নতুন বিনিয়োগ নয়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন অনেক উদ্যোক্তার প্রধান লড়াই। ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণের বদলে অনেকে সেই অর্থ খরচ করছেন বেতন, কাঁচামাল, পরিচালন ব্যয় ও পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে। এই চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, কমে যাওয়া অর্ডার এবং পণ্যের কম দামের কারণে। ফলে এক ঋণের টাকা দিয়ে আরেক ঋণের দায় মেটানোর কারণে নতুন বিনিয়োগ করতে পারছেন না অনেক ব্যবসায়ী।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অর্ডার কমে যাওয়া, পণ্যের দাম নিয়ে ক্রেতাদের চাপ এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তির বোঝা একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে তাদের। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের বেতনসহ নিয়মিত ব্যয় কমছে না। আবার উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে যাওয়ায় কিছু উদ্যোক্তা আর্থিক চাপে পড়ে খেলাপি হয়েছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, বিদ্যমান কারখানা সচল রাখা, শ্রমিকের বেতন দেওয়া এবং ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করাই অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
টিকে থাকাই মুশকিল
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন ও বিক্রি থেকে আয় না হওয়ায় তাদের অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসার দৈনন্দিন ব্যয় চালাচ্ছেন। এতে নতুন বিনিয়োগ শুরু বা পুরনো ব্যবসাকে বড় করার সুযোগ কমছে।
আনোয়ার স্পিনিংস মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চরচাকে বলেন, “এক ঋণ নিয়ে আরেক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছি। নতুন কারখানা খোলার কোনো সুযোগ নেই। যে ব্যবসাটা চলছে, সেটাই বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তাহলে নতুন ব্যবসা চালু করব কীভাবে?”
ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক হয়েছেন। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “জ্বালানি সংকট, অর্থায়নে সমস্যা ও ব্যবসায়ীক অনিশ্চয়তা উৎপাদন ও বিনিয়োগকে প্রভাবিত করছে। ব্যাংক ঋণ ও ট্রেড ফাইন্যান্সে সতর্কতা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগে দ্বিধায় রয়েছেন।”
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি চরচাকে বলেছেন, “গ্যাস সরবরাহের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কোনো কারখানা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় না। অর্ডার সম্পন্ন করা, শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংক-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করতে সময় লাগে। ফলে বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রকৃত ক্ষতি বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।”
উৎপাদনের আগেই শুরু ঋণের কিস্তি
ব্যবসার জন্য নতুন ঋণ নেওয়া ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, নতুন কারখানা স্থাপন বা মেশিনপত্র বসানোর পর উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। কিন্তু দেখা যায়, এর মধ্যেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় হয়ে যায়। তখন সেই ঋণ থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন তারা। আর যারা কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না, তারা খেলাপি হয়ে পড়ছেন।
এ এস গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সোবহান বলেন, “মেশিনপত্র স্থাপন ও প্রোডাকশনে যেতে আমাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু এরই মধ্যে ব্যাংকের কিস্তি (পরিশোধের সময়) চলে এসেছে। উৎপাদনে না গিয়ে কীভাবে কিস্তি শোধ করব? ফলে ব্যাংক ইতোমধ্যে আমাদের খেলাপি বানিয়ে ফেলেছে, এবং স্বাভাবিকভাবেই কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।”
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবসার আয় থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব না হলে উদ্যোক্তাকে অন্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করতে হয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করছেন। আবার কেউ কেউ ঋণ নিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন।
জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কম, বাড়ছে খরচ
জ্বালানি সংকট বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। বিশেষ করে স্পিনিং, ডাইং, নিটিং ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর কারখানায় এর প্রভাব বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) ১৩৪টি রপ্তানিমুখী কারখানার ওপর করা জরিপে প্রায় ৫৫ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের অর্ডার বাতিল বা কমেছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ ছিল, ৮৭ শতাংশ সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারেনি এবং ৬০ শতাংশকে বায়ারদের ডিসকাউন্ট দিতে হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি নেওয়ার কারণে বাড়তি খরচ বহন করতে হয়েছে। আর প্রায় ৫৯ শতাংশ কারখানা ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চরচাকে বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের আস্থায়ও প্রভাব পড়ছে। অনেক কারখানায় ক্রয়াদেশের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকায় ক্রেতারা বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের কাছে পুরো অর্ডার দিতে সতর্ক হচ্ছেন।”
সাবেদ আলি স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আব্দুল হক চরচাকে বলেন, “আমাদের ইন্ডাস্ট্রি প্রোডাকশন নির্ভর, কিন্তু আমরা ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। জেনারেটর থাকলেও তা গ্যাসের অভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পাওয়া যায়। গত কয়েকদিনে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে পুরোপুরি নয়।”
নতুন বিনিয়োগে তার প্রতিষ্ঠান যাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে কাজী আব্দুল হক বলেন, “গত তিন-চার বছরে কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তা থমকে গেছে। এই অবস্থায় নতুন কোনো বিনিয়োগ করলে সেই টাকা ফেরত পাওয়া কষ্টকর হবে। তাই আপতত নতুন বিনিয়োগ করব না।”
অর্ডার কমছে, উৎপাদন করেও বাড়ছে লোকসান
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানিকারকদের ক্রয়াদেশ এবং বায়ার ধরে রাখার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। বিকেএমইএ-র জরিপ অনুযায়ী, সংকটের সময়ে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করেছে এবং একই অনুপাতে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদন সময় নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।
জামান গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুজ্জামান চরচাকে বলেন, “শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ নয়, অর্ডার ও দাম কমে যাওয়ার কারণেও ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বায়াররা সময়মতো পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কায় অর্ডার দিতে চাচ্ছে না।”
হাসানুজ্জামান জানান, তাদের প্রায় ৩০ বছরের পুরনো একটি তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। কম পরিসরে পোশাক রপ্তানি করেন। বর্তমান বাজারে ব্যবসার অবস্থা খুব নাজুক। এই অবস্থায় ব্যবসা চালিয়ে যেতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করে, ব্যাংক ঋণ করে ব্যবসার খরচ চালাচ্ছেন।
লাভ না হলেও শ্রমিকের বেতন ও কিস্তি দিতে হচ্ছে
ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় চাপ হয়ে উঠেছে পরিচালন ব্যয়। উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংকের কিস্তিসহ নিয়মিত ব্যয় থেমে থাকে না। ফলে আয় কমে গেলেও ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
হাসানুজ্জামান বলেন, “ব্যবসা থেকে কোনো লাভ তো দূরের কথা, ব্রেক-ইভেনেও চলতে পারছি না। শ্রমিকদের রুটি-রুজির কথা চিন্তা করে এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে আমি নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে পর্যন্ত কারখানা চালিয়েছি ও বেতন পরিশোধ করেছি। শুধু আমি একাই নই, অনেক ভালো ভালো কারখানা কোটি কোটি টাকার ঋণ নিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।”
এ এস গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সোবহান চরচাকে বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। পর্যাপ্ত অর্ডার না থাকা এবং এলসি খুলতে না পারায় প্রায় দেড় বছর আগে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি। ব্যবসা করে এখন আর লাভের দেখা পাওয়া যায় না। ১০টি অর্ডারের মধ্যে হয়তো একটিতে কম-বেশি লাভ হয়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোনো প্রফিট থাকে না। অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস বাড়াতে হচ্ছে, কিন্তু বায়াররা পণ্যের সঠিক দাম দিচ্ছে না।”
বন্ধ কারখানা সচল করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ব্যবসার সংকটের প্রভাব শুধু নতুন বিনিয়োগে নয়, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার ক্ষেত্রেও পড়ছে। সম্প্রতি সংসদে দেওয়া পরিসংখ্যানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “গত তিন বছরে দেশে ৪০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।” বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি জ্বালানি, অর্থায়ন ও উৎপাদন ব্যয়সহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যাকেও এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ এস গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইলের আব্দুস সোবহান এখন বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “সরকার ঘোষিত সুযোগ অনুযায়ী ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেছেন।” এটি অনুমোদিত হলে আবার কারখানা চালুর লড়াই করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
চরচাকে আব্দুস সোবহান বলেন, “এখন আমার সব ব্যবসা বন্ধ। আমি খেলাপি হয়ে পড়েছি। সরকার ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। সেটা যদি হয়, তাহলে হয়তো আবার শুরু করতে পারব। আবার কিছু ঋণ নিব এবং ব্যবসার ধার-বাকি শোধ করে পুরনো ব্যবসাটা শুরু করব।”