
ছাগল নিয়ে শঠতা
কাঁঠালগাছে দেশটা ভরে গেলে এই দেশ ভরে যাবে ছাগলে—এ রকম একটা ভাবনা কি আমাদের মনে সঙ্গোপনে ছিল? হতেও পারে। তা না হলে দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পর ছাগল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কেন?

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের তৎকালীন ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমেছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে রেখে। সেটি হলো, শিক্ষা কি রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার, নাকি সামর্থ্যবান মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পণ্য? পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক ও শিক্ষা সংকোচনমূলক নীতির বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহসহ অনেকে। তাদের স্মরণে ১৭ সেপ্টেম্বর আমরা শিক্ষা দিবস পালন করি।
ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে প্রশ্নটি আবারও করা দরকার। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়েছিলেন, সেই বৈষম্য কি আমরা দূর করতে পেরেছি?
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, মেয়েদের অংশগ্রহণে অসাধারণ অগ্রগতি এসেছে, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তিসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারপরও শিক্ষা আজ যেন একই দেশের মধ্যে কয়েকটি ভিন্ন বাস্তবতার নাম। বিত্তবান পরিবারের সন্তান ইংরেজি মাধ্যম বা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাব, প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক ও কোচিং সহায়তা পাচ্ছে; অন্যদিকে চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল কিংবা শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু শিক্ষকসংকট, দুর্বল অবকাঠামো ও সীমিত শেখার সহায়তা নিয়ে একই প্রতিযোগিতায় নামছে।
এই বৈষম্য এখন শুধু বিদ্যালয়ে প্রবেশেই নয়, রয়েছে শেখার সুযোগ ও শিখনফলেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ’র পরিসংখ্যান আমাদের অস্বস্তিকর একটি আয়না দেখিয়েছে। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পঠনদক্ষতা এবং মাত্র ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের পঠনদক্ষতা সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের মাত্র অর্ধেক। সংখ্যাজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুপাত আরও কম, প্রায় ৪৬ শতাংশ।
মাধ্যমিকের দিকে যেতে যেতে ব্যবধান আরও বড় হয়। উচ্চমাধ্যমিক বয়সী শিশু-কিশোরদের ৩৩.৯ শতাংশ শিক্ষার বাইরে এবং এই স্তর সম্পন্ন করতে পারে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ। ধনী পরিবারের উচ্চমাধ্যমিক বয়সীদের উপস্থিতির হার যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ, দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলেছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা, টিকে থাকা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ এখনো সমান হয়নি।
স্বাধীনতার সংগ্রামে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আকাঙ্ক্ষা ছিল মূল বিষয়। একইভাবে ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে; পরে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই ঘটনাপ্রবাহও তরুণদের কাছে ন্যায্য সুযোগ, মর্যাদা ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাই ২০২৬ সালের শিক্ষা দিবসে আমাদের জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের এত অধ্যায় পেরিয়েও শিক্ষার ভেতরের কাঠামোগত বৈষম্য কেন থেকে গেল?
সমস্যা কেবল অর্থের নয়; এটি দর্শন, নীতি, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার সংকট। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ রয়েছে, কিন্তু এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি। সময়ের সঙ্গে এটিকে সামগ্রিকভাবে হালনাগাদও করা হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা আইন হয়নি। শিক্ষাক্রম নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা একের পর এক পরিবর্তন দেখেছি। নতুন শিক্ষাক্রম চালু, মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক, আবার পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং নতুন করে সংশোধনের উদ্যোগ—অনেক পরিবর্তন হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু শিশুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বদলে শিক্ষা যেন হয়ে উঠেছে অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র।
শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের সম্পর্কও দুর্বল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, সবুজ অর্থনীতি ও দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজার যখন নতুন ধরনের দক্ষতা চাইছে, তখন আমাদের অনেক শিক্ষার্থী এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে। ফলে সনদ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, ডিজিটাল দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তবজীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা একই গতিতে বাড়ছে না। বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই বিচ্ছিন্নতাকে বিশেষজ্ঞরাও বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো, শিক্ষক। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া ভালো কারিকুলামও কাগজে থেকে যায় শুধু। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বহু প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। ২০২৬ সালে ৩৬ হাজারের বেশি শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন, মেন্টরিং এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তারও বড় ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অনুপস্থিতি, কোচিংবাণিজ্য কিংবা পেশাগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নও রয়েছে। আবার শিক্ষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মর্যাদা, কর্মপরিবেশ ও সহায়তা না দিয়ে শুধু তাদের ওপর দায় চাপিয়েও মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। পিটিএ ও স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের শিক্ষা উন্নয়নের কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। দলীয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী রাজনীতির অসুস্থ প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরির ক্ষেত্র নয়, বরং জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্ত চিন্তার নিরাপদ পরিসর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তবে আশার জায়গাও আছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জন্য বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৩.০৬ শতাংশ এবং জিডিপির ১.৭৯ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষা বিনিয়োগের নিম্নসীমা, সেই জিডিপির ৬ শতাংশ থেকে বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। তাই অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি, তবে আরও জরুরি হলো সেই অর্থকে শ্রেণিকক্ষের শিখনফলে রূপান্তর করা।
এখন তাই বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন একটি জাতীয় শিক্ষা রূপান্তরের রোডম্যাপ। প্রথমে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এমন একটি যুগোপযোগী শিক্ষা দর্শন নির্ধারণ করতে হবে, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, সাম্য এবং বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে ধারণ করবে। সেই আলোকে হালনাগাদ শিক্ষানীতি এবং সেটির বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি হিসেবে শিক্ষা আইন করতে হবে।
এরপর স্থিতিশীল কারিকুলাম, যোগ্য ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, মানসম্মত প্রাক-চাকরি ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানাগার ও ডিজিটাল অবকাঠামো, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, চর-হাওর-পাহাড় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুর জন্য ‘একই ব্যবস্থা’ নয়, প্রয়োজনে অতিরিক্ত সহায়তা দিতে হবে। কারণ সমতা মানে সবাইকে একই জিনিস দেওয়া নয়; সমতা মানে প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া।
১৯৬২ সালের শহীদেরা আমাদের একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন। সেটি হলো—শিক্ষা কার জন্য? ২০২৬ সালের শিক্ষা দিবসে এসে উত্তরটি স্পষ্ট হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা সবার জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু সেটি শুধু বিদ্যালয়ে প্রবেশের অধিকার হিসেবে নয়; বরং সমান মর্যাদায় মানসম্মত শিক্ষার পাওয়ার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
লেখক: শিক্ষা গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক

ছাগল নিয়ে শঠতা
কাঁঠালগাছে দেশটা ভরে গেলে এই দেশ ভরে যাবে ছাগলে—এ রকম একটা ভাবনা কি আমাদের মনে সঙ্গোপনে ছিল? হতেও পারে। তা না হলে দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পর ছাগল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কেন?

দ্বিজাতিতত্ত্বের দেশে জিন্নাহই তো জাতীয় বীর!
দেশের গরিষ্ঠসংখ্যক রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলের মনোজগতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভূত চেপে বসেছে, সেখানে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবিই যে প্রাধান্য পাবে, তাতে হতবাক হওয়ার কিছু নেই।

মক্কা চুক্তি উন্মুক্ত করে দিল হুতিরা
সম্ভবত সবাই মক্কা চুক্তির পাদটীকাগুলো পড়তে ভুলে গিয়েছিল। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যখন মক্কায় তাদের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্মোচন করে, তখন এর ভাষা ছিল অত্যন্ত মহৎ-ভ্রাতৃত্ব, প্রতিরোধ, সংহতি ও সাধারণ নিরাপত্তা। বিশ্বকে বলা হয়েছিল যে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে

ডাকসু: গণতন্ত্রের অনুশীলন নাকি ক্ষমতার কৌশল?
বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়। মূলত অগণতান্ত্রিক অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলেই এই উদ্যোগগুলো আমরা লক্ষ্য করি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে