Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেই বদলে যায় শিক্ষাক্রম, কেন?

ফজলে রাব্বি

ফজলে রাব্বি

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ১৯
রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেই বদলে যায় শিক্ষাক্রম, কেন?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে সাতবার বড় পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিবারই দেখা গেছে, দেশে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে অবধারিতভাবেই বদলে যায় শিক্ষানীতি। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষানীতিতে হওয়া বদলগুলোর সঙ্গে সরকার বদলের গভীর সংযোগ রয়েছে। আর এই সংযোগ বাংলাদেশকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষা গবেষকরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক মনে করেন, “সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা কারিকুলাম ও নীতি বারবার পরিবর্তন করা চরম অনাকাঙ্ক্ষিত।”

Advertisement
Advertisement
Advertisement

একই অবস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য ও শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলামের। চরচাকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষ এই অনাকাঙ্ক্ষিত কাজের চরম খেসারত দিচ্ছে।”

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়ার পর নিজস্ব কোনো শিক্ষানীতি ছিল না। উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিল ১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সময় এয়ার মার্শাল নূর খানকে প্রধান করে গঠন করা কমিটির অবশেষ। আর আরেকটু পেছনে গেলে ছিল ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানকে প্রধান করে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। মনে রাখা দরকার এই হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের প্রেক্ষাপটে ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। ১৯৫৮ সালে গঠিত শরীফ কমিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এর মধ্যেই ঘটে গেছে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিগত শিক্ষা কমিশনগুলোর অবশেষ উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও খুব দ্রুততার সঙ্গে একটি কমিশন গঠন করে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদাকে চেয়ারম্যান করে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’, ১৯৭৪ সালের ৩০ মে প্রতিবেদন পেশ করে।

জিও ব্যাগেও থামছে না তিস্তার ভাঙন, বরাদ্দ সংকট না পরিকল্পনার অভাব?teesta 2

কিন্তু এই দুই বছর আসলে বাংলাদেশ কোন শিক্ষানীতি অনুসরণ করেছে? ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন থেকে ১৯৭৪ সালের ৩০ মে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসরণ করেনি। এ সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পাকিস্তান আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর চলতে থাকে। তবে ১৯৭২ সালের সংবিধানের শিক্ষা-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে নতুন শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বিপুলা পৃথিবী’-তে লিখেছেন, “১৯৭২-৭৪ সালে বাংলাদেশ কোনো পূর্ণাঙ্গ, সমন্বিত জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসরণ করছিল না। স্বাধীনতার পরপরই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; কিন্তু কমিশন গঠনের আগপর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ শিক্ষানীতির গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে কুদরাত-ই-খুদা কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার পরই একটি সুসংহত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।”

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিকথায আরও লিখেছেন, “শিক্ষানীতি প্রণয়ন সহজ করতে বঙ্গবব্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের কত শতাংশ সরকার বরাদ্দ করতে পারবে বলে জানতে চান। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেশের জন্য উপযুক্ত মনে হলে কমিশন যেন সেই শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করে; অর্থের ব্যবস্থা তিনি করবেন।”

দেশের প্রথম এই শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাবে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মোট আট বছর এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মেয়াদ নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মোট চার বছর করার কথা বলা হয়। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি চার বছর মেয়াদী সম্মিলিত ডিগ্রি কোর্স এবং এক বছরের মাস্টার্স কোর্স চালুর প্রস্তাব করা হয়। তবে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরে সর্বজনীন ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন, প্রচলিত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা (১ম থেকে ৫ম শ্রেণি) ১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক করা এবং ১৯৮৩ সাল নাগাদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে কমিশন। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়।

একইসঙ্গে মাধ্যমিক স্তরে সমন্বিত বহুমুখী কোর্স চালুর সুপারিশ করা হয় এতে। কমিশন প্রস্তাব করে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা হবে যুগপৎ তিন বছর মেয়াদী বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং চার বছর মেয়াদী সাধারণ শিক্ষা। বৃত্তিমূলক শিক্ষাটি থাকবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য। আর সাধারণ শিক্ষাটি থাকবে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার প্রস্ততিমূলক স্তর হিসেবে।

শিক্ষা দিবস: ৬৪ বছর পরও কেন বৈষম্যের পাঠ শেষ হলো না?education-ai-generated-photo

এই কমিশনের সুপারিশের আলোকে ১৯৭৫ সালে সরকার জাতীয় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়নে অধ্যাপক সামছুল হুদার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে ছিলেন ৪৭ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। এর মাঝেই ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। এই কমিটি ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে এর কার্যক্রম শুরু করে। এই কমিটি ১৯৭৬, ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে সাত খণ্ডে এর সুপারিশ পেশ করে। কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে একমুখী ও সমরূপ মাধ্যমিক শিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন এবং ১৯৮০ সালের স্কুল সেশন থেকে নবম শ্রেণি স্তরে এই পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করে।

কুদরত-ই-খুদা কমিশনের প্রতিবেদনকে ভিত্তি ধরে অধ্যাপক সামছুল হুদা কমিটির সুপারিশে, মাদরাসা ও টোল শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমানের করা এবং ক্রমে একমুখী শিক্ষা চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু এটিও সেভাবে বাস্তবায়নের পথে হাঁটার বদলে নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়।

কুদরত-ই-খুদা কমিশনের প্রতিবেদন পুনঃপর্যালোচনার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে গঠিত হয় আরেকটি জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি, যা ১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন পেশ করে। ‘অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষা সুপারিশ’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোকে তিনটি উপ-পর্যায়ে ভাগ করা হয়–নিম্ন মাধ্যমিক (৩ বছর), মাধ্যমিক (২ বছর) এবং উচ্চ মাধ্যমিক (২ বছর)। আগের প্রতিটি ধাপে একমুখী শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হলেও এ পর্যায়েই প্রথম মাদরাসা শিক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, সাধারণ শিক্ষাস্তরের সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষার স্তরের সমানুপাতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এই পর্যায়ে মূলত গণশিক্ষা কার্যক্রম ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি মাদরাসা ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করে এ ধারার উচ্চশিক্ষার পথ তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলিক বদল আনে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণার শিরোনাম ছিল–Historical Development of Secondary Education in Bangladesh: Colonial Period to 21st Century. অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে হওয়া ওই গবেষণা প্রতিবেদনেও ১৯৭৯ সালের ‘অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি’কে বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

শিক্ষকদের জন্য পৃথক পে-স্কেল ঘোষণা করা হবে: শিক্ষামন্ত্রীmilon

এ বিষয়ে শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান চরচাকে বলেন, “এই নীতিতে মাধ্যমিক শিক্ষাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়—তিন বছরের নিম্ন মাধ্যমিক, দুই বছরের মাধ্যমিক এবং দুই বছরের উচ্চমাধ্যমিক। একই সঙ্গে বৃত্তিমূলক, কারিগরি, কৃষি ও চিকিৎসা শিক্ষাকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ, শিক্ষাকে শুধু একাডেমিক ধারায় সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার একটি স্পষ্ট প্রবণতা এখানে দেখা যায়।”

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তখনো চলছিল। ‘অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি’ বাস্তবায়নের আগেই ১৯৮১ সালে দ্বিতীয় সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় বদল আসে। আর নতুন বাস্তবতায় আবারও গঠিত হয় আরেকটি শিক্ষা কমিশন। ১৯৮৩ সালে গঠিত মজিদ খান শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন অবশ্য সেভাবে প্রচার পায়নি। এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এরশাদের সেই শাসনামলেই ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মফিজউদ্দীন আহমদকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যা ১৯৮৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন পেশ করে। এতে তিন বছর মেয়াদী ডিগ্রি কোর্স এবং দুই বছরের মাস্টার্স কোর্স প্রবর্তন এবং ডিগ্রি কলেজগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়। এই কমিশন উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের জন্য সবিস্তার সুপারিশ হাজির করে, যেখানে ছিল বর্তমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি কাঠামো তৈরি, বড় জেলা, বিভাগ ও রাজধানীতে একটি করে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নীতি ও বিধিমালা, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের পূর্ণ বেতন ও ভাতাদির দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার জন্য গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র উন্নয়ন, পিএইচডি গবেষকদের ফেলোশিপ প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ স্থাপন এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপ্লয়মেন্ট ব্যুরো স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।

এর পর ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হলে শিক্ষা খাতে কোনো কমিশন গঠন না করলেও বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। ১৯৯২ সালে প্রাথমিক স্তরে ‘যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম’ এবং ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিক স্তরে ‘উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষাক্রম’ চালু করা হয়।

পরে ১৯৯৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৬। ওই বছরই জমা দেওয়া কমিশন প্রতিবেদনে তিন পর্যায়ে শিক্ষার কথা বলা হয়–প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। এখানেও প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি আট বছর করার সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে আদর্শ ধরে নেওয়া হয় কুদরত-ই­-খুদা শিক্ষা কমিশনকে।

পরের সরকার এসে ২০০১ সালে আবার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। ড. এম এ বারীর নেতৃত্বাধীন এই কমিটির লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ক্ষেত্রে আশু বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা, যা ২০০৩ সালে গঠিত মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন বিবেচনায় নেয়। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে গঠিত এই কমিশন ২০০৪ সালের মার্চে প্রতিবেদন জমা দেয়।

মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে শিক্ষাকে তিনটি ধারায় বিভক্ত করা হয়–সাধারণ, পেশাগত ও বিশেষায়িত শিক্ষা। কমিশন সব প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, একমুখী মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত কমানো, শিক্ষকদের যোগ্যতা আপগ্রেড করা, কারিকুলাম ও শিক্ষাদান পদ্ধতির সংস্কার এবং মাধ্যমিক স্তরে মূল্যায়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতির উৎকর্ষের সুপারিশ করে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ, তাদের বেতন-ভাতাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব করা হয় সুপারিশে। চালু হয় প্রাক-প্রাথমিক স্তর ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ ব্যবস্থা। গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মসংস্থানের ওপর। একইসঙ্গে কৃষি, প্রযুক্তি, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ে একমুখী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারকে নিরুৎসাহিত করে। এ পর্যায়েই ব্যক্তি উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা স্থাপনকে উৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি এতে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়।

২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষাক্রমকে নতুন করে সাজানো হবে: মাহদী আমিনmahdi amin

এরপর আবার ক্ষমতার বদল। ২০০৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করা হয়। বিগত শিক্ষানীতিকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে গঠিত এই ১৬ সদস্যের কমিটি কুদরত-ই-খুদা কমিশন ও শামসুল হক কমিশনের আলোকে একটি নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া সেই প্রতিবেদনের মুখ্য সুপারিশের মধ্যে ছিল–স্নাতকপূর্ব শিক্ষার তিনটি পর্যায়কে দুটি পর্যায়ে রূপান্তর, শিক্ষার সব পর্যায়ে কিছু আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ও শিক্ষাকে আরও প্রয়োজন-নির্ভর করা। এতে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ আট বছর, অষ্টম শ্রেণির পর প্রাথমিক স্তরের সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠান ও এর ভিত্তিতে মাধ্যমিক স্কুল বৃত্তি প্রদান, মাধ্যমিক স্তরের মেয়াদ চার বছর, দশম শ্রেণি শেষে সরকারি বৃত্তি পরীক্ষা, মাধ্যমিক সমাপনী দ্বাদশ শ্রেণি শেষে অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলা ভাষা, নীতি শিক্ষা, বাংলাদেশ স্টাডিজ, গণিত, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সমাজ পাঠ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসহ কতিপয় মৌলিক বিষয় আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। এতে তথ্যপ্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করে মাদ্রাসা শিক্ষাকে পুনর্বিন্যাসের কথাও বলা হয়। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়।

কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ীই দেশে প্রচলন হয় সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষাক্রম। মুখস্তনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি বদলের আকাঙ্ক্ষা থেকে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও গাইড বইয়ের প্রভাব বেড়েছে বই কমেনি। এর পর দক্ষতা ও অর্জনভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি আনা হয় ২০২১ সালের রূপরেখায়। ২০০৯ ও ২০২১–দুটিই হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ আমলে। কিন্তু ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতায় বদল। ফলাফল শিক্ষাক্রমে বদলের উদ্যোগ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এই সরকারও। এরই মধ্যে এ বিষয়ে কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। দায়িত্ব নিয়েই এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “ব্যাকডেটেড শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এগোনো যাবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে প্রবর্তন করাসহ আমূল পরিবর্তন করা হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।” শিক্ষাব্যবস্থা আবারও ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন আ ন ম এহসানুল হক মিলন।

প্রতিবারই সরকার বদল কিংবা বড়সড় রাজনৈতিক বদলের পর দেশের শিক্ষানীতিতে বদলের তোড়জোড় শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শিক্ষানীতিতে বদলের উদ্যোগ যে সরকার নিয়েছে, তারা তা বাস্তবায়নের পথে চলতে শুরু করার পরপরই ক্ষমতায় বদল এসেছে। ফল হিসেবে আরেকটি নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এই বদল দেশের শিক্ষাকে কতটা এগিয়েছে? নাকি এটি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিকাশে অন্তরায় হয়ে আছে? এত বদল কেন করা হচ্ছে?

প্রথম দুই প্রশ্নের উত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য ও শিক্ষা-গবেষক ড. মইনুল ইসলাম আগেই দিয়েছেন, যার উল্লেখ প্রতিবেদনের শুরুতেই আছে। তার ভাষ্য ছিল–এর খেসারত বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ দিচ্ছে। অর্থাৎ, বিকাশের প্রশ্নটাই অর্থহীন হয়ে গেছে।

আর তৃতীয় প্রশ্ন? এর উত্তরে ড. মইনুল ইসলাম বললেন, “বাংলাদেশে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও চর্চায় সামাজিক কল্যাণের ভাবনার চরম ঘাটতি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। শিক্ষা কেবল ব্যক্তির উন্নতির জন্য নয়; শিক্ষা হতে হবে বাস্তবমুখী, জীবনধর্মী এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে নিবেদিত।”

শিক্ষানীতিতে বদলের পেছনে সামগ্রিক অর্থে সামাজিক কল্যাণের চেয়ে রাজনীতিই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হকও। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সরকার নানা বক্তব্য দিলেও কার্যত পাঠ্যবইয়ের রাজনৈতিক ব্যবহারের দিকেই তাদের নজর ছিল বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

“শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ ও শিক্ষা কোনো রাজনীতির বিষয় হতে পারে না” উল্লেখ করে অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক চরচাকে বলেন, “বিগত সরকারগুলো পাঠ্যপুস্তকের বোঝা বাড়ানো বা রাজনৈতিক আপসের খাতিরে পাঠ্যক্রম থেকে লেখা বাদ দেওয়া ও নতুন লেখা অন্তর্ভুক্ত করেছে। শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ চিন্তা না করে রাজনৈতিক ফয়সালার জন্য পাঠ্যবইকে ব্যবহার করেছে। এই ধারা থেকে বের হতে না পারলে সামনে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে।”

বিষয়: শিক্ষাবাংলাদেশশিক্ষাক্রমরাজনীতি
সর্বশেষ
  • ১

    খুলনায় চুরির অভিযোগে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে’ পিটিয়ে হত্যা

  • ২

    গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি, সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র

  • ৩

    রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেই বদলে যায় শিক্ষাক্রম, কেন?

  • ৪

    'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি'

  • ৫

    ‘জলের গানের অবস্থা ভালো না’

সম্পর্কিত
  • গুলশানের মিছিল থেকে ওসির অডিও: আ.লীগকে নিয়ে বিএনপির ভাবনা কী?

    গুলশানের মিছিল থেকে ওসির অডিও: আ.লীগকে নিয়ে বিএনপির ভাবনা কী?

    গুলশানের মিছিলের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যে বার্তা এসেছে, তাতে বোঝা যায়, ক্ষমতাসীন দলটি আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না।

  • মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা: সৌদি আরব কী খেলা খেলছে, হুতিরা কী বলছে?

    মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা: সৌদি আরব কী খেলা খেলছে, হুতিরা কী বলছে?

    ইসলামের পবিত্র শহর মক্কার কাছে নাকি হুতিরা একটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এটা সৌদি আরবের দাবি। এ নিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও শুরু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা এখন আর শুধু সৌদি আরব আর হুতিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়–থাকার কথাও ছিল কি?

  • খেলাপি ঋণে জর্জরিত  ৬ ব্যাংক: কাকে ডোবাচ্ছে কে?

    খেলাপি ঋণে জর্জরিত ৬ ব্যাংক: কাকে ডোবাচ্ছে কে?

    গত অর্থ বছরের শেষ মাস অর্থাৎ জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। আর এই খেলাপি ঋণের প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকটাই রয়েছে মাত্র ছয়টি

  • জলবায়ু পরিবর্তন কি নেপালের দুর্যোগকে ত্বরান্বিত করেছে?

    জলবায়ু পরিবর্তন কি নেপালের দুর্যোগকে ত্বরান্বিত করেছে?

    নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। এই আকস্মিক বন্যা মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাটবদ্ধ মাটি গলে গিয়ে একটি পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে