সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চুক্তিটি নিয়ে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ইসরায়েল মনে করছে, চুক্তিটিতে সৌদির নিজস্ব ভূমিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের যে পারমাণবিক অস্ত্রের একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য রয়েছে, তা ক্ষুণ্ণ হবে এবং পুরো অঞ্চলে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটি জানিয়েছে, মার্কিন ডানপন্থী ও রক্ষণশীল বিশ্লেষকরা চুক্তিটি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিলে পারমাণবিক বিস্তার রোধ নীতি দুর্বল হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে পরমাণু বোমার কৌশলগত হুমকি দিয়ে রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অতিরিক্ত সামরিক নিরাপত্তা সুবিধা আদায় করবে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় সামরিক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবাইকে আশ্বস্ত করে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, সৌদির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে’ ইসরায়েলকে দেশটির স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর। তিনি আরও জানান, এতে ‘কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থাকবে না’। যদিও এর মাধ্যমে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সইয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী, আরব আমিরাত নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত না করার অঙ্গীকার করে। পাশাপাশি, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) অতিরিক্ত প্রোটোকলে সই করে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও নজরদারির আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হয়। আরব আমিরাত এসব শর্ত মেনে নেয়। বর্তমানে দেশটির চারটি পারমাণবিক চুল্লি জাতীয় বিদ্যুতের প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করছে। কঠোর শর্তের কারণে মার্কিন কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে পারমাণবিক সহযোগিতার ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তবে ২২ জুলাই ট্রাম্প সৌদির সঙ্গে যে চুক্তির কথা ঘোষণা করেন, তা মানদণ্ডের বিচারে ব্রোঞ্জ পদকের যোগ্যও নয়। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত কপি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, এটি সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করবে।
তবে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। এখন পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী, এতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ না করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে, সৌদির সত্যিই এই প্রযুক্তির প্রয়োজন আছে কি না, তা জানতে দুই দেশ যৌথভাবে দুই বছরের একটি সমীক্ষা চালাবে। যদি সমীক্ষায় প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। আর যদি এমন প্রয়োজন না থাকে, তাহলে সৌদি আরব আগামী ১০ বছর এই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করবে না বলে সম্মত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, সৌদির সব পারমাণবিক কার্যক্রম কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় থাকবে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদিকে অতিরিক্ত প্রোটোকলে সই করতে হবে না। মার্কিন কংগ্রেস চাইলে এই চুক্তি আটকে দিতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। গ্রীষ্মকালে তীব্র গরমে দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তখন বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে অপরিশোধিত খনিজ তেল পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। এটি ব্যয়বহুল, অপচয়মূলক এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে সৌদি আরব বিদ্যুৎ তৈরিতে কম তেল ব্যবহার করবে। ফলে আরও বেশি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই চুক্তির লাভ খুব বেশি নয়। শুরুতে এই পারমাণবিক চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি করানো। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে বিষয়টি বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এখন এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত সৌদি আরবকে চীন ও রাশিয়ার কাছাকাছি যেতে না দেওয়া। একই সঙ্গে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরবের অসন্তোষ কমানোর চেষ্টাও এর পেছনে থাকতে পারে। ট্রাম্পের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। কোনো ব্যর্থ সামরিক অভিযানের পর একটি নতুন চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা তিনি আগেও করেছেন।
চুক্তির ঝুঁকিগুলো কী?
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দেশটিতে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে রাজতন্ত্র রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে সরকার বা নেতৃত্ব বদলাতে পারে। তখন দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এ ছাড়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগেই বলেছেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও সেই পথে হাঁটবে। তাই এই চুক্তি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি ইরানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেয়, তাহলে ইরান কেন নিজের কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি হবে–এমন প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতও অসন্তুষ্ট হতে পারে। কারণ তারা কঠোর শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করেছিল। কিন্তু সৌদি আরব তুলনামূলক অনেক শিথিল শর্তে একই ধরনের সুবিধা পাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ইসরায়েলও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। একইভাবে তুরস্কও ভাবতে পারে, তাদেরও কি পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৮ সালের এনপিটি চুক্তিটি বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার সীমিত রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এরপর থেকে মাত্র চারটি দেশ–ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া এই চুক্তির বাইরে থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই অভিন্ন নীতি ছিল। কিন্তু সমালোচকদের মতে, সৌদি আরবকে ছাড় দিলে সেই নীতিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আগ্রহ বাড়তে পারে।
উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বলা হচ্ছে। দেশটির কিছু নীতিনির্ধারক মনে করছেন, উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় নিজেদেরও পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত। একই ধরনের আলোচনা জাপানেও শুরু হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র আদৌ তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ চুক্তি অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে আগে দুই বছরের একটি সমীক্ষা হবে। অনেকের মতে, এটি কঠিন সিদ্ধান্ত কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার একটি উপায়ও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই বছর শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টের ওপর পড়বে। তিনি ট্রাম্পের তুলনায় বিষয়টি আরও সতর্কভাবে বিবেচনা করতে পারেন। বর্তমান চুক্তিটি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাদের মতে, সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো একই ধরনের কঠোর শর্ত আরোপ করা উচিত। আর মার্কিন কংগ্রেসের উচিত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ দিয়ে আরও কঠোর ও নিরাপদ একটি চুক্তি নিশ্চিত করা।