ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের নেপথ্যের শান্ত স্বভাবের মানুষটি বিদায় নেওয়ার পথেই ছিলেন। কিন্তু এখন শিল্পগোষ্ঠীটি পরিচালনার জন্য আরও পাঁচ বছর থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নটরাজন চন্দ্রশেখরন। গোষ্ঠীটির পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষে থাকলেও এর নিয়ন্ত্রণকারী দাতব্য ট্রাস্টগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়েছেন তিনি।
গোষ্ঠীটির হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ ৬৩ বছর বয়সী চন্দ্রশেখরনকে চেয়ারম্যান হিসেবে আরও পাঁচ বছরের জন্য তৃতীয় মেয়াদ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর আগে গত মাসে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে তিনি আর দায়িত্বে থাকবেন না। পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলান তিনি।
একমাত্র বিরোধী ভোটটি দিয়েছেন টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান এবং শিল্পগোষ্ঠীটির প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নোয়েল টাটা। টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ মালিকানা থাকা ট্রাস্টগুলো এই সিদ্ধান্তকে ‘আইনগতভাবে অকার্যকর’ বলে অভিহিত করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
নোয়েল টাটার সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি চন্দ্রশেখরনের সামনে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা বাধ্যতামূলক কি না, হোল্ডিং কোম্পানিটির এক সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারের প্রস্তাবিত ২৬০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি, এয়ার ইন্ডিয়া গ্রুপের সম্মিলিত ২৩৩ কোটি ডলারের বার্ষিক লোকসান এবং গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ব্যবসায় মন্দা।
একই সময়ে টাটা ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। অ্যাপল ও টেসলা তাদের গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে এবং চিপ উৎপাদনে কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে টাটা।
তবে চন্দ্রশেখরনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ ও এর নিয়ন্ত্রণকারী ট্রাস্টগুলোর প্রকাশ্য বিরোধ। এতে কোম্পানি ও তার সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক দৈনিক ইকোনমিক টাইমস শুক্রবার প্রথম পাতায় শিরোনাম করেছে—‘টাটায় সর্বাত্মক যুদ্ধ’।
টাটার এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অন্য সব বিষয়ে তিনি (চন্দ্রশেখরন) উপযুক্ত লোক বসাতে পারেন। কিন্তু এটি তাকেই সমাধান করতে হবে।”
ভারতের ব্যবসায়িক মহলে ‘চন্দ্রা’ নামে পরিচিত চন্দ্রশেখরন সম্পর্কে ওই নির্বাহী বলেন, “বিভিন্ন ব্যবসার কৌশলগত বিষয়গুলো বোঝার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে এবং তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি খুব ভালো।”
এর আগেও টাটা গ্রুপ এমন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইরাস মিস্ত্রিকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেয় টাটা সন্স। গোষ্ঠীটির কর্ণধার রতন টাটার সঙ্গে সুশাসন নিয়ে মতবিরোধের পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর মিস্ত্রির অপসারণ ও টাটা সন্সের পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে কয়েক বছর ধরে আইনি লড়াই চলে।
অধৈর্য ‘চন্দ্রা’
তামিলনাড়ুর মহনুর গ্রামের ছয় সন্তানের একজন হিসেবে বেড়ে ওঠেন চন্দ্রশেখরন। তিনি তামিল ভাষার একটি সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৭ সালে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেসে (টিসিএস) যোগ দেন এবং পুরো কর্মজীবনই টাটা গ্রুপে কাটিয়েছেন।
২০০৯ সালে টিসিএসের দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীটির অভ্যন্তরীণ মহলে তাকে নেপথ্যে কাজ করা একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হতো। প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও তার মধ্যে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ঘাটতি রয়েছে—এমন ধারণা ছিল অনেকের। তার শান্ত স্বভাব বিদেশি গ্রাহকদের মন জয় করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় ছিল।
তবে তিনি দায়িত্বটি গ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বে টিসিএস ভারতের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে টাটা সন্স পরিচালনার জন্য চন্দ্রশেখরনকে বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে টাটাদের অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র পারসি জরথুস্ত্রী সম্প্রদায়ের (বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী) বাইরের কোনো ব্যক্তি হিসেবে তিনিই প্রথম টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হন।
২০১৮ সালে দ্য উইক সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “কর্মজীবনের শুরুর দিকে আমি খুবই অধৈর্য ছিলাম।” দীর্ঘ দূরত্বের দৌড় তাকে আরও ধৈর্যশীল ও পর্যবেক্ষণক্ষম করে তুলেছে বলেও জানান তিনি।
বিস্তারিত বিষয়ে নজর এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জন্যও তিনি সুনাম অর্জন করেন। সাবেক সহকর্মীরা এমন একজন নির্বাহীর কথা বলেছেন, যিনি ব্যবসার সামগ্রিক দিকনির্দেশনা থেকে শুরু করে কোনো নির্দিষ্ট গ্রাহকের কাছে উপস্থাপনার খুঁটিনাটি—সবকিছুতেই সমানভাবে মনোযোগ দিতে পারতেন। তবে একই সঙ্গে সহকর্মীদের কাজ করার যথেষ্ট স্বাধীনতাও দিতেন।
ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা
২০১৭ সালে চন্দ্রশেখরন টাটা সন্সের শীর্ষ পদ অর্থাৎ চেয়ারম্যান হওয়ার পর নয় বছরে টাটা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য ৭৬ বিলিয়ন ডলার থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চে বেড়ে ২৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
চন্দ্রশেখরনকে এই পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন টাটা গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান ও দীর্ঘদিনের কর্ণধার রতন টাটা। ২০২৪ সালে রতন টাটা মারা যান। তার সৎভাই নোয়েল টাটা এরপর টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান হন।
এরপর টাটার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম এয়ার ইন্ডিয়া। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে টাটা সন্স সরকারের কাছ থেকে এয়ার ইন্ডিয়া কিনে নেয়। এরপর বিমান সংস্থাটির ক্রমবর্ধমান লোকসান নিয়ে চন্দ্রশেখরন ও ট্রাস্টগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।
নোয়েল টাটা বলেছেন, চন্দ্রশেখরন এর আগে সরে দাঁড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিই বহাল থাকা উচিত। তবে ট্রাস্টগুলোর সমালোচনার বিষয়ে চন্দ্রশেখরন প্রকাশ্যে কোনো জবাব দেননি। বিরোধ নিয়েও এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছেন তিনি।
গত মাসে পুনর্নিয়োগ না চাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর চন্দ্রশেখরন মুম্বাইয়ে গোষ্ঠীটির সদর দপ্তর বম্বে হাউসে এক টাউন হল বৈঠকে কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তার কর্মজীবন তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা তিনি কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। তবে সব কর্মজীবনেরই একসময় সমাপ্তি ঘটে।
বক্তব্য শেষে করতালির মধ্যে তিনি কক্ষ ত্যাগ করেন। পাঁচ সপ্তাহ পর, ১৭ সেপ্টেম্বর, তিনি দায়িত্বে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।