একটি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ভালো নাকি খারাপ হচ্ছে তার সঙ্গে সেই দেশের মানুষের সুখী হওয়ার সম্পর্ক নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। এই পরিস্থিতির বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে প্রতিবেশী ভারতে। দেশটিতে চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে সমালোচকেরা বলছেন, অর্থনীতির ভালো পরিসংখ্যান আর সাধারণ মানুষের ভালো থাকা এক বিষয় নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত কমবেশি সবারই জানা। যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। তেলের ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছিল। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসপ্তাহ কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ির পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও জুনের শেষ নাগাদ তিন মাসে ভারতের অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষক ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “যারা ভারতের অর্থনীতি নিয়ে হতাশ ছিলেন, তারা আবারও ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। ভারত আবারও এগিয়ে যাচ্ছে।”
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আসলে হতাশাবাদীদের সময় খুব খারাপ যাচ্ছে–এমনটা বলা যায় না। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অবসরপ্রাপ্ত আমলা সুভাষ চন্দ্র গর্গ। তিনি টেলিভিশনে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, গত বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব পরে কমিয়ে সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির হার কৃত্রিমভাবে বেশি দেখাচ্ছে।
সুভাষ চন্দ্র বলেন, এসব সংশোধনের প্রভাব বাদ দিলে মূল্যস্ফীতি হিসাব করার আগে ভারতের অর্থনীতি মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর মূল্যস্ফীতির প্রভাব হিসাব করলে অর্থনীতি হয়তো মোটেও বাড়েনি।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারতীর এই আমলার যুক্তি সহজেই বোঝা যায়। তবে এটি সঠিক নয়। চলতি বছরের শুরুতে ভারত তার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির হিসাব করার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। সুভাষ যে পরিসংখ্যানের তুলনা করছেন, সেগুলো ভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়েছিল। তাই এগুলো সরাসরি তুলনা করা যায় না। এ ছাড়া গাড়ি বিক্রি বৃদ্ধি, ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়া এবং বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো আরও কিছু সূচকও ভারতের অর্থনীতিতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তারপরও এখন সরকারের ওপরই চাপ বাড়ছে। সুভাষ চন্দ্রের বক্তব্য ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশেষজ্ঞরা ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যান কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। বিষয়টি নিয়ে দৃশ্যত বিরক্ত ৭৫ বছর বয়সী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যেই ‘রাগী চাচাদের’ সমালোচনা করছেন। তার অভিযোগ, এসব ব্যক্তি সবসময় নেতিবাচক কথা ছড়ান।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মূলত দুটি কারণে মোদি এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। প্রথম কারণ হলো, গত ১২ বছরে তার সরকার ভারতের বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশে দেরি করেছে, কিছু তথ্য আটকে রেখেছে এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ভারতের নির্ধারিত সময়ের পাঁচ বছর পরও জনশুমারি হয়নি। যেসব তথ্য সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, সেগুলোও প্রকাশ করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে আরও কাজ করা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কিছু জরিপেও হঠাৎ প্রশ্নের কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সরকার সরকারি পরিসংখ্যানের মান উন্নত করার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মানুষের আস্থা ফিরতে আরও সময় লাগবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ভারতের খুব কম মানুষই এই ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাব টের পাচ্ছেন। সাধারণত অর্থনীতি এত দ্রুত বাড়লে দেশকে কি আরও ধনী, আরও ভালোভাবে পরিচালিত এবং কম বিশৃঙ্খল মনে হওয়ার কথা। তবে ভারতের মানুষ চারপাশে ঠিক এর উল্টো চিত্রই দেখছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্যমতে, শুধু এই মাসেই দিল্লিতে একটি ভবন ধসে সাতজন মারা যান। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন শিক্ষার্থী। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের আগেই সেখানে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে যায়। জুন মাসে দিল্লির আরেকটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি ভবনে আগুন লেগে ২১ জন মারা যান।
গত মাসে দিল্লির কাছের শহর গুরুগ্রামেও কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ভারতের সবচেয়ে দামি কিছু আবাসিক ভবন এই শহরেই রয়েছে। অথচ বৃষ্টির পানিতে শহরের রাস্তাগুলো ডুবে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন থমকে যায়। কয়েক মাস পর আবারও দিল্লি ও আশপাশের এলাকার বাতাস মানুষের শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রায় অনুপযোগী হয়ে উঠবে। আর এসব ঘটনা শুধু ভারতের রাজধানী অঞ্চলেই ঘটছে।
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য বলছে, দেশজুড়ে সামাজিক অবক্ষয়ের অনুভূতিও মানুষের মধ্যে বাড়ছে। চলতি মাসে দিল্লিতে এক সংগীতশিল্পীকে তার বাড়িতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাইরে কয়েকজন ব্যক্তি মদ্যপান করছিলেন। তাদের একটু শান্ত থাকতে বলার পরই ওই শিল্পীর ওপর হামলা হয়।
এর কয়েক দিন আগে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক হিন্দু ‘অধিকারকর্মী’ কাউকে মারধর করার কথা প্রকাশ্যে গর্ব করে বলছিলেন এবং দাবি করছিলেন, এ জন্য তার কোনো শাস্তি হবে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভালো জীবন পাওয়ার সুযোগও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্ন বারবার ফাঁস হচ্ছে। বেসরকারি খাতে চাকরির বাজারও ধীর হয়ে গেছে। এর সঙ্গে সফটওয়্যার শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবও পড়ছে। সব মিলিয়ে ভারতের কর্মজীবী মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নরেন্দ্র মোদি ও তার ঘনিষ্ঠরা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গর্ব করছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এই পরিস্তিতিতে ২০০৪ সালের নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী প্রচারের কথাও মনে পড়ে। তখন দলটির নেতৃত্বে ছিলেন অটল বিহারি বাজপেয়ি। সেবার বিজেপি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিল। কারণ তাদের সরকারের সময় ভারতের অর্থনীতি বছরে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছিল। দলের নেতারা মনে করেছিলেন, দেশের মানুষও সরকারের কাজ নিয়ে খুশি। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
দেশজুড়ে প্রচারের জন্য নানা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এসব বিজ্ঞাপনে হাসিখুশি মা, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থী এবং এমনকি মুসলিম পুরুষদেরও দেখানো হয়েছিল। তারা সবাই ভারতের উন্নতির সুফল ভোগ করছে–এমন চিত্র তুলে ধরা হয়।
কিন্তু এসব বিজ্ঞাপন লাখ লাখ ভোটারকে উল্টো মনে করিয়ে দেয় যে, তারা ভারতের উন্নতির সুফল থেকে পিছিয়ে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত বিজেপি বড় ধরনের নির্বাচনী পরাজয়ের মুখে পড়ে। এরপর এক দশক দলটি ক্ষমতার বাইরে ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মনে হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি সেই শিক্ষা ভুলে যেতে চাইছেন। এটা সত্য যে, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ভালো করছে। বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার জন্য এখন পর্যন্ত যতটা প্রশংসা পাওয়া উচিত ছিল, তার চেয়ে কমই পেয়েছে–এ কথাও সত্য। কিন্তু জিডিপির হিসাব প্রকাশের পর মোদি বলেছিলেন, “দেশ আনন্দে ভরে গেছে।”
আসলেই কি তা সত্য? অর্থনীতির ভালো পরিসংখ্যান সরকারের ভাবমূর্তি ভালো করতে পারে। কিন্তু এর মানেই এই নয় যে দেশের মানুষও নিজেদের ভালো অবস্থায় বা সুখী মনে করছেন।