সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটিগুলোর মধ্যে অন্যতম।
গত শুক্রবার ইনফান্তিনো পরিকল্পনা থেকে সরে এলেও সমালোচকদের ক্ষোভ কমেনি। বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা অভিযোগ করেছে, তিনি ‘ফুটবলের আত্মা বিক্রি’ করতে চেয়েছেন এবং তারা তার নেতৃত্বের ওপর আর আস্থা রাখে না।
এতে আগামী মার্চে মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই মাস আগেও বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছিল।
ইউরোপের কয়েকটি জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন ইতোমধ্যে সুইস-ইতালীয় এই কর্মকর্তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। তবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ফিফার ভেতর থেকেও তার সহকর্মীদের সমালোচনামূলক বার্তা আসছে।
রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম কর্মীদের কাছে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় লিখেছেন, ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাপ্রবাহের’ কারণে প্রকল্পটি ‘স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত’ হয়েছে।
চিঠিতে তিনি আরও লেখেন, ‘ব্যক্তি, অস্থির সময় এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আসে-যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রতি তার দায়িত্ব অব্যাহত থাকে...’। তবে তিনি কোথাও ইনফান্তিনোর নাম উল্লেখ করেননি।
তার বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলেছে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুরের মন্তব্যের। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, কর্মীদের এ পরিকল্পনা সম্পর্কে ‘বিভ্রান্ত করা হয়েছে’ এবং এটি ছিল ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’।
ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো গত সপ্তাহে এ পরিকল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। আর মঙ্গলবার ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ও সাবেক আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারও পরিকল্পনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন।
ওয়েঙ্গার বলেন, প্রস্তাবটি তৈরির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না এবং এটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল ‘একেবারেই প্রয়োজনীয়’।
এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে মরক্কোতে অবস্থান করছেন ইনফান্তিনো। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক দেশ মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশন ইতিমধ্যেই তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতের বিপরীতে বু রেগরেগ নদীর ওপারে সালেতে ফিফার আফ্রিকা কার্যালয়ে বুধবারের বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য হবে—আগামী সাত মাস, অর্থাৎ নির্বাচন পর্যন্ত ইনফান্তিনোর অবস্থান নিশ্চিত করা।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত ৪৩টি সদস্য ফুটবল সংস্থা লিখিতভাবে দাবি জানালে একটি বিশেষ কংগ্রেস আহ্বান করা যেতে পারে।
লন্ডনের দ্য টাইমস সোমবার এক প্রতিবেদনে জানায়, উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) ইনফান্তিনোকে পদত্যাগে বাধ্য করতে বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে তারা ফিফার কার্যক্রম অচল করে দেওয়া কিংবা আলাদা প্রতিযোগিতা শুরু করার পথেও যেতে পারে।
এ প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কনকাকাফ, এএফসি এবং ফিফা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি। উয়েফা জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই।
যদিও কনকাকাফ ও এএফসি উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন করেছে, তবে তাদের অধীন সব জাতীয় ফুটবল সংস্থা একই অবস্থান নেবে—এমন নয়।
এএফসির অবস্থানের বিপরীতে কাতার, কুয়েত, লেবানন, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।
ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তিগুলোর বাইরে থেকে ইনফান্তিনো বরাবরই ব্যাপক সমর্থন পেয়ে আসছেন। বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল ফুটবল সংস্থাগুলো, যারা কার্যক্রম পরিচালনায় ফিফার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।
এসব সংস্থার কাছেই তিনি নতুন প্রস্তাবটি তুলে ধরেছিলেন। পরিকল্পনাটি সমর্থন করলে আগামী বছরের শুরুতে প্রতিটি জাতীয় ফুটবল সংস্থাকে ২ থেকে ৪ কোটি ডলার লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
আফ্রিকার সমর্থনের আশা
আফ্রিকার প্রভাবশালী ফুটবল কর্মকর্তারা ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি এখন মহাদেশটির ৫৪টি সদস্য সংস্থার সমর্থনের ওপর ভরসা করছেন। তবে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান নেয়নি।
সবচেয়ে ছোট ও আর্থিকভাবে দুর্বল কনফেডারেশন ওশেনিয়ার নির্বাহী কমিটি আগামী বুধবার বৈঠক করে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করবে।
নিউজিল্যান্ড ফুটবলের প্রধান অ্যান্ড্রু প্র্যাগনেল মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক ফুটবল সম্প্রদায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “নিউজিল্যান্ডের মতো দেশের জন্য নিজেদের কনফেডারেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কনফেডারেশনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে চলতে পারলে তা সহায়ক হয়।”
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ২১১তম ও সর্বশেষ স্থানে থাকা সান মারিনোর ভোটের মূল্যও বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা বা স্পেনের ভোটের সমান।
তবে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে থাকতে চাইলে ইনফান্তিনোর জন্য একটি বড় সুবিধা হলো—আগামী মার্চের নির্বাচনে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সামনে আসেননি।
জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন এর আগে দুবার ফিফা সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি সেপ ব্ল্যাটারের কাছে পরাজিত এবং পরের বছর ইনফান্তিনো ও এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফার পর তৃতীয় হন।
মঙ্গলবার বর্তমান সংকট নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রিন্স আলী ফিফার বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, ইনফান্তিনোকে সমর্থন করলে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “আমরা আগে তাকে সমর্থন করিনি, এখন তো অবশ্যই করব না।”
রয়টার্স এ অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।