সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের শেষের দিকে প্রায় ১২টি ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। প্রতিবেশী ও বড় অর্থনীতির কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে শুরুতেই এত বেশি ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ঠিক কি না–এ নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে।
প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন বা ২০ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতির দেশ চীনে ‘ওয়েব্যাংক’ বা ‘মাইব্যাংকের’ মতো মাত্র ৫টি স্বাধীন ডিজিটাল ব্যাংক পুরো বাজার সামলাচ্ছে। প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশ ভারতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদা করে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স দেয়নি, প্রথাগত ব্যাংকগুলোর ওপর ভর করেই ফিনটেক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ওপর জোর দিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনীতির আকার এখন ৫০০ বিলিয়ন বা ৫০ হাজার কোটি ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। ইতিমধ্যেই দেশে প্রায় ৭০টির বেশি প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একাধিক সচল এমএফএস প্রতিষ্ঠান আছে–নিবন্ধিত ব্যাংক ৬২টি, এমএফএস অন্তত ১৩টি। অথচ আয়তন ও অর্থনীতির আকারে ছোট এই দেশে এতগুলো ব্যাংক ও এমএফএসের পরও শুরুতেই ১২ থেকে ১৩টি নতুন ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে আসা হচ্ছে! সিদ্ধান্তটা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আরও ব্যাংক বাড়লে মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুরুতে এত পরিমাণ ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন না দিয়ে, অল্প কয়েকটি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে, সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে পরে বাকিগুলো অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণকে আমলে নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ অনেক আগেই ডিজিটাল ব্যাংক চালু করেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চীনে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয় বেশ আগেই। ২০১৪ সালে দেশটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে ‘উইব্যাংক’ যাত্রা করে। এরপর ২০১৫ সালে চালু হয় ‘মাইব্যাংক’ নামের আরেকটি ব্যাংক। ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে প্রায় এক দশক আগে থেকেই যাত্রা করার কারণে চীন এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দেশে পরিণত হয়েছে।
ভারতে পুর্ণাঙ্গ বা স্বাধীন ডিজিটাল ব্যাংক নেই। তবে প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে ডিজিটাল সুবিধা চালু করে ব্যাংকগুলোকে আধুনিক করা হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘নিও সলিউশনস’ নামের একটি ফিনটেক কোম্পানি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালু করে। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ‘জুপিটার’ ও ‘ফাই মানি’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০২২ সালে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একযোগে সারাদেশে ৭৫টি ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করে এই খাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়।
পাকিস্তানে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক’ ঘোষণা করে। এই নীতিমালার আওতায় তারা দ্রুত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেয়।
থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সালের শুরুতেই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সিং ফ্রেমওয়ার্ক প্রকাশ করে। তাদের এই সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকেই বর্তমানে সে দেশে তিনটি ডিজিটাল ব্যাংক আছে এবং অনেক প্রচলিত বহুজাতিক ও আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা করছে।
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল ব্যাংকের আগমন মূলত দুভাবে হয়েছে–নতুন প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের মাধ্যমে, নয়তো পুরনো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে নতুন উইং তৈরি করে। ইউরোপ ও আমেরিকায় নতুন ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথাগত ব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই নিজস্ব প্রযুক্তি ও ডিজিটাল লাইসেন্স নিয়ে প্রথম যাত্রা করে। অন্যদিকে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পুরনো প্রথাগত ব্যাংকগুলোও নিজস্ব আলাদা ডিজিটাল উইং চালু করে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং জনপ্রিয় হওয়ার পর প্রথাগত ব্যাংকিংয়ে বড় পরিবর্তন আসে। ভৌত শাখার ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তাদের শাখার সংখ্যা কমিয়ে অ্যাপভিত্তিক সেবায় জোর দিয়েছে। এখন ইলেকট্রনিক উপায়ে চেহারা শনাক্ত করে কয়েক মিনিটেই অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। শাখা চালানোর খরচ না থাকায় ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কম ফিতে সেবা দেয়, যা দেখে পুরনো ব্যাংকগুলোও নিজেদের ফি ও চার্জ কমাতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে প্রথাগত ব্যাংকগুলো তাদের মোবাইল অ্যাপ ঢেলে সাজিয়েছে এবং বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়িয়ে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে।
ডিজিটাল ব্যাংকে ভৌত শাখা বা কর্মীদের পেছনে বড় খরচ করতে হয় না। তবে প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। তাই প্রচলিত ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে যে পরিমাণ সুদ দেয়, তার চেয়ে কিছুটা বেশি সুদ দিতে পারে ডিজিটাল ব্যাংক। তবে সেটা দেশভেদে, কোম্পানিভেদে একেক রকম হতে পারে। তবে এতে যে গ্রাহকের সামান্য হলেও সুবিধা হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়।
ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে দেশের পেমেন্ট গেটওয়ে কীভাবে কাজ করবে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থেকে জানা যায়, ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ’ (এনপিএসবি) এবং ‘বিনিময়’-এর মতো জাতীয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে গ্রাহকরা ডিজিটাল ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে অন্যান্য যেকোনো প্রচলিত ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকেই ক্যাশ টাকা তুলতে পারবেন।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো মূলত নগদ টাকা বা ক্যাশনির্ভর। এমনকি বিকাশ বা নগদের টাকাও মানুষ শেষ পর্যন্ত এজেন্টের কাছে থেকে ক্যাশ আউট করেই খরচ করতে অভ্যস্ত। এই বাস্তবতায় ক্যাশলেস অবকাঠামো, যেমন সর্বজনীন কিউআর কোড ব্যবস্থা বা সর্বস্তরে ডিজিটাল পেমেন্ট নেওয়ার সার্বিক রূপরেখা মজবুত না করে একঝাঁক ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে আসা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
পর্যাপ্ত ক্যাশলেস ইকোসিস্টেম না বানিয়ে ডিজিটাল ব্যাংক চালু করাটা অনেকটা পিচঢালা রাস্তা না বানিয়েই দ্রুতগতির গাড়ি নিয়ে নেমে যাওয়ার মতো। রূপরেখা স্পষ্ট না থাকলে এই ব্যাংকগুলো মূলত প্রচলিত ব্যাংকের এটিএম বুথ আর ক্যাশ আউটের ওপরই নির্ভর করে থাকবে, যা দেশের অর্থনীতিকে সত্যিকারের ক্যাশলেস করার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান চরচাকে বলেন, “যেকোনো উদ্যোগের ভালো ও খারাপ দুটি দিকই আছে। ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও তা-ই। এটা দেশের জন্য একটা মাইলফলক। তবে দেশের ইকোসিস্টেম না তৈরি করে যে উদ্যোগই নিই না কেন, সেটা কাজ করবে না। এমন ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে, যেটাতে সবকিছুই ক্যাশলেস, পেপারলেস হয়। শুধু ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট করার জন্য ডিজিটাল ব্যাংক করে লাভ নাই। সরকারের উচিত দেশের পুরো সিস্টেম যেন অনলাইনভিত্তিক করা হয়। তখন যে উদ্যোগই নেওয়া হবে, সেটিই কাজ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিষয়ে কাজ করা উচিত।”