মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান ভূপাতিত করে হত্যার কথিত ইরানি ষড়যন্ত্র এবং সেই হুমকি নিয়ে সিআইএর ‘লো কনফিডেন্স’ মূল্যায়ন এখন ওয়াশিংটনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের বিমান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এমন একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে, যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদেরই গুরুতর সংশয় ছিল।
ঘটনার নাটকীয়তা এখানেই। সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে ফেরার কথা ছিল। পরে তিনি পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ ওঠেন। কিন্তু সেখানেও শেষ পর্যন্ত থাকা হয়নি। সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশে তাকে গোপনে বিমান থেকে নামিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সামরিক বিমানে তোলা হয়। বিমানবন্দরে এই স্থানান্তর এতটাই গোপনে করা হয় যে, সাংবাদিক ও অনেক কর্মকর্তাও বিষয়টি জানতে পারেননি। পরে যুক্তরাজ্যে পৌঁছে ট্রাম্প আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। উদ্দেশ্য ছিল—তার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সম্ভাব্য শত্রুকে বিভ্রান্ত করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে গোয়েন্দা তথ্যের উৎস ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একজন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিমানকে লক্ষ্য করে কথিত হামলার তথ্যটি মার্কিন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থেকে নয়, বরং ইসরায়েল-উদ্ভূত ছিল। সিআইএর বিশ্লেষকেরা সেই তথ্যের ওপর ‘লো কনফিডেন্স’ বা খুব কম মাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা—এমন সিদ্ধান্ত তারা দেননি; বরং এর সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েন্দা বিশ্লেষণে ‘লো কনফিডেন্স’ মানে তথ্যকে উপেক্ষা করা নয়, আবার সেটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও নয়।
তারপরও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল? এক দিক থেকে দেখলে, প্রেসিডেন্টের জীবনের সম্ভাব্য ঝুঁকির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়াকে অস্বাভাবিক বলা যায় না। গোয়েন্দা তথ্য দুর্বল হলেও হুমকিটি যদি ভয়াবহ হয়, তাহলে নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধরে প্রস্তুতি নেওয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গোপনীয়তা ও সমন্বয়ের মাত্রা নিয়ে।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিষয়টি বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তারা যদি সত্যিই না জেনে এমন একটি বিমানে অবস্থান করে থাকেন, যেটিকে সম্ভাব্য শত্রুর নজরদারি বা হামলার লক্ষ্য বানানো হয়েছিল, তাহলে সেটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। সাংবাদিকদের কেউ কেউ এমন পরিস্থিতিকে নিজেদের অজান্তে ‘ডিকয়’ হিসেবে ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, তিনি সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর পরামর্শ অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল না। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত কোন সংস্থার মূল্যায়ন প্রাধান্য পাবে? সিআইএ যদি তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে, অথচ সিক্রেট সার্ভিস সেই তথ্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা গ্রহণ করে, তাহলে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে ঝুঁকি মূল্যায়নের সমন্বয় কতটা কার্যকর ছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এর সঙ্গে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লিভিটের পদত্যাগের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। তিনি পরিবারকে সময় দেওয়ার কারণ দেখিয়ে পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বিমান পরিবর্তনের ঘটনায় তার ভূমিকা বা পদত্যাগের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই। তাই তাকে কথিত ‘ডিকয়’ বিমানে রাখা হয়েছিল এবং সে কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন—এটি আপাতত একটি অনুমান বা রাজনৈতিক জল্পনা হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
এই পুরো ঘটনা আসলে তিনটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, বিদেশি উৎস থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য কতটা যাচাই করে রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়নের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কাঠামো কী হবে। তৃতীয়ত, প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষিত করতে গিয়ে তার সফরসঙ্গী কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা গ্রহণযোগ্য।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জাতীয় নিরাপত্তায় শুধু তথ্যের পরিমাণ নয়, তথ্যের মান ও নির্ভরযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবার কম আস্থার তথ্য মানেই তা বাতিল করে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার মতো সম্ভাব্য হুমকির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ‘ঝুঁকি এড়ানো’ এবং ‘অতিরিক্ত আতঙ্ক সৃষ্টি না করা’—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
সুতরাং ট্রাম্পের বিমান পরিবর্তনের ঘটনাকে এখনই ‘ভুয়া হুমকি’ বা ‘সিআইএর সতর্কতা উপেক্ষা’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। বরং এটি মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গভীর সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন সামনে এনেছে। যদি ভবিষ্যৎ তদন্তে প্রমাণিত হয় যে অত্যন্ত দুর্বল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের অজান্তে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছিল, তাহলে সেটি ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি হুমকিটি বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হয়ে থাকে, তাহলে সিক্রেট সার্ভিসের গোপন পদক্ষেপ হয়তো অতিরিক্ত সতর্কতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছিল। শেষ পর্যন্ত সত্য নির্ধারণ করবে গোয়েন্দা তথ্যের উৎস, তার যাচাই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণাঙ্গ তদন্তই।