১৪৩টি দেশ প্রত্যাখ্যান করায় বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বিক্রির পরিকল্পনা গতকাল শনিবার স্থগিত করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এ ঘটনার জেরে ফিফার কাছে নতুন করে স্বচ্ছতার দাবি উঠেছে। আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনগুলো অভিযোগ করেছে, এ প্রস্তাব সম্পর্কে তাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। এতে তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়।
এ ঘটনা ঘটেছে এমন সময়ে, যখন আগামী মার্চের নির্বাচনে টানা চতুর্থবারের মতো ফিফা সভাপতি হওয়ার দৌড়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। নির্বাচনের মাত্র আট মাস আগে ফুটবল বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব বাইরের পক্ষের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করা এবং চারিদিকে সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে কয়েকদিনের মধ্যেই সে পরিকল্পনা আবার বাতিলও করার পর ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক প্রভাব এবং সমর্থন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
স্বত্বের একটি অংশ বিক্রি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বিশ্ব ফুটবলে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ধরন নিয়ে ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফুটবল কর্মকর্তারা বলছেন, খেলাটির পরিচালন ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—এমন সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে আরও বেশি জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বিতর্ক এমন সময়ে দেখা দিল, যখন গত এপ্রিলেই ইনফান্তিনো ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ফিফা সভাপতির চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচন করবেন। ২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর তিনি দুবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন এবং ফিফার ওপর তার দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।
২০২৭-৩১ মেয়াদের জন্য তার পুনর্নির্বাচিত হওয়া এর আগে প্রায় নিশ্চিত বলে মনে হলেও, রয়টার্সকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, (বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব বিক্রির) ব্যর্থ এই প্রস্তাব ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ফিফার কিছু সদস্যের অসন্তোষ প্রকাশ করে দিয়েছে। এর ফলে আগামী বছর মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসের আগে ইনফান্তিনোর পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ক্রীড়া বিপণন বিশ্লেষক বব ডর্ফম্যান বলেন, “তিনি [ইনফান্তিনো] যা করেছেন, তার অনেক ক্ষেত্রেই আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা দেখা গেছে। তার কিছু সিদ্ধান্তে অনেক সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অসন্তুষ্ট হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব যেসব দেশকে দেওয়া হয়েছে, তার কিছু সিদ্ধান্তও প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে রাজনীতির প্রভাব একটু বেশিই পড়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনফান্তিনোর অবস্থানের এত দ্রুত পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বাণিজ্যিকভাবে সফল বিশ্বকাপ উদ্যাপন করছিলেন।
কলেজ অব দ্য হোলি ক্রসের ক্রীড়া অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ভিক্টর ম্যাথেসন বলেন, “কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান এত দ্রুত বদলে যাওয়ার উদাহরণ কল্পনা করাও কঠিন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও তিনি যেন সাফল্যের শীর্ষে ছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ক্রীড়া মেগা ইভেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আর মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তাকে এখন টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।”
স্বচ্ছতার দাবি
ফিফার পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ সংস্থাটির বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন ইউনিট গঠন করে, তার প্রায় ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল।
গত মঙ্গলবার ঘোষিত এ পরিকল্পনা দ্রুতই আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। তাদের অভিযোগ, এই পরিকল্পনা বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
তীব্র সমালোচনার পর ইনফান্তিনো জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত ‘সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার’ পর ফিফা ওই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি বাহরাইনের শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফা আজ শনিবার ফিফার পরিকল্পনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
শেখ সালমান এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি আশা করেন, “বিশ্ব ফুটবলে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন যেকোনো উদ্যোগ যথাসময়ে, স্বচ্ছ ও অর্থবহ উপায়ে কনফেডারেশনগুলো, ফিফা কাউন্সিল, সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্য অংশীজনের সামনে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ সব সময় যথাযথ পরামর্শ, সম্মিলিত সংলাপ এবং আমাদের খেলার প্রতিষ্ঠিত সুশাসন কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।”
‘কিছু নীতি কখনোই বদলানো উচিত নয়’
অস্ট্রেলিয়া ফুটবলের চেয়ারম্যান অ্যান্টার আইজ্যাকও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানালেও সুশাসনের মৌলিক নীতিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, “ফুটবল কখনো স্থির ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকা উচিত নয়।”
তবে তিনি যোগ করেন, “কিছু নীতি কখনোই বদলানো উচিত নয়—সততা, স্বাধীনতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা, অর্থবহ পরামর্শ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া।”