মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ার পর সঙ্গে থাকা সব পুরুষকে সরিয়ে দিয়ে এক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে বসেন খুরশিদ আহমেদ।
৭১ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা খুবই হতাশ। যে আইনের বিরুদ্ধে তিনি কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই আইন ঠেকাতে পারেননি। এখন তিনি বুঝতে পারছেন না, কীভাবে একজন মানুষ একই সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখা মুসলিম এবং ভারতের আইন মেনে চলা নাগরিক হতে পারেন।
খুরশিদ বলেন, “আপনি যদি শরিয়াহ মেনে না চলেন, তাহলে আপনি মুসলিম নন।” কিন্তু তার নিজের রাজ্য উত্তরাখণ্ডে গত বছরের জানুয়ারি থেকে মুসলমানদের প্রচলিত পারিবারিক আইনের অনেকগুলো মেনে চলা বেআইনি হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে, ভারতের আরও অনেক রাজ্যে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উত্তরাখণ্ডই স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজ্য, যেখানে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো ধর্মভেদে আলাদা ব্যক্তিগত আইন বাদ দিয়ে সবার জন্য একই আইন চালু করা। এর আওতায় বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার ও দত্তক নেওয়ার মতো বিষয় থাকবে।
চলতি বছর আসাম, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশেও প্রায় একই ধরনের আইন পাস করেছে রাজ্যগুলোর বিধানসভা। তবে এসব আইন এখনো কার্যকর হয়নি। আরও পাঁচটি রাজ্য একই পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
পশ্চিমবঙ্গেও যদি এই আইন পাস হয়, তাহলে সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৩ কোটি মুসলমানকেও খুরশিদ আহমেদের মতো একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তারাও একই দ্বিধায় পড়বেন–ধর্মীয় রীতি মেনে চলবেন, নাকি দেশের আইন মেনে চলবেন?
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য বলছে, যেসব রাজ্যে ইউসিসি আইন করা হয়েছে, সেসব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সাম্প্রতিক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গও বিজেপির দখলে চলে গেছে।
বিজেপির দাবি, নতুন এই আইন সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করবে, বিশেষ করে নারীদের অধিকার রক্ষা করবে। ছবি: রয়টার্স
বিজেপির দাবি, নতুন এই আইন সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করবে, বিশেষ করে নারীদের অধিকার রক্ষা করবে। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ হলো, এর মাধ্যমে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুদের প্রচলিত আইন ও রীতিনীতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সবাই একই আইন মেনে চলবে– আপাতদৃষ্টিতে এটি শুনতে খুবই সহজ ও ন্যায্য বলে মনে হয়। কিন্তু এতদিন সবাই একই আইন মানত না। এর পেছনে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাস আছে।
ব্রিটিশরা ভারত ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত তৈরি করে। এরপর ভারতের মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাই ভারতের সংবিধানে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিজেদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিজেদের ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই ব্যবস্থা বদলানো হচ্ছে।
নতুন এই আইনে মুসলিম মেয়েরাও হিন্দু মেয়েদের মতো বাবার সম্পত্তিতে সমান অধিকার পাবে। ২০০৫ সালে ভারতে হিন্দু মেয়েরা এই অধিকার পেয়েছিল। মুসলিম পুরুষদের একাধিক বিয়ে করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, উত্তরাখণ্ডের অনেক মুসলিম নারী এসব পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাই সমালোচকদের সহজেই রক্ষণশীল বা পুরনো চিন্তার মানুষ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়।
উত্তরাখণ্ডের আইন তৈরির কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা হিন্দু নেতা শত্রুঘ্ন সিং বলেন, কট্টর ইসলামপন্থীরা মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় কোনো পরিবর্তন করা যায় না।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই আইন আসলে নারীর মুক্তি বা উদার সমাজ তৈরির জন্য করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে উত্তরাখণ্ডের আইনের একটি নিয়মের কথা বলা যায়। সেখানে কোনো যুগল বিয়ের বাইরে একসঙ্গে বসবাস করলে, অর্থাৎ ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কে থাকলে, ৩০ দিনের মধ্যে সরকারকে তা জানাতে হবে। না জানালে জেলও হতে পারে।
সরকার ও বিজেপির নেতারা বলছেন, এর উদ্দেশ্য নারীদের প্রতারণা বা নির্যাতন থেকে রক্ষা করা। তাদের যুক্তি, সম্পর্কগুলো সরকারের নজরে এলে নারীদের শোষণের সুযোগ কমবে।
কিন্তু সমালোচকদের ভাষ্য, অনেকে ইচ্ছা করেই বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকেন, কারণ তারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন অন্যের নজর থেকে দূরে রাখতে চান। বিশেষ করে ভিন্ন জাত বা ভিন্ন ধর্মের মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন আইনের কারণে এসব ব্যক্তিগত সম্পর্কও সবার জানার বিষয় হয়ে যেতে পারে।
এমনকি আইনের কিছু ধারায় ধর্মীয় নেতা, পরিবারের সদস্য এবং সাধারণ মানুষও কোনো যুগলের লিভ-ইন সম্পর্কের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে সেটি বন্ধ করার সুযোগ পেতে পারেন।
ভারতের বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে নারীদের জন্য যেসব ভালো নিয়ম আছে, নতুন আইনে সেগুলোও গ্রহণ করা হচ্ছে না।
মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইনের কথাই ধরা যাক। এই আইনে সাধারণত একজন মুসলিম নারী হিন্দু নারীর তুলনায় নির্যাতনমূলক বিয়ে থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেন। মুসলিম নারীরা ‘দেনমোহর’ নামের একটি আর্থিক সুবিধাও পান। বিয়ের সময় স্বামীকে এই অর্থ দিতে হয়, যাতে স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা থাকে।
কিন্তু ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আইন বিশেষজ্ঞ সৌম্য সাক্সেনার মতে, উত্তরাখণ্ডের পুরোপুরি হিন্দু সদস্যদের নিয়ে গঠিত ইউসিসি কমিটি মূলত পুরোনো হিন্দু পারিবারিক আইন প্রায় হুবহু কপি করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরও চাপিয়ে দিয়েছে।
হিন্দু আইনের পুরোনো সমস্যাগুলোও ঠিক করছে না ইউসিসি। এখনো অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু বিধবা, স্ত্রী ও মায়েরা বংশগত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। নতুন আইন তৈরির সময় ভারতের আদিবাসী সমাজগুলোর নিয়মও বিবেচনা করা হয়নি। অথচ অনেক আদিবাসী সমাজে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি অধিকার ও মর্যাদা পান। সমালোচকরা বলছেন, এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেকেই বিজেপিকে ভোট দেন। তারপরও তাদের নিয়ম ইউসিসিতে রাখা হয়নি।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বিদেশিদের সামনে উত্তরাখণ্ডের কর্মকর্তারা আইনটিকে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলে তুলে ধরেন। কিন্তু কেন প্রথমে উত্তরাখণ্ডে এই আইন চালু করা হলো, তা ব্যাখ্যা করতে গেলেই ধর্মীয় বিষয় সামনে চলে আসে।
গত ২৫ বছরের বেশিরভাগ সময় উত্তরাখণ্ডে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে রাজ্যটিতে প্রচুর হিন্দু তীর্থযাত্রী আসেন। কর্মকর্তাদের মতে, হিন্দুদের কাছে উত্তরাখণ্ডের ধর্মীয় গুরুত্ব অনেকটা ইহুদিদের কাছে জেরুজালেমের মতো। তারা আরও দাবি করেন, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মুসলিম পুরুষেরা অনেক বিয়ে করে হিন্দুদের তুলনায় বেশি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন–এমন একটি ধারণাও তারা তুলে ধরেন। তারা এটিকে মুসলিমদের নিজেদের জনসংখ্যা ‘বিস্তার করার মানসিকতা’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে বাস্তবে উত্তরাখণ্ডে ইউসিসি চালুর প্রভাব এখনো খুব বেশি দেখা যায়নি। নতুন আইনে প্রথম ফৌজদারি মামলা হয় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। এক নারী অভিযোগ করেন, তার স্বামী ‘হালালা’ নামের পুরোনো একটি মুসলিম বিবাহ-প্রথা ব্যবহার করতে চাইছেন।
জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই রাজ্যে ১০০টিরও কম যুগল তাদের লিভ-ইন সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারকে জানিয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই আইন মুসলিমদের সমাজের মূলধারা থেকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা খুরশীদ আহমেদ আদালতে না গিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই সমস্যার সমাধান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে এতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমার বদলে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, উত্তরাখণ্ড ছিল বিজেপির বড় পরিকল্পনার একটি পরীক্ষামাত্র। বিজেপি চায় ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে। রক্ষণশীল হিন্দু-প্রধান উত্তরাখণ্ডে নতুন আইনের বিরুদ্ধে তেমন বড় প্রতিবাদ হয়নি। আইন বাস্তবায়নও মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে।
এখন উত্তরাখণ্ডের শত্রুঘ্ন সিং পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি তৈরির কমিটিতেও আছেন। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ মুসলিম। এই হার ভারতের জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র এবং অনেক সময় সহিংস রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য পরিচিত।
মে মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি রাজ্যের একটি, যেখানে কখনো বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি। এখন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় নতুন নাগরিক আইন নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সেখানে বড় ধরনের অশান্তি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু পর্যবেক্ষক।