ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে গত ৩১ জুলাই এক অভিনব প্রতিবাদ করেন দেশটির নির্দলীয় এমপি পাপ্পু যাদব। গেরুয়া পোশাক পরে এবং হাতে একটি দানবাক্স নিয়ে তিনি পার্লামেন্ট ভবনের প্রবেশপথের কাছে বসেন। এরপর একে একে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সেখানে টাকা দিতে থাকেন। তাদের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও ছিলেন। আর প্রতিবারই পাপ্পু দানবাক্স থেকে টাকা সরিয়ে নিজের পকেটে সেটা ঢুকিয়ে নিচ্ছেন।
এতে সেখানে থাকা মানুষজন উল্লাসে ফেটে পড়েন। পার্লামেন্টের স্বাভাবিক আলোচনার চেয়েও এই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
অযোধ্যার রাম মন্দিরে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এই অভিনব প্রতিবাদ করেন পাপ্পু যাদব ও অন্য বিরোধী নেতারা।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে অবস্থিত রাম মন্দিরে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ দর্শনে যান। অভিযোগ উঠেছে, মন্দিরের কিছু কর্মী ভক্তদের দেওয়া অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সরকারি এক প্রতিবেদনে এমন কিছু অনিয়মের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।
পুরো ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে। তবে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ৭ কোটি রুপিরও বেশি হতে পারে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগটি প্রথম জুনের শুরুতে প্রকাশ করে ‘টপ সিক্রেট’ নামের একটি সংবাদমাধ্যম। এর সম্পাদক অভিষেক উপাধ্যায় বলেন, দুর্নীতির ঘটনা আরও বড় হতে পারে। তার দাবি, এক ব্যক্তি তদন্তকারীদের কাছে তথ্য দিয়েছেন যে মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়েছে।
অভিষেকের দাবি, মন্দির নির্মাণে প্রথমে ৮০০ কোটি রুপি খরচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে মন্দির উদ্বোধনের সময় সেই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২০০ কোটি রুপিতে।
এই ঘটনা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য বেশ বিব্রতকর। কারণ উত্তর প্রদেশেও বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। দলটি নিজেদের স্বচ্ছতা ও সততার পক্ষে বলে দাবি করে।
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স
রাম মন্দির নির্মাণ বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য। বহু বছর ধরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অযোধ্যায় রামের জন্মস্থান বলে বিশ্বাস করা জায়গায় একটি মন্দির নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল। ওই জায়গায় ১৬ শতকে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালে মসজিদটির সামনে একটি সমাবেশ থেকে দাঙ্গা শুরু হলে সেটি ভেঙে ফেলা হয়।
২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই জমির মালিকানা হিন্দুদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলমানদের নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য কাছাকাছি অন্য জায়গায় জমি দেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর ২০২৪ সালে ওই জায়গায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও অংশ নেন।
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য বলছে, মন্দিরটির পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে একটি বেসরকারি ট্রাস্টের হাতে। এই ট্রাস্টের সদস্যদের মধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ভারতে বড় মন্দির পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি অস্বাভাবিক ব্যবস্থা। কারণ ভারতের বেশিরভাগ বড় মন্দির সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এর একটি কারণ হলো, এতে দুর্নীতি কমানো সহজ হয়।
তবে সাংবাদিক অভিষেক উপাধ্যায়ের দাবি, রাম মন্দিরের ট্রাস্টে প্রয়োজনীয় পেশাদার দক্ষতার অভাব রয়েছে। তার মতে, ট্রাস্টটি অনেকটা পারিবারিক ব্যবসার মতো করে পরিচালিত হয়েছে।
এই ঘটনায় বিজেপির ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাম মন্দির নির্মাণের অন্যতম প্রধান মুখ নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলেননি।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অবশ্য বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ঘটনায় ভক্তরা কষ্ট পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে বিরোধী দল বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে অবস্থিত রাম মন্দিরে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ দর্শনে যান। ছবি: রয়টার্স
বিজেপি সরকার এ ঘটনায় তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। ২৩ জুন প্রকাশিত তদন্ত দলের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মন্দিরে অন্তত ৭০টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। দুর্বল নিরাপত্তা ও নিম্নমানের ব্যবস্থাপনার কারণে এসব চুরি সম্ভব হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তের পর ট্রাস্টের দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। কিন্তু এতে ভক্তদের আস্থা ফিরে আসেনি। মন্দিরে মানুষের দেওয়া অনুদানের পরিমাণও অনেক কমে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছর উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচন বিজেপির জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। সম্প্রতি একটি জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় রাম মন্দিরের এই বিতর্ককে গুরুত্ব দেবেন।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বড় ধরনের বিক্ষোভের পর এখনো পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে চলা তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
এরপর ৪ আগস্ট আবারও বিক্ষোভ হয়। এবার দেশজুড়ে পেট্রোলে ইথানল মেশানোকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। গাড়িচালকদের আশঙ্কা, ইথানল মেশানো জ্বালানি ব্যবহারে তাদের গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এসব অস্থিরতার প্রভাব নির্বাচনে কেমন হতে পারে তার একটি ইঙ্গিত ইতোমধ্যে পেয়েছে বিজেপি। ৩ আগস্ট পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের একটি আসনে উপনির্বাচন হয়। আসনটি টানা ৩০ বছর ধরে বিজেপির দখলে ছিল। কিন্তু এবার একটি নতুন রাজনৈতিক দলের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যায় বিজেপি।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ভারতে এই সিজেপির আন্দোলনটি বিজেপির জন্য এক বড় ধাক্কা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এলেও প্রথমবারের মতো জোট সরকার গঠন করতে বাধ্য হওয়া দলটি মূলত নিজেদের শক্তি ও আধিপত্য জাহির করার চেষ্টা করছিল। এই আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়া রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
কুগেলম্যান বলেন, চলতি বছরে রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির ধারাবাহিক জয় এবং ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে নতুন দিল্লি এক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হলো—রাজনীতির মাঠে কোনো কিছুই নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায় না।
এরইমধ্যে রাম মন্দিরের এই কেলেঙ্কারির বিষয়টি নিয়ে ভারতজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আগামীতে এই ঘটনা বিজেপির জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।