ক্ষমতাসীন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠককে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল বাড়তি আগ্রহ। এর অন্যতম কারণ ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে দলীয় সূত্র বলছে, শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়; দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক–এসব বিষয়ও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: সিদ্ধান্তের ভার তারেক রহমানের ওপর?
বৈঠকের আগে থেকেই বিএনপির একাধিক নেতা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণই হবে বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এমনকি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় নাকি নির্দলীয় কাউকে সমর্থন দেওয়া হবে–সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থায়ী কমিটিতেই নেওয়া হবে।
তাই বৈঠক শেষে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন–বঙ্গভবনের নতুন অভিভাবক হিসেবে কাকে বেছে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল?
তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য নাম নিয়ে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ এখতিয়ার এবং দায়িত্ব তারা দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপর ন্যস্ত করেছেন নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
অতীতেও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে যেভাবে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর আস্থা রাখা হতো, এবারও সেই ধারাবাহিকতায় দলের স্থায়ী কমিটি প্রার্থী বাছাইয়ের পূর্ণ দায়িত্ব তারেক রহমানকে দিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্পূর্ণ এখতিয়ার দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেছে নীতিনির্ধারণী ফোরাম। ওনার একার কাছেই এ বিষয়ের পুরো এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান। ছবি: বাসস
দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বৈঠকে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, বিষয়টি এখনো চেয়ারম্যানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
বৈঠকে থাকা নেতারা জানান, রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে এমন একজনকেই মনোনয়ন দিতে চায় বিএনপি, যিনি দলের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন, পরীক্ষিত এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের প্রতীক।
যদিও দলীয় নেতাদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন ব্যক্তির নামও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এসেছে, তবু শেষ পর্যন্ত বিএনপির কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নামও আলোচনায় ছিল।
এদিকে বিএনপির ভেতরে আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টিও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার পদে একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে মনোনয়ন দেন তারেক রহমান। আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত বা তথ্য প্রকাশ না করে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সে কারণে এবারও দলটির শীর্ষ নেতারা এই প্রশ্ন সামনে আনছেন যে–রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও কি একই ধরনের চমক দেখাবেন তারেক রহমান?
এনসিপির সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনাও আলোচনায়
বৈঠক সূত্র বলছে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ, গণভোট, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দলের প্রকাশ্য বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য বিএনপির নীতিনির্ধারকদের নজরে এসেছে।
বৈঠকে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: চরচা
সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়ন
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়েও পর্যালোচনা হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনী ইশতেহারের অগ্রগতি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত কর্মসূচির বাস্তবায়ন কত দূর এগিয়েছে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ধীরগতির, সেগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সংগঠন সক্রিয় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সে কারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সদস্যরা সার্বিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মত দেন যে, আগামী বছরের জানুয়ারির আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন বাস্তবসম্মত হবে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশ্বাস দেন।
এ ছাড়া চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র নিশ্চিত করেছে।