বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো.সাহাবুদ্দিন ‘অসুস্থতাজনিত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধান ও বিদ্যমান আইনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া,সময়সীমা ও ধাপগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ীই ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন শুরু নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি এরই মধ্যে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট ভোট হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সংসদ সদস্যরা। ভোটগ্রহণ চলবে ওই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৩ আগস্ট, যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে পরামর্শ করতে গত ২৮ জুলাই জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসি। ওই দিন ইসিকে ভোটার তালিকা সরবরাহ করার অনুরোধ জানানো হয়। পরে ইসির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সচিবালয় এই তালিকা সরবরাহ করে।
সাংবিধানিক সময়সীমা ও প্রেক্ষাপট
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর এই সময়সীমা কার্যকর হয়েছে। এদিকে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর থেকেই সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ভারপ্রাপ্ত স্পিকার হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এই নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করে।
এই প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের দিন ও সময় নির্ধারণ করা হয়। সংসদ অধিবেশনে থাকলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে এবং অধিবেশন না থাকলে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হয়।
ভোটার ও ভোটগ্রহণ পদ্ধতি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হন সংসদ সদস্যরা। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভোটগ্রহণ করা হয়।
ব্যালট পেপারের ভোট হয়। ভোটগ্রহণ ও গণনা—দুটোই প্রকাশ্যে হয়। প্রয়োজন হলে সংসদ কক্ষে একাধিক ভোট কাউন্টার স্থাপন করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজন সংসদ সদস্যকে সমর্থক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। একই সঙ্গে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষরযুক্ত বিবৃতিও জমা দিতে হয়।
একজন সংসদ সদস্য একাধিক প্রার্থীর প্রস্তাবক বা সমর্থক হতে পারেন না। নির্ধারিত দিনে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করে।
যদি মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পর মাত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকে, তাহলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একইভাবে, একাধিক প্রার্থী থাকলেও প্রত্যাহারের শেষ দিনে অন্য সবাই সরে দাঁড়ালে অবশিষ্ট প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে ভোটের নিয়ম
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর যদি দুই বা ততোধিক প্রার্থী বহাল থাকেন, তাহলে নির্ধারিত দিনে সংসদ সদস্যদের বৈঠকে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুর ১২টার পর বৈঠকের শুরুতে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং এরপর ব্যালটের মাধ্যমে ভোট নেওয়া হয়। ভোট শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ্যে গণনা করা হয়।
দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ওই একবারই সংসদের কক্ষে ভোট হয়েছিল। এরপর প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন জন্য দলীয়প্রধান তারেক রহমানের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।
ফলাফল নির্ধারণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, যে প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পান, তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। যদি একাধিক প্রার্থী সমান সংখ্যক ভোট পান, তাহলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণাই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়।