বিশ্বকাপের স্বত্ত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে–এমন অভিযোগে গতকাল বৃহস্পতিবার ইউরোপের ৫৫টি দেশ ২০৩০ বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
ফিফার এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাকাফও। উয়েফার কয়েক ঘণ্টা পর কনক্যাকাফও বিবৃতি দিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কনক্যাকাফের সদস্য সংখ্যা ৪১।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার জন্য আরও বড় ধাক্কা এসেছে আজ সকালে। এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাও (এএফসি) বিবৃতি দিয়ে বলেছে, তারা উয়েফা ও কনক্যাকাফের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছে। ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট এএফসি ফুটবলীয় শক্তি হিসেবে বা বাণিজ্যের বিচারে উয়েফার ধারেকাছেও নয়, তবু এএফসি-র বিবৃতির কথা আলাদা করে ‘বড় ধাক্কা’ বলা হচ্ছে কেন? কারণ, তিনবারের ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর বড় ভোটব্যাংক হিসেবে সব সময় এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোকেই দেখা হয়েছে।
ফিফা বিশ্বকে যে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে ছয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কনফেডারেশনকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, তার মধ্যে তিনটি এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি সরাসরি দিয়েছে শুধু উয়েফাই। এখন পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল, ওশেনিয়ার ফুটবল কনফেডারেশন ও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন তাদের অবস্থান জানায়নি।
এই হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, আগামী বছরের মার্চে ফিফা সভাপতি নির্বাচন। চতুর্থ মেয়াদে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনে দাঁড়াবেন ইনফান্তিনো। নির্বাচনের মাস আটেক আগে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরোধিতায় যদি তিন কনফেডারেশনের মোট ১৪৩টি দেশই বিশ্বকাপ বয়কট করে, তাহলে আর বাকি কী থাকে!
ফিফা সভাপতি অবশ্য সদস্য দেশগুলোর সামনে বিরাট অঙ্কের ‘ফুটবল উন্নয়ন ফান্ডে’র মূলা ঝুলিয়েছেন। তিনি অনেকটা হুমকির সুরেই বলেছিলেন, যদি তারা কম টাকায় সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে ঠিক আছে। তবে ফুটবল উন্নয়নে সদস্য দেশগুলো যদি ফিফা থেকে পাওয়া বরাদ্দ বাড়াতে চায়, তাহলে ফিফার উদ্যোগকে সমর্থন দিতে হবে তাদের। বিরোধিরা একে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘুষ প্রস্তাব বলে অভিহিত করছেন।
১৪৩টি দেশের হুমকির মুখে ফিফা অবশ্য সুর কিছুটা নরমই করেছে। এক বিবৃতিতে ফিফা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, কেউই ফুটবল বিক্রি করছে না। এমন চিন্তা-ভাবনা প্রশ্রয় দেওয়ারও প্রশ্ন নাকি নেই।
ফিফার প্রস্তাবটা আসলে কী?
বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি আলাদা বাণিজ্যিক সহায়ক প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চায় ফিফা। আর সেই নতুন প্রতিষ্ঠানেই বহিরাগত বা তৃতীয় পক্ষকে শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফিফা বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই শেয়ারের ভাগটা হবে ‘খুব ছোট’ এবং ‘নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না দেওয়ার মতো’।
এফএফই-র কাজ কী হবে? বিবৃতিতে এ নিয়ে ফিফা বলেছে, এই প্রতিষ্ঠানটি ফিফার মালিকানাধীনই থাকবে। ফিফার বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট-সংক্রান্ত দিকগুলো দেখাশোনা করবে তারা।
এফএফই-র মাধ্যমে ফুটবল উন্নয়ন তহবিলে ১০০০ কোটি ডলার বাড়ানোর লক্ষ্য ফিফার। এ জন্য এই বছরের শেষদিকেই ৪২০ কোটি ডলার তোলার পরিকল্পনা আছে। এফএফই-র কাছে ফিফার বাণিজ্যস্বত্ত্বের ভাগ বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে ফিফা। এফএফই-র প্রাথমিক মূল্যায়ন ধরা হয়েছে ২০০০ কোটি ডলার!
এখনও কার্যকর হয়নি কেন?
ফিফার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন লাগে। সেটার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে সদস্য দেশগুলোকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে ফিফা।
এ প্রস্তাব পাস করতে ফিফার মোট ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অন্তত ১০৬টি ভোট পক্ষে লাগবে। ইতিমধ্যে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর-মধ্য আমেরিকার তিন কনফেডারেশনের ১৪৩টি দেশ এ প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তার মানে, এই ১৪৩টি দেশের সবাই যদি ভোটাভুটিতে আসলেই বিপক্ষে ভোট দেয়, সে ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান না জানানো ৬৮টি দেশের সবাই ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার পক্ষে ভোট দিলেও লাভ হবে না।
প্রস্তাবে সমস্যাটা কোথায়?
খুব বড় একটা অংশ বিক্রি হবে না, তাতে টাকাও উঠবে বাড়তি–ফিফার এই দাবি সত্যি হলে সমস্যাটা কোথায়? এমন প্রশ্ন আসতে পারে অনেকের মনে।
তবে প্রশ্নটা শুধু অঙ্কের হিসাবে নয়। কারণ, উদ্দেশ্যটা এত সরল বলে মনে হচ্ছে না। হওয়ার কোনো কারণ নেই। যে টাকা দেবে, সে তার বেশিই ফেরত নিতে চাইবে। এবার আমেরিকা মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপেই চোখে পীড়া দেওয়ার মতো বাণিজ্যিকীকরণের যে রমরমা দেখা গেছে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব বিক্রি করে দিলে সেটা কোন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে!
সেটা যদি বাদও দেন, আরও কিছু সমীকরণ ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ জাগিয়ে তুলছে। কোন কোন সমীকরণ?
এক, ইনফান্তিনোর সর্বশেষ কয়েক বছরে যার সঙ্গে মাখোমাখো সম্পর্ক বারবার বিতর্কের কারণ হয়েছে, সেই যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও ফিফার নতুন পরিকল্পনার সংযোগ আছে। ইনফান্তিনোর নতুন এই পরিকল্পনার কথা সবার আগে ফাঁস করা সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস সেদিনই জানিয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানের কাছে এফএফই-র স্বত্ত্বের বড় অংশ বিক্রি করার পরিকল্পনা, তার সঙ্গে ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যের সংযোগ আছে।
পরে জানা গেছে, ইনফান্তিনোর এই প্রকল্পের উপদেষ্টা মার্কিন ব্যাংক জেপি মরগান। এফএফই-তে বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ এটারনাল।’ এই থ্রাইভ এটারনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গত এপ্রিলে, আর এর মালিক ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনার।
শুধু তা-ই নয়, ইনফান্তিনো আগামী মার্চের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে জিতলে চেয়ারটাতে থাকবেন ২০৩১ সাল পর্যন্ত। এরপর ফিফা সভাপতির দায়িত্ব ছাড়লে তিনিই এফএফই-র কমিশনার হিসেবে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছে দ্য টাইমসের প্রতিবেদন। কোনো কোনো প্রতিবেদন বলছে, ইনফান্তিনোকে সিইও পদও দেওয়া হতে পারে। এফএফই-র উদ্দেশ্য টাকা দিয়ে টাকা বানানো, সেটার পরিকল্পনা যিনি ফিফা সভাপতির চেয়ারে বসে করছেন, তিনিই ফিফা সভাপতির দায়িত্ব ছেড়ে বসবেন এফএফই-র মূল দায়িত্বগুলোর একটিতে! কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাত আর কাকে বলে!
প্রতিবাদে কে কী বলছে
উয়েফা শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করে আসছিল। সংস্থাটির ভাষ্য, ফুটবলের আত্মা ও পরিচালনা ব্যবস্থা বিক্রয়যোগ্য নয়। এই উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবারের সভায় ইউরোপীয় দেশগুলো জানিয়ে দেয়, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা কার্যকর হলে তারা ফিফার সব টুর্নামেন্ট বয়কট করবে।
ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরবর্তী বিশ্বকাপ আসর হলো আগামী গ্রীষ্মে ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপ, এরপর ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয় অনুষ্ঠিত হবে পুরুষদের বিশ্বকাপ। উয়েফার এই বয়কট সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দুটি টুর্নামেন্টই সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
কনক্যাকাফ ও এএফসি বয়কটের কথা না বললেও ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
উয়েফা ও কনক্যাকাফের বিবৃতি আসার পরই ফিফা অবশ্য বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে সবার শত্রু ‘গণমাধ্যম’-এর ওপর দায় চাপিয়ে বলা হলো, গণমাধ্যম ভুলভাবে উপস্থাপন করায় ফিফার পরিকল্পনা নিয়ে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ‘কেউই ফুটবল বিক্রি করছে না’ মর্মে জোর বাণী প্রচার করে ফিফা এ-ও জানিয়ে দিয়েছে, “…তথ্য ও সত্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন যেন তাদের মতামত বা ভোট প্রদান করতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই আমরা এ আলোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাব।”
উয়েফার এক ঢিলে দুই পাখি?
ফুটবলকে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান করে তোলা উয়েফা শুধুই ‘ফুটবলপ্রেম’ থেকে ইনফান্তিনোর বিরোধিতা করছে কি না, সে বিতর্কও উঠতে পারে। এখানে আগামী মার্চের ফিফা সভাপতি নির্বাচনের হিসাব-নিকাশও জড়িয়ে থাকার সন্দেহ আসা একেবারে অমূলক নয়। জোর সম্ভাবনা–এখানে লড়াইটা যতটা না ফুটবলপ্রেমের, তার চেয়ে বেশি দুই ‘এলিটে’র ক্ষমতার।
এই পরিকল্পনা নিয়ে এতগুলো দেশের বিরোধিতার পর এরই মধ্যে ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরো পদত্যাগ করেছেন।
এর আগে উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দর সেফেরিন আগামী মার্চের নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন বলে গুঞ্জন উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক খবর, সেফেরিন নন, ফ্রেঞ্চ ক্লাব পিএসজির সভাপতি ও ইউরোপের ক্লাবগুলোর সংগঠনের (ইএফসি–আগের নাম ছিল ইসিএ) সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি দাঁড়াতে যাচ্ছেন ফিফা সভাপতি নির্বাচনে।
এমন সময়ে উয়েফার একেবারে বয়কটের ডাক একদিকে ফুটবলে বিতর্কিত চরিত্র ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন কমাবে–এটা যেমন সত্যি, তেমনি ‘হুইসেলব্লোয়ার’ ইউরোপের আশীর্বাদপুষ্ট নাসের আল-খেলাইফির আবেদনও বাড়াবে। প্রসঙ্গত, আল-খেলাইফি পিএসজির মূল মালিক কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন; অর্থাৎ, তার প্রতি কাতার এবং সেই সূত্র ধরে এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশের সমর্থনও থাকবে।