পাম্পে গিয়ে এক লিটার ডিজেলের জন্য টাকা দেওয়ার সময় মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই টাকাটা আসলে কোথায় যায়? মধ্যপ্রাচ্যের কোনো তেলক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত হওয়ার পর জাহাজে করে কীভাবে জ্বালানি আসে বাংলাদেশে? চট্টগ্রাম বন্দরে নামার পর এর সঙ্গে কী কী খরচ যুক্ত হয়? আর শেষ পর্যন্ত পাম্পে যে ১৩৫ টাকা দিতে হয়, তার কতটা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কিনতে, কতটা সরকার পায়, আর কতটা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির খরচ ও লাভের ঘরে জমা হয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজার কীভাবে কাজ করে।
এক বছরে জ্বালানি আমদানিতে ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের মোট খরচ হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছর; অর্থাৎ, ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে খরচ হয়েছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য আমদানি খরচের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই গেছে শুধু অপরিশোধিত তেল আমদানিতে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ব্যবহার ছিল প্রায় ৬৭ দশমিক ৬১ লাখ টন। এর মধ্যে ডিজেলের ব্যবহারই ছিল সবচেয়ে বেশি।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশই ছিল ডিজেল।
মূলত পরিবহন খাত, কৃষির সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় ব্যাপক ব্যবহারের কারণে দেশের জ্বালানি বাজারে ডিজেলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপিসির সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৩ থেকে ৪৪ লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ কোথা থেকে তেল কেনে?
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক দরপত্র এবং সরবরাহকারী দেশের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে।
বিপিসির সরবরাহকারী তালিকা অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে সৌদি আরবের সৌদি আরামকো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি। পরিশোধিত জ্বালানির ক্ষেত্রে কুয়েত, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও ওমানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপিসির সরবরাহকারী তালিকায় রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি একক কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল নয়। পণ্যের ধরন ও চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারীরাও পরিবর্তিত হয়।
সব তেল কি বাংলাদেশে পরিশোধন করা হয়?
এর সোজা উত্তর হচ্ছে–না।
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) চট্টগ্রামে অবস্থিত। এর অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় অংশ আমদানি করা হয় এবং অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ ইআরএলে পরিশোধন করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল প্রায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার টন পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিশোধন করেছে। এর মধ্যে ডিজেল ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৯ হাজার টন। একই সময়ে দেশের ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। ফলে দেশের চাহিদা পূরণে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ডিজেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশে আসা জ্বালানি তেলের একটি অংশ প্রথমে অপরিশোধিত অবস্থায় আসে, পরে ইআরএল-এ পরিশোধিত হয়। আর বড় একটি অংশ আসে সরাসরি পরিশোধিত অবস্থায়।
বিদেশ থেকে তেল কেনার সময় দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়?
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে শুধু তেলের মূল দামই বিবেচনা করা হয় না। চুক্তির ধরন অনুযায়ী পণ্যের মূল্য, পরিবহন, বিমা এবং অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এফওবি, সিএফআর ও সিআইএফের মতো শর্ত ব্যবহার করা হয়:
ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি): এই চুক্তিতে বিক্রেতা নির্দিষ্ট বন্দরে পণ্য জাহাজে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। এরপর পরিবহনসহ পরবর্তী ব্যয়ের বড় অংশ ক্রেতার ওপর পড়ে।
কোস্ট অ্যান্ড ফ্রেইট (সিএফআর): এই নিয়মে বিক্রেতা পণ্য গন্তব্য বন্দরে পৌঁছানোর সমুদ্র পরিবহন ব্যয় বহন করে। তবে বিমার দায়িত্ব আলাদা হতে পারে।
কোস্ট, ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ফ্রেইট (সিআইএফ): এতে পণ্যের মূল্য, পরিবহন এবং বিমা তিনটি ব্যয়ই চুক্তির মূল্যের মধ্যে থাকে।
বিপিসি বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সিআইএফ এবং সিএফআর উভয় ধরনের চুক্তির জন্য সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত করছে। তবে কোনো পণ্যে কোন চুক্তি এবং কোন দর নির্ধারণী সূত্র (প্রাইসিং ফরমুলা) প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট দরপত্র বা সরবরাহ চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কীভাবে ঠিক হয়?
অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে ব্রেন্ট, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) এবং দুবাই/ওমানের মতো ভিত্তিমূল্য (বেঞ্চমার্ক) গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট। কারণ, বাংলাদেশ শুধু অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানি করে না, বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যও আমদানি করে। সরকারের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকায় পরিশোধিত জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য নির্ধারণে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালে প্রকাশিত প্লেটস আরব গলফ মূল্যায়ন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
প্লেটস নিজে বাংলাদেশের পাম্পে ডিজেলের খুচরা দাম ঠিক করে না। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যায়ন বা ভিত্তিমূল্য প্রকাশ করে। সেই ভিত্তিমূল্য এবং নির্ধারিত দর নির্ধারণী সূত্র ব্যবহার করে আমদানির মূল্য হিসাব করা হয়।
প্লেটসের দাম কীভাবে বাংলাদেশের হিসাবের অংশ হয়?
২০২৪ সালে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য হিসাবের ক্ষেত্রে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালে প্রকাশিত প্লেটস আরব গলফের মূল্য বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চলমান গড়, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের ভোক্তা পর্যায়ের দাম সরাসরি কোনো একটি দিনের ব্রেন্ট বা প্লেটসের দামের সমান নয়। আন্তর্জাতিক ভিত্তিমূল্য থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত একাধিক ধাপের ব্যয় এতে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশে তেলের দাম কে ঠিক করে?
সরকার ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য নির্ধারণে বিবেচনা করা হয়:
আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যমূল্য
আমদানি শুল্ক
অগ্রিম আয়কর
আমদানি পর্যায়ের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)
পরিচলন ব্যয়
আর্থিক, প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়
বিপিসির মুনাফা বা মার্জিন
স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট
বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয়
অর্থাৎ, পাম্পে গ্রাহক যে দাম দেন, সেটি শুধু বিদেশ থেকে কেনা তেলের দাম নয়। এর মধ্যে আমদানি থেকে শুরু করে স্থানীয় বিপণন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যয় ও সরকারি রাজস্ব অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা কীভাবে হয়?
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ডিজেলের খুচরা দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ১১৫ টাকা।
এই ১৩৫ টাকার পুরোটা আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম নয়। সরকারি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ সূত্র অনুযায়ী, এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ের শুল্ক ও কর, বিপিসির বিভিন্ন ব্যয় ও মুনাফা, ভ্যাট এবং বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় যুক্ত থাকে।
তাই ১৩৫ টাকার দামকে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আন্তর্জাতিক মূল্য, ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কর বা ৮ থেকে ১০ শতাংশ বিপিসির খরচ হিসেবে ভাগ করা ঠিক হবে না, যদি সংশ্লিষ্ট মাসের সরকারি মূল্য কাঠামো থেকে সেই অঙ্ক সরাসরি বের করা না যায়।
অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট দিনের ১৩৫ টাকা বিশ্লেষণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট মাসের সরকারি মূল্য কাঠামো থেকে প্রতিটি উপাদানের টাকাভিত্তিক হিসাব করতে হবে। শতাংশভিত্তিক অনুমান দিয়ে সেই হিসাব করা যাবে না।
বিপিসি কীভাবে লাভ করে?
বিপিসি শুধু তেল আমদানি করে না। প্রতিষ্ঠানটি দেশের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিসির আর্থিক ফলাফলে বড় ওঠানামা দেখা গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা মুনাফার তথ্য এসেছে।
আবার কখনো বিপিসিকে বড় লোকসানও গুনতে হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে এবং দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় না হলে বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। একই সময়ে দেশের বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা বিপিসির ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হয়েছে বলে জ্বালানি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, বিপিসির আর্থিক অবস্থাকে শুধু ‘লাভ করে’ বা ‘লোকসান করে’–এ দুভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার এবং দেশে নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য এর আর্থিক ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে।
তেলের দামের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে কেন?
ডিজেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়। বাংলাদেশের পরিবহন ও কৃষি ব্যবস্থার বড় একটি অংশ ডিজেলনির্ভর। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মোট পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল। পরিবহন খাত এর সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী। কৃষিতে সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পেও ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
তাই ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু ফিলিং স্টেশনে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে বাজারে পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিতে সেচ ও কৃষিযন্ত্রের খরচ বাড়তে পারে। শিল্পকারখানায় জেনারেটর বা অন্যান্য যন্ত্রে ডিজেল ব্যবহৃত হলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এই কারণে জ্বালানি তেলের দাম অর্থনীতির অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্যেও দ্বিতীয় দফার প্রভাব ফেলতে পারে।
মোদ্দা কথা, শিল্পপণ্যসহ বিভিন্ন সেবার উৎপাদন পর্যায়ে কাঁচামাল হিসেবে ডিজেলের দাম বাড়লে, তার সরাসরি প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রটি আবার একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।
একটি পণ্যের উৎপাদনে এক লিটার ডিজেল পোড়াতে হলে, বর্তমান নির্ধারিত মূল্যে আগের চেয়ে ২০ টাকা বেশি খরচ হবে। ফলে এটি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। এই উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে কারখানা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ডিজেল পরিবহনের ব্যয়ও, যা ফের জ্বালানির দামের ওপর নির্ভরশীল। এবার সেই উৎপাদিত পণ্য পাইকারি, খুচরা ইত্যাদি বাজারের বিভিন্ন পর্যায় হয়ে ভোক্তার দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে ফের পরিবহন ব্যয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হবে।
ফলে পণ্যটির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ল তিন দফায়। এবং এটি ঘটল শুধু এক জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই। এই সার্বিক ব্যয়ের পর যুক্ত হবে মুনাফার অঙ্ক। কোনো কারখানা মালিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির দায় নিজের কাঁধে নেবে না এবং এ কারণে মুনাফাও কাটছাট করবে না। অর্থাৎ, পুরো ভারটিই চাপছে গিয়ে ভোক্তার কাঁধে।
বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে একই হারে কমে না কেন?
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা মানেই বাংলাদেশের পাম্পে একই হারে দাম কমবে, এমন নয়। কারণ বাংলাদেশের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, বিপিসির মুনাফা, ভ্যাট এবং বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও একই সময়ে ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয়ের একটি অংশ সেই সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং স্থানীয় খুচরা দামের মধ্যে সমন্বয়ের সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের আন্তর্জাতিক দামের চলমান গড় ব্যবহার করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি দিনের ওঠানামা সরাসরি পাম্পের দামে প্রতিফলিত হয় না।
বর্তমান মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন কোথায়?
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের দামকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং জ্বালানি খাতে সরকারের আর্থিক চাপ কমানো। তবে এই পদ্ধতির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি। তাদের গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান দর নির্ধারণী সূত্রের কিছু উপাদান পুনর্বিবেচনা করা হলে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুযোগ থাকতে পারে।
২০২৪ সালের গবেষণায় সিপিডি একটি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক বাজারমুখী মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির প্রস্তাব দেয়। তাদের হিসাবে, এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে।
এটি অবশ্য সরকারের নির্ধারিত বা নিশ্চিত মূল্য নয়। এটি সিপিডির গবেষণা ও প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ মডেলের হিসাব।
তাহলে এক লিটার ডিজেলের ১৩৫ টাকা আসলে কী?
এক লিটার ডিজেলের ১৩৫ টাকা আসলে একটি দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থার শেষ পর্যায়ের দাম। এর শুরু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল বা পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য থেকে। এরপর যুক্ত হয় ব্যবসায়ীদের সাথে করা চুক্তি অনুযায়ী প্রিমিয়াম, জাহাজ ভাড়া, বিমা বা অন্যান্য আমদানি ব্যয়। বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর প্রযোজ্য শুল্ক ও কর যুক্ত হয়। বিপিসির পরিচালন, আর্থিক, প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং নির্ধারিত মুনাফা হিসাবের অংশ হয়। এরপর ভ্যাট এবং বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় যুক্ত হয়ে গ্রাহকের জন্য চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয়।
তাই পাম্পে দেওয়া ১৩৫ টাকা একক কোনো পক্ষের আয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, আমদানি ব্যয়, সরকারি রাজস্ব, বিপিসির ব্যয় ও মুনাফা এবং স্থানীয় সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার বিভিন্ন খরচের সমন্বিত ফল।
তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। কিন্তু দেশের ভোক্তা পর্যায়ের দামের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের সূত্র, কর কাঠামো, বিপিসির ব্যয় ও মার্জিন এবং মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সেই কারণে এক লিটার ডিজেলের দাম বোঝার প্রশ্নটি শুধু ‘বিশ্ববাজারে তেলের দাম কত’–এই প্রশ্নে শেষ হয় না। বরং আসল প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কত টাকা যোগ হচ্ছে, কেন যোগ হচ্ছে এবং সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছে।