দুই বছর আগে ভারতের সাধারণ নির্বাচন নরেন্দ্র মোদির জন্য ছিল বড় এক ধাক্কা। নির্বাচনের আগে তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশা করলেও ভোটাররা সেই সুযোগ দেয়নি।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করতে হয় বিজেপিকে।
তখন অনেক বিশ্লেষকই বলেছিলেন, মোদির ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তি ভেঙে গেছে।
কিন্তু এরপর অনুষ্ঠিত অধিকাংশ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জিতে বিজেপি সেই ধাক্কা অনেকটাই সামলে নেয়। ফলে সেই আলোচনা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু এখন আবার একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে মোদি সরকারকে নতুন করে চাপে ফেলেছে।
তাহলে কি আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মোদির সেই ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তি?
এই বিতর্কের শুরু প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে ঘিরে। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
চলতি বছরের মে মাসে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষাও প্রশ্নফাঁসের কারণে বিতর্কে পড়ে। গত তিন বছরের মধ্যে এই পরীক্ষায় এমন ঘটনা ঘটল দ্বিতীয়বার। এর প্রতিবাদে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামেন। সেই আন্দোলনের চাপের মধ্যেই ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশে অদক্ষতার কারণে কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ বিব্রতকর হলেও তা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু মোদি সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই সরকার বরাবরই চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদল না করার অবস্থান নিয়েছে।
তাই সমালোচকেরা আবারও বলতে শুরু করেছেন, নরেন্দ্র মোদির ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তি আগের মতো নেই। তবে এবারও কি সেই ধারণা সত্যি প্রমাণ হবে?
২০২৪ সালের নির্বাচনের ধাক্কা থেকে বিজেপি যে শিক্ষা নিয়েছিল, তা ছিল নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো আরও মজবুত করা।
দলটি তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন আরও শক্তিশালী করে, কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়ায় এবং বিরোধীদের চাপে রাখতে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করে।
ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান দ্রুতই শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সরকারের একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অস্বস্তিকর। নির্বাচনে জয় পাওয়ার চেয়ে এমন সংকটের পর জনআস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।
সরকার অবশ্য দ্রুত সক্রিয় হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি নিজেকে জনমতের প্রতি সাড়া দেওয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
তিনি উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ এক আমলাকে বদলি করেছেন এবং জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ৪৭ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন।
প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য আরও কঠোর শাস্তি এবং দ্রুত বিচার আদালতের ব্যবস্থা রেখে একটি বিলও আনা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি ‘উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ফেসবুক
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব পদক্ষেপ কি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ইঙ্গিত, নাকি কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা? কারণ, সরকারের কর্মকাণ্ডে নিজেদের ভুল নিয়ে গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করার তেমন কোনো ইঙ্গিত দেখা যায়নি।
বরং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস দিয়েও পরে সেই ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো দেখিয়ে সমালোচকেরা বলছেন, ক্ষমা না চাওয়া এবং ব্যাখ্যা না দেওয়ার পুরোনো অবস্থান থেকেই সরকার সরে আসেনি।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্রেও সেই অবস্থানের ছাপ দেখা যায়। সেখানে তিনি নিজেকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পদত্যাগপত্রে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পরীক্ষার পর কিছু অনিয়ম সামনে আসে। পাশাপাশি কিছু ‘দুষ্টচক্র’ বাধা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
এরপরও তিনি পদত্যাগ করেন, যা তার ভাষায় ‘দেশবিরোধী শক্তির’ মোকাবিলার জন্য।
পদত্যাগের দুই দিন পর পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন জোটের সদস্যরা তাকে বীরের মতো স্বাগত জানান। এ সময় বিরোধী দলের এক নেতা সহানুভূতির সুরে বলেন, “এমন তো হতেই পারে।”
জবাবে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, “কিছুই ঘটেনি।”
সরকারের সংস্কার পরিকল্পনাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। নরেন্দ্র মোদি যে ‘উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি ২০২৪ সালে একই পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর গঠিত ‘উচ্চপর্যায়ের কমিটি’রই ধারাবাহিকতা।
আর প্রশ্নফাঁসকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির যে বিল আনা হয়েছে, সেটিও মূলত ২০২৪ সালের আইনেরই পুনরাবৃত্তি।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন একজন মন্ত্রীকে, যিনি আগে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য এবং গণবিতরণ—এই চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
সমালোচকদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও একই ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
সরকারের আরেকটি বড় সমালোচনা উঠেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে।
মে মাসে সরকার প্রথমে আন্দোলনকারীদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ব্লক করে। পরে দিল্লির বিক্ষোভস্থল ঘিরে কয়েক দিন মোবাইল ইন্টারনেট এবং একটি পিয়ার-টু-পিয়ার মেসেজিং অ্যাপও বন্ধ রাখা হয়।
নরেন্দ্র মোদি ও ধর্মেন্দ্র প্রধান। ফাইল ছবি।
পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে মোদিবিরোধী পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া একটি পার্লামেন্টারি কমিটি প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছে।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো, কীভাবে ‘সরকারের জনশৃঙ্খলা’ বজায় রাখা নিশ্চিত করা যায়।
তবে এই সংকটে সরকারের কৌশলে নতুন একটি দিকও দেখা গেছে। আন্দোলনটি যে ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে গতি পেয়েছে, তা সরকার বুঝতে পেরেছে।
তাই ২৩ জুলাই নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো ইনস্টাগ্রামে একটি রিল বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ব্যঙ্গাত্মক মিম বানালেও সরকারপন্থী গণমাধ্যম দাবি করে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি ইনস্টাগ্রাম রিলে সর্বাধিক দেখা ভিডিওর নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে।
এরপর মোদি তার মন্ত্রীদেরও ইনস্টাগ্রামে আরও সক্রিয় হতে নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে ৪২ বছর বয়সী এক বিজেপি এমপিকে পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে সামনে আনা হয়। তিনি তরুণদের ভাষা ব্যবহার করে বলেন, মোদি সমস্যাটি ‘ধরে ফেলেছেন’।
তরুণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে আকর্ষণীয় বা ‘কুল’ দেখানোর জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করাকে ‘অরা ফার্মিং’ বলা হয়।
সমালোচকদের মতে, মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপেও সেই প্রবণতার ছাপ রয়েছে। আর এমন চেষ্টা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ভাবমূর্তি তৈরি করার বদলে উল্টো ফলই বয়ে আনে।
(লেখাটি দ্য ইকোনোমিস্টের নিবন্ধ থেকে অনূদিত)