ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতির নেতা আব্দুল-মালিক আল-হুতি তার বক্তব্যের ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক রাখেন না। গত ১৬ জুলাই, উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণকারী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী 'হুতি'-র নেতা তার দীর্ঘদিনের শত্রু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এক অভিযানের প্রতিশ্রুতি দেন।
একটি ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘সমীকরণটি হবে বিমানবন্দরের বদলে বিমানবন্দর, বন্দরের বদলে বন্দর এবং অবরোধের বদলে অবরোধ।’’ হুতিরা দ্রুতই তাদের এই হুমকির প্রতিফলন দেখায়।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক সপ্তাহে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট ট্যাংকার এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলের জিজান ও ইয়ানবুতে অবস্থিত তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। সাগরের মুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে হুতিরা যখন জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তখন বাব আল-মান্দেব দিয়ে জলযান চলাচল প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন তাদের এই কৌশল আরও বেশি প্রভাবশালী হবে। ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে লোহিত সাগর সৌদি তেল রপ্তানির জন্য মূল পথে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলো থেকে দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল পাঠানো হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল মাত্র এক লাখ ২০ হাজার ব্যারেল।
বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ খালের মাধ্যমে এসব বিপুল পরিমাণ তেল বের করে নিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন এবং সম্ভবত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে মুখিয়ে আছে। লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের ফারেয়া আল-মুসলিমি মনে করেন, তাদের এই অভিযানটি হলো এক ঢিলে দুই পাখি মারা।
সৌদি তেল রপ্তানি ব্যাহত করা (এবং বৈশ্বিক বাজারে চাপ সৃষ্টি করা) আমেরিকার সাথে যুদ্ধে হুতিদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানকে শক্তি জোগায়। অন্যদিকে, ২০২২ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং তার সৌদি সমর্থকদের সাথে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা নিয়েও হুতিরা হতাশে ভুগছে। তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে এবং ইয়েমেনে তাদের ক্ষমতা প্রসারিত করতে চায়।
হুতিদের প্রধান দাবি হলো ইয়েমেনে নৌ ও বিমান চলাচলের ওপর সৌদি-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা, বিশেষ করে ইরানি ফ্লাইটের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। ১৩ জুলাই তারা তেহরান থেকে একটি বিমানকে হুতি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় অবতরণের আমন্ত্রণ জানায়। এই ফ্লাইটটি ছিল সৌদি এবং ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের জন্য একটি উসকানি, যারা উড়োজাহাজটি অবতরণ করার আগেই এর রানওয়েতে বোমা হামলা চালায়।
হুতি বিদ্রোহীদের অর্থের সংস্থানও প্রয়োজন। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার প্রায় ৬০% ইয়েমেনি পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে না। গোষ্ঠীটি ভিক্ষা করার অপরাধে দরিদ্রদের জরিমানা করা শুরু করেছে। তারা চায় সৌদি আরব যেন সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করে, যা ২০১৮ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালে উভয় পক্ষ এতে সম্মত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিল, কিন্তু সে বছর লোহিত সাগরে হুতিদের অভিযানের কারণে তা বানচাল হয়ে যায়। এখন তারা মনে করে যে ব্ল্যাকমেল বা ভয় দেখিয়ে এই অর্থ আদায় করা সম্ভব।
কঠোর অবস্থান নিয়ে হুতিরা মূলত ইরানের উদাহরণ অনুসরণ করছে। ইরান সম্প্রতি আমেরিকার কাছ থেকে বড় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় হুতিরাও সৌদি আরবের কাছ থেকে তেমন সুবিধা আশা করছে। তবে সৌদির শক্ত অবস্থানে থাকার মতো যথেষ্ট কারণ আছে।
সৌদি কর্মকর্তাদের দাবি, সানা অভিমুখী বিমানটিতে ইরান থেকে অস্ত্র এবং সামরিক উপদেষ্টা বহন করা হচ্ছিল। হুতিদের তেহরানের সাথে একটি সরাসরি আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিলে তা ইরানের অন্যতম শক্তিশালী এবং সুসজ্জিত মিত্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব তাদের জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য মিত্রদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।
কেউ কেউ মনে করেন হুতিরা আরও বড় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেনেভাভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেন্টার অন আর্মড গ্রুপসের নাদওয়া আল-দাওসারির মতে, আবারও বড় আকারের সংঘাত তৈরি হওয়া অনিবার্য।
হুতি বিদ্রোহীরা বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে মহড়া দিচ্ছে। জুলাইয়ের শুরুতে হুতি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরের দক্ষিণে হাইস-এ সরকারি ঘাঁটিতে হামলা চালায় তারা। হুতিদের রুখতে ইয়েমেন সরকার সানার পূর্বে তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল মারিব এবং দক্ষিণের শহর তাইজ-এর চারপাশে সেনা মোতায়েন করেছে। ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা গত ২৭ জুলাই বলেন, ‘‘আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।’’
ইয়েমেনের হুতিবিরোধী বাহিনীগুলো বছরের শুরুর তুলনায় এখন অনেকটাই বেশি ঐক্যবদ্ধ, আগে তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলে বিভক্ত ছিল। তবুও তারা কতটা শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ পর্যন্ত সৌদি আরব ২৪ জুলাই হোদেইদাসহ বেশ কয়েকটি হুতি ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে গত দশকে সৌদি আরব যে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছিল, সৌদি হয়তো তা পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে না। কারণ হুতিদের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র এখন তাদের পাল্টা আঘাত করার নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এছাড়া যেকোনো অভিযান চালাতে হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ছাড়া, কারণ সৌদির অনুরোধে গত জানুয়ারিতে তাদের বাহিনী ইয়েমেন ত্যাগ করেছে।
গত দশকে সৌদি এবং আমেরিকার অভিযান থেকে হুতিরা এই শিক্ষা পেয়েছে যে, পার্বত্য উচ্চভূমির কারণে যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র ধ্বংস করা কঠিন।
কনসালটেন্সি ফার্ম ‘হরাইজন এনগেজ’-এর মাইকেল নাইটসের মতে, ‘‘আপনি তাদের (হুতিদের) জাহাজবিরোধী সক্ষমতা এতটা কমাতে পারবেন না। আর শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে এইটুকু সতর্কবার্তাই যথেষ্ট।’’ আর এই বিষয়টি হুতিরা খুব ভালো করেই জানে।