ads

যন্তর মন্তরের আন্দোলন কি মোদির জন্য ‘অশনিসংকেত’?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যন্তর মন্তরের আন্দোলন কি মোদির জন্য ‘অশনিসংকেত’?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার এক যুগ পেরিয়েছে। তার এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এবারই প্রথম নির্ভীক কণ্ঠে, ক্যামেরার সামনে কোনো ভারতীয়কে বলতে শোনা গেছে, ‘মোদিকে পদত্যাগ করতেই হবে’।

কিছুদিন আগ পর্যন্তও হয়তো এমন স্লোগানের কথা কেউ চিন্তা করেনি। তবে এবার ভারতের জেন-জিরা তা বলে দেখিয়েছে।

Advertisement

শিক্ষাখাতে সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত একমাস ধরে দেশটিতে আন্দোলন চলেছে।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে গতকাল শনিবার পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।

মোদি প্রশ্নফাঁসের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, তবে পুলিশি দমনপীড়নের জন্য সরকার ক্ষমাও চায়নি এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে বলেও কোনো ইঙ্গিত দেননি।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

অনুসন্ধানী সাংবাদিক বিদ্যা কৃষ্ণান আল জাজিরাকে বলেন, অনশনরত আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে সাফদারজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াটা ছিল সরকারের ভুল পদক্ষেপ।

শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে তিনি ২৮ জুন থেকে অনশনে ছিলেন। তাকে জোর করে হাসপাতালে পাঠানোয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।

গত সোমবার আন্দোলনকারীরা দেশটির পার্লামেন্ট অভিমুখে যাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছাড়াই সাধারণ মানুষও রাজপথে নামতে শুরু করে এবং পার্লামেন্টের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন।

দিল্লির যন্তর মন্তরে নামে মানুষের ঢল। দিল্লি পুলিশের সতর্কবার্তা, যন্তর মন্তরমুখী ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, রাস্তায় ব্যারিকেড, ইন্টারনেট বন্ধ এবং সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন–কোনোটিই আন্দোলনকারীদের থামাতে পারেনি।

বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়তে থাকে।

একপর্যায়ে মধ্য নয়াদিল্লিতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। রাতভর ভারী বৃষ্টি, টিয়ার গ্যাস, পেলেট গান ও লাঠিচার্জের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের স্থান ছাড়েননি।

দমন-পীড়নের মুখেও তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। পার্লামেন্ট অভিমুখে এই পদযাত্রা শেষ হতে হতে অন্তত ২০০ জন আহত হন।

বিদ্যা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ছে।

কোথাও কোথাও নারীদের মারধরের অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনার পর আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন আরও বাড়তে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে।

এরপর আন্দোলন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাটনা, মুম্বাই, গোয়াসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারও আন্দোলনে যোগ দেয়।

২০২১ সালের কৃষক আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক কৃষকও পাঞ্জাব থেকে খাদ্য, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়ান।

বিজেপির সাবেক সমর্থকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বিদ্যার ভাষ্য, যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে, তা পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভারতের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভোট কারচুপি, রাজনৈতিক দরকষাকষি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, জোর করে দলবদল করানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাদের মতে, এসব কারণে দেশের গণতন্ত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ের চেয়েও উদ্বেগজনক।

এই সাংবাদিকের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট। নিম্নমানের কাশির সিরাপ খেয়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের দায়ী না করে রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিভাবকদের দোষারোপ করেছেন।

একইভাবে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও জ্বালানির দাম না কমানোর কথা জানিয়েছেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী। আর পেঁয়াজের উচ্চমূল্য নিয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি নিজে পেঁয়াজ খান না।

তার মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জনগণের আস্থা হারিয়েছে। টানা তিন মেয়াদের শাসনে কোভিড-১৯ মহামারি, নোটবাতিল, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, মণিপুরের সহিংসতা কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো বড় বড় সংকটের দায় সরকার কখনোই স্বীকার করেনি।

বরং প্রতিটি সংকটের সময় সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

২০১৯ সালে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) পাস হওয়ার পরও ভারতজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, আইনটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এটি পাস করিয়েছে।

পরে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ চললেও কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সে সময় অনেক আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রতিবাদস্থলগুলোও খালি করে দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট।

একইভাবে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও জ্বালানির দাম না কমানোর কথা জানিয়েছেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী। আর পেঁয়াজের উচ্চমূল্য নিয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি নিজে পেঁয়াজ খান না।

তার মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জনগণের আস্থা হারিয়েছে। টানা তিন মেয়াদের শাসনে কোভিড-১৯ মহামারি, নোটবাতিল, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, মণিপুরের সহিংসতা কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো বড় বড় সংকটের দায় সরকার কখনোই স্বীকার করেনি।

বরং প্রতিটি সংকটের সময় সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

২০১৯ সালে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) পাস হওয়ার পরও ভারতজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, আইনটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এটি পাস করিয়েছে।

পরে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ চললেও কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সে সময় অনেক আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রতিবাদস্থলগুলোও খালি করে দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট।

২০০২ সালে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর থেকে তিনি কখনো নির্বাচনে হারেননি। ২০০১ সালে তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং পরে টানা তিন মেয়াদ সেই দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর টানা তিন মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিজের অনুকূলে রাখতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তবে মোদি সরকারের দমন-পীড়ননীতি সাম্প্রতিক আন্দোলনকে আরও দৃঢ় করেছে। আন্দোলনে জনসমর্থন বাড়িয়েছে।

বিদ্যা কৃষ্ণানের মতে, এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও আলাদা।

তার দাবি, গত এক দশকে ভারতের মানুষের মধ্যে যে ঐক্য ও পারস্পরিক বিশ্বাস কমে গিয়েছিল, যন্তর মন্তরের আন্দোলনে তার কিছুটা ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে।

পুলিশের দমন-পীড়নের পরও শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনস্থলে ফিরে আসেন।

সেখানে তারা জায়গা পরিষ্কার করেন, একে অপরকে সহযোগিতা করেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগের ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করেন।

আবার হাসপাতালে থেকেও সোনাম ওয়াংচুকের অনশন চলতে থাকে।

সোনাম ওয়াংচুক। ছবি: রয়টার্স
সোনাম ওয়াংচুক। ছবি: রয়টার্স

এক মাস আগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে, তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষ এসে তাদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের বাধা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল উপায়ে প্রতিবাদ শুরু করেন।

কেউ খাবার ও পানীয় পাঠান, চিকিৎসকেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আহতদের চিকিৎসা দিতে শুরু করেন, আবার অনেকে আন্দোলনকারীদের জন্য সচেতনতামূলক ভিডিও, গান ও কবিতা তৈরিও করেন।

শেষপর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান গতকাল শনিবার মোদির কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতা দখলের পর থেকে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার ১২ বছরের দীর্ঘ প্রশাসনিক ইতিহাসে এটি কোনো মন্ত্রীর মধ্যবর্তী সময়ে পদত্যাগের দ্বিতীয় ঘটনা।

ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সাংবাদিক অনঘা জয়কুমার লিখেছেন যে, ২০১৪ সালে মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার সরকারের নীতি ছিল প্রধানত মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন অথবা নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে মন্ত্রীদের অব্যাহতি দেওয়া, সরাসরি পদত্যাগের অনুমতি দেওয়া নয়।

এর আগে শুধুমাত্র ২০১৮ সালে মি টু আন্দোলনের সময় তৎকালীন পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের গত ১২ বছরের শাসনকালে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ত্রুটি বা তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখোমুখি হয়ে কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা একটি চরম ব্যতিক্রমী বিষয়।

কেবল নৈতিক বা ব্যক্তিগত আইনি লড়াইয়ের কারণ দেখিয়ে এম জে আকবরের পদত্যাগ ঘটেছিল।

তবে শিক্ষাগত নথিপত্র বা জাতীয় স্তরের পরীক্ষার অনিয়মকে কেন্দ্র করে মধ্যবর্তী সময়ে কোনো প্রথম সারির পূর্ণমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা মোদি সরকারের সার্বিক ইতিহাসে প্রথম।

বিদ্যা কৃষ্ণানের ভাষ্য, ২০১৪ সালের পর এই প্রথম পরিস্থিতি এমন হয়েছে, যেখানে আন্দোলনকারীদের নয়, বরং সরকারের দিকেই চাপ ও উদ্বেগ বেশি দেখা যাচ্ছে।

সম্পর্কিত