নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণের জন্য অনেকেই রেলপথ ব্যবহার করে থাকেন। রেল শুধু যাত্রীই আনা-নেওয়া করে না, এই পথে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পরিবহনও করা যায়। এই দুটি ক্ষেত্রে আরও বেশি গতি আনতে দেশের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার।
এর মধ্যে নতুন রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু, যাত্রীসেবা উন্নয়ন, পণ্য পরিবহন বাড়ানো এবং পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক ও উচ্চগতির ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো, যাতায়াতে সময় কমানো, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং দেশের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় রেলের ভূমিকা আরও জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথি অনুযায়ী, রেলওয়ে উন্নয়নে নতুন রেললাইন ও সেতু নির্মাণ, আধুনিক লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহ, বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়া, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ বাড়ানো এবং কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঢাকা-কুমিল্লা অংশে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ করিডোরের জন্য একটি প্রস্তাবিত কর্ড লাইন নির্মাণ।
বাজেট বক্তৃতা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই নতুন লাইন চালু হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে। বর্তমানের প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে দাঁড়াবে প্রায় ২৪০ কিলোমিটারে। এর ফলে দুই শহরের মধ্যে ট্রেন যাত্রার সময় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা থেকে কমে তিন ঘণ্টায় নেমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় জানান, কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রস্তাবিত তিনটি রুটের মধ্যে প্রাথমিকভাবে শ্যামপুর-কুমিল্লা রুট নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই সংক্ষিপ্ত রেলপথে পণ্য পরিবহনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর, প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন বিদ্যমান চট্টগ্রাম-ফেনী-কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ভৈরব-নরসিংদী রেলপথ ব্যবহার করে সরাসরি প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
সরকারের মতে, এই সংযোগ দেশের লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন সহজ ও দ্রুত করতে ভূমিকা রাখবে।
এদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচলের উপযোগী করার দিকেও এগোচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে জানান, এই করিডোরে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার জন্য ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পটির বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সময়সূচি তৈরি করা হবে। অর্থের সংস্থান সাপেক্ষে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গড় গতি বাড়ার পাশাপাশি যাত্রার সময়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার কাজও এগিয়ে চলছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
লাকসাম-চট্টগ্রাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন উন্নয়ন প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অন্যদিকে, টঙ্গী-আখাউড়া প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ও ট্রেনের গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের রেলওয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু যাত্রী পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রেলপথে পণ্য পরিবহনের ওপরও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় রেলের ভূমিকা শক্তিশালী করতে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী ও ধীরাশ্রম আইসিডির মধ্যে প্রস্তাবিত রেল সংযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব সংযোগ বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
রেলওয়ে উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি উপযুক্ত অবকাঠামো প্রকল্পে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।ডআধুনিকায়ন কর্মসূচির আওতায় নতুন লোকোমোটিভ, যাত্রীবাহী কোচ ও পণ্যবাহী ওয়াগন সংগ্রহের পাশাপাশি রেলসেতু নির্মাণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশে কোচ ও লোকোমোটিভের সংযোজন বা নির্মাণ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আমদানি করা রেলযানের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
এছাড়া, ট্রেন পরিচালনার নির্ভরযোগ্যতা এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মান উন্নয়নে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের সব জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ শহরকে ধীরে ধীরে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যানেও নতুন রেলপথ নির্মাণ ও বিদ্যমান করিডোর উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের বন্দর ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জন্য নয় হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে চলতি অর্থবছরের কর্মসূচিতে রেলওয়ে উন্নয়নের গুরুত্বের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এসব পরিকল্পনার মাধ্যমে অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, দ্রুততর যাত্রীসেবা এবং পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বয়ে একটি আরও সমন্বিত রেলওয়ে ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় ২২১ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে আয় কিছুটা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় এখনও আয়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি দুই হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় করেছে। আগের অর্থবছরে আয় ছিল এক হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বেতন-ভাতা, পেনশন এবং রেলপথ ও রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণসহ মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।
এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেলওয়ের ব্যয়-আয় অনুপাত দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ৯১। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই অনুপাত ছিল দুই দশমিক ০৯।
অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন ব্যয় এখনও আয়ের তুলনায় বেশি।