গত ছয় মাসে দ্বিতীয়বারের মতো বড় জ্বালানি সংকট এড়াতে হিমশিম খাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবরোধ শুরু হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন তেল পরিবহনের জন্য পুরোপুরি খোলা রয়েছে কেবল সুয়েজ খাল।
জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ তাদের আমদানি করা তেলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনে। তাই ইয়েমেনের হুতিরা বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার পর এসব দেশ বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা শুরু করেছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালিই লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। তখন এশিয়ার অনেক দেশ বড় ধাক্কা খেয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশগুলোকে তেলের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয়েছিল।
এশিয়া গ্রুপ থিংকট্যাংকের আহমেদ হেলাল বলেন, বিশ্বে অতিরিক্ত তেলের মজুত এখন প্রায় শেষের দিকে। হাতে খুবই কম তেলের মজুত রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, জাপানসহ কয়েকটি দেশ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতোমধ্যে ভর্তুকিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। হুতিদের অবরোধের ঘোষণার পর দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশ জ্বালানির ওপর কর ছাড়ের মেয়াদও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সরকারের ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখন লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ায় সেই চাপ আরও বাড়তে পারে। মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল পাঠানোর পথ বদলে দেয়। দেশটি পূর্ব উপকূলের বদলে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি শুরু করে। বর্তমানে সৌদি আরবের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি এই বন্দর দিয়েই যায়।
এটি চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অনেক এশীয় দেশের জন্য বড় স্বস্তি ছিল। কারণ চীন সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা, আর তার পরেই রয়েছে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল পাঠানোর পথ বদলে দেয়। ছবি: রয়টার্স
হুতিদের হামলার ঝুঁকি এড়াতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু তেল কোম্পানি বিকল্প পথ ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তারা তেলের জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পাঠিয়ে সেখান থেকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরিয়ে এশিয়ায় আনতে চাইছে। তবে এই পথে পরিবহন করতে অনেক বেশি খরচ হয়।
সাধারণত সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) পুরো তেলভর্তি অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। তাই এসব জাহাজকে লোহিত সাগরে তেলের প্রায় অর্ধেক নামিয়ে রাখতে হবে। পরে সেই তেল মিসরের সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে নেওয়া হবে। জাহাজ সুয়েজ খাল পার হওয়ার পর আবার সেই তেল তুলতে হবে। এতে খরচ ও জটিলতা দুটোই বেড়ে যায়।
আর যদি তেল ভূমধ্যসাগর হয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আনা হয়, তাহলে এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের জন্য যাত্রার সময় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। এতে ভাড়া ও জ্বালানি খরচ আরও বাড়বে।
তবে আপাতত অনেক দেশ এই অতিরিক্ত খরচ মেনে নিতে রাজি। কারণ গত সপ্তাহে হুতিরা লোহিত সাগর ছেড়ে যাওয়া অন্তত দুটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এ সপ্তাহে তারা সৌদি আরবের তেল স্থাপনাতেও হামলা করেছে। ফলে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। হুতিদের হুমকিতে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেন, তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচলের ধরনই প্রমাণ করছে, তারা এই হুমকিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে।
এদিকে বীমা কোম্পানিগুলোও যুদ্ধঝুঁকির কারণে প্রিমিয়াম বাড়িয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে এই বীমা খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে একটি জাহাজের একবার যাতায়াতেই অতিরিক্ত কয়েক লাখ ডলার খরচ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচের বোঝা এশিয়ার সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে তারা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাচ্ছেন।
আহমেদ হেলাল বলেন, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের সর্বোচ্চ সময়ে ব্যবহার কমানোর চেষ্টা হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সংকটে ধরা পড়ল দুর্বলতা
মার্চে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এশিয়ার অনেক দেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা ব্যবস্থা নিয়েছিল। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার চালু করা হয়। শ্রীলঙ্কায় চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়। ভিয়েতনামে অনেক কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন এসব দেশের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা ও ধৈর্য–দুটোই কমে আসছে।
হুতিদের হুমকির কারণে ফিলিপাইন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া তেল ও গ্যাসের কৌশলগত মজুত বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে স্বল্পমেয়াদে সহজ কোনো সমাধান না থাকায় এশিয়ার দেশগুলো এখন অন্য অঞ্চল থেকে তেল কেনার চেষ্টা করছে। এতে আবারও লাভবান হতে পারে রাশিয়া।
চলতি বছরের শুরুতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়ার তেল কিনেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। গত সপ্তাহে রয়টার্স জানায়, সর্বশেষ সংকট মোকাবিলায় চীনের তেল শোধনাগারগুলোও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল কেনা বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট আবারও দেখিয়ে দিল যে এশিয়ার অনেক দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
আহমেদ হেলালের মতে, এই সংকটের কারণে সরকারগুলোকে তাদের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা এবং জরুরি তেলের মজুত রাখার সক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
তবে আপাতত তাদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো যেভাবেই হোক তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। কারণ, হেলালের ভাষায়, তাদের হাতে ব্যবহার করার মতো অতিরিক্ত মজুত এখন খুবই কম।