বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা বিএনপিই পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান মনোনয়ন দেবে—এটি নিশ্চিত। প্রশ্ন হলো, দলটির পছন্দ কে?
দলটির শীর্ষ পর্যায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করেনি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন এবং কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। আলোচনায় রয়েছে বিএনপির কয়েকজন প্রবীণ নেতা। একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে কিছু ‘চমকপ্রদ’ নামও।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় কারা?
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক নাম নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। নির্বাচনের পরে আলোচনায় থাকা কয়েকটি নামের সঙ্গে নতুন করে আরও কয়েকজনের নাম যুক্ত হয়েছে। যদিও এ পর্যন্ত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।
দলীয় একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নেতা-কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দলের দুঃসময়ে দীর্ঘ ১৭ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় আছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও। প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত নেতা হিসেবে শুরু থেকেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের তালিকায় তার নাম রয়েছে।
ড. আবদুল মঈন খান—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার পরিচিতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তৃণমূলের পছন্দ ফখরুল, তবে শীর্ষ নেতৃত্বের ভিন্ন হিসাব
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ভেতরে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ করে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখার আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মির্জা ফখরুলকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করে পোস্ট, পোস্টার ও শুভেচ্ছাবার্তা প্রকাশ করছেন। অনেকেই লিখছেন, দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে দীর্ঘ ১৭ বছর মহাসচিব হিসেবে তিনি সংগঠনকে ধরে রেখেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চান তারা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি
তবে দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তাদের মতে, মির্জা ফখরুল শুধু একজন প্রবীণ নেতা নন; বরং বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু। সরকার, জোট, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় তার ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে মহাসচিব পদে কে আসবেন, নতুন নেতৃত্ব একই মাত্রার গ্রহণযোগ্যতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নও বিবেচনায় রয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এবং সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের যোগ্যতা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে খুব একটা দ্বিমত নেই। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে মহাসচিব হিসেবে রাখাই দলের জন্য বেশি কার্যকর হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।”
এছাড়াও দলটির স্থায়ী কমিটির অন্য আরও চারজন সদস্য, একজন যুগ্ম মহাসচিব ও তিনজন ভাইস চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেও একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।
ফলে তাদের সবার মতে, তৃণমূলের আবেগ ও প্রত্যাশা একদিকে থাকলেও, হাইকমান্ডের হিসাব-নিকাশে সাংগঠনিক ভারসাম্য, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কেন খন্দকার মোশাররফ?
বিএনপির অভ্যন্তরে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখা হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কের বাইরে অবস্থান করেছেন। অতীতেও বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনা প্রকাশ্যে এসেছিল।
দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে কিছুটা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। কেউ কেউ এটিকে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদের জন্য ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবেও দেখছেন। সরকার-ঘনিষ্ঠ একটি বলয় থেকেও এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফাইল ছবি
সরকারের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “অতীত সিদ্ধান্তের ধরন দেখেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে মনোনয়নের বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত সাধারণত দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকেই আসে। ফলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আলোচনায় থাকা কোনো নামকেই নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা কেবল আমাদের মতামত এবং পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিতে পারি।”
মঈন খানের পক্ষে যেসব যুক্তি?
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে ড. আবদুল মঈন খানকে নিয়ে বিএনপির ভেতরে একটি আলাদা ধরনের আলোচনা রয়েছে। দল-সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি একটি তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি।
মঈন খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, সাবেক মন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কোনো বহুল আলোচিত মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার নজির নেই। এ কারণেই তাকে তুলনামূলকভাবে ‘লো-রিস্ক’ বা কম বিতর্কিত প্রার্থী হিসেবে দেখছেন দলের একটি অংশ।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্যের সাথে কথা বলে জানা যায়, এমন একটি সময়ে যখন দলটি সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার যুক্তিও দলের ভেতরে আলোচিত হচ্ছে।
আইরিন খানের নাম কেন আলোচনায়?
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের একটি অংশে মানবাধিকারকর্মী আইরিন জুবাইদা খানের নাম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
এ ছাড়া তিনি বিএনপি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের চাচাত বোন।
আইরিন জুবাইদা খান। ছবি: সংগৃহীত
তবে বিএনপির ভেতরে তার নাম নিয়ে খুব বেশি ইতিবাচক আলোচনা নেই বলে দল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাদের একটি অংশের মতে, আন্তর্জাতিক পরিসরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে তার বিভিন্ন অবস্থান অতীতে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বা অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও কেউ কেউ প্রকাশ করছেন।
বিএনপির সামনে কী ধরনের সমীকরণ?
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে বিচারপতি নিয়োগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, সংসদ ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জাতীয় সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে অতীতেও বিতর্ক হয়েছে।
এ কারণে বিএনপির সামনে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
- দলীয়ভাবে আস্থাভাজন নাকি সর্বজনগ্রহণযোগ্য মুখ?
- অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ নাকি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব?
- সক্রিয় রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করা হবে, নাকি অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির কাউকে?
দলীয় সূত্র বলছে, এসব বিষয় নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, সরকার-ঘনিষ্ঠ বলয়ের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা যুক্তি-তর্কের পর, দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় বিএনপির অভ্যন্তরে দুটি নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। নাম দুটি হলো- ড. আবদুল মঈন খান ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো না হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই দুই নেতাকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। একজনের পক্ষে রয়েছে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার যুক্তি, অন্যজনের পক্ষে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা এবং দলের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্যতা। শেষ পর্যন্ত কোন বিবেচনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।