দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতের কাঁচামাল আমদানির ওপরও চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৯৩৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই সময়ে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। সহজভাবে বললে, রপ্তানির আয় ২৫ টাকা বাড়লে এ সময়ে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে প্রায় ২৮ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানিমুখী এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৮৪৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৬৭৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬৬ কোটি ডলার।
এভাবে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই খাতের ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল চরচাকে বলেন, “যদি রপ্তানি বাড়ে এবং আমদানি ব্যয়ও বাড়ে, তাহলে সমস্যা নাই। আমরা যে কাঁচামাল আমদানি করি, সেটা দিয়ে পণ্য তৈরি করেই রপ্তানি করি। তাই রপ্তানি বাড়া মানে হলো আমদানি বেড়েছে। কিন্তু রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে যখন সামঞ্জস্য না থাকে, তখনই সমস্যা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেমনটা হয়েছে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেন এই ঘাটতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক আমদানির অর্থ পরিশোধের প্রতিবেদনেও এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, নিটেড ও ক্রোশেটেড কাপড়ে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ম্যান-মেইড স্ট্যাপল ফাইবারে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ম্যান-মেইড ফিলামেন্টে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশেষ ধরনের বোনা কাপড়, টাফটেড টেক্সটাইল, লেস, ট্যাপেস্ট্রি ও এমব্রয়ডারি জাতীয় পণ্যে ব্যয় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ইমপ্রেগনেটেড, কোটেড বা কাভার্ড টেক্সটাইল ফ্যাব্রিক আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
রপ্তানি বাড়ছে বলেই কাঁচামালের চাহিদাও বাড়তি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮২৮ কোটি ডলার, যার ৮১ দশমিক ৫ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে (৩৯৩৫ কোটি ডলার)। আগের অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৬১৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৩২০ কোটি ডলার।
পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এসেছে নিট ও উভেন দুই ধরনের পোশাক থেকেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২১১৬ কোটি ডলার, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১৯২৭ কোটি ডলার। একই সময়ে উভেন পোশাক রপ্তানি ১৬৮৬ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৮১৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে তুলা, সুতা, ফাইবার, কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামালের প্রয়োজনও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কাঁচামালের মধ্যে কাঁচা তুলা, সিনথেটিক ও ভিসকস ফাইবার, সিনথেটিক ও মিশ্র সুতা, কটন সুতা, টেক্সটাইল ফ্যাব্রিক ও পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্যের আমদানি বাড়ার অর্থ–একদিকে পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা ও চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্পটির একটি বড় অংশ এখনো বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।
আমদানির চিত্র: তুলা কমেছে, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টেক্সটাইল
কাঁচামাল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করলে আরও একটি বিষয় সামনে আসে। গত অর্থবছরে কাঁচা তুলা আমদানি বরং ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৩৪৬ কোটি ডলারে নেমেছে। বিপরীতে সুতা আমদানি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৬১ কোটি ডলারে উঠেছে। স্ট্যাপল ফাইবার আমদানি বেড়েছে ১০ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৩ কোটি ডলার।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় হয়েছে টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে। এই খাতে আমদানি ১৬ শতাংশ বেড়ে ৮৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭৭২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক হিসাবেও টেক্সটাইল কাঁচামালের কয়েকটি শ্রেণিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। নিটেড বা ক্রোশেটেড কাপড় আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৯২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ম্যান-মেইড স্ট্যাপল ফাইবারে ব্যয় হয়েছে ১৮৩ কোটি ডলার এবং ম্যান-মেইড ফিলামেন্টে ১৭৮ কোটি ডলার।
অন্যদিকে ইমপ্রেগনেটেড, কোটেড বা কাভার্ড টেক্সটাইল ফ্যাব্রিক আমদানিতে ব্যয় ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৫১ কোটি ৩৭ লাখ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে এই শ্রেণির পণ্য আমদানিতে প্রায় ১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
কাঁচামাল আসছে বেশি, মূলধনী যন্ত্রপাতি কম
পোশাক খাতের আমদানিতে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, কাঁচামালের পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি না বেড়ে বরং কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পোশাকশিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ১৯ দশমিক ১ শতাংশ কমে ২৮১ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্যান্য মূলধনী পণ্য আমদানিও কমেছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন রাখছেন। কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে এবং রপ্তানিও বাড়ছে; অর্থাৎ, বিদ্যমান কারখানাগুলো উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিন্তু নতুন যন্ত্রপাতি ও মূলধনী পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ বা উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অবশ্য কাঁচামাল আমদানি বেড়ে যাওয়া এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়াকেই সরাসরি বিনিয়োগ সংকটের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। পুরনো কারখানায় উৎপাদন ক্ষমতা আরও বেশি করে কাজে লাগানো, মেশিনের আয়ু বৃদ্ধি কিংবা বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে বেশি উৎপাদন করার কারণেও এমন চিত্র দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন বিনিয়োগ কতটা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে জানাচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিজিএমইএ সহসভাপতি ও সফটেক্স কটন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজওয়ান সেলিম চরচাকে বলেন, “মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া শিল্পের জন্য ভালো নয়। তবে দেশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কেমন হবে। অর্থাৎ, দেশের অবস্থা যদি ভালো হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ করবে, তখন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়বে। তা না হলে তখন কমবে।”
স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে চাহিদার কতটা মিটছে?
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা গত কয়েক দশকে বেড়েছে। তবে নিট ও উভেন পোশাকের ক্ষেত্রে স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহের সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ২০২৫ সালের বাংলাদেশভিত্তিক তথ্যে বলা হয়েছে, স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো দেশের নিট ফ্যাব্রিকের প্রায় ৮৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারে। কিন্তু উভেন ফ্যাব্রিকের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পূরণ করা হয় প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা। অর্থাৎ, উভেন পোশাক উৎপাদনে বিদেশি ফ্যাব্রিকের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি।
একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিটিএমএ-র (বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন) আওতাভুক্ত সুতা উৎপাদনকারী মিল ছিল ৫২৭টি, ফ্যাব্রিক উৎপাদনকারী মিল ৯৭৯টি এবং ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল ছিল ৩৪২টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ফ্যাব্রিক উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৯১৫ কোটি মিটার এবং প্রসেসিং সক্ষমতা প্রায় ৫০০ কোটি মিটার।
অর্থাৎ, দেশে বড় ধরনের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠলেও রপ্তানি বাজারের চাহিদা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং বিশেষায়িত কাপড়ের প্রয়োজন মেটাতে এখনো অনেক বেশি পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে।
মোট রপ্তানি বাড়ছে, নিট রপ্তানি কতটা বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতই রপ্তানি আয় থেকে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাদ দিয়ে নিট রপ্তানি হিসাব করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩৪৯ কোটি ডলার, যা ওই সময়ে পোশাক রপ্তানি আয়ের ৩৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কাঁচামাল আমদানি বাদ দেওয়ার পর ওই প্রান্তিকে পোশাক খাতের নিট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৬২৬ কোটি ডলার।
এতে বোঝা যায়, পোশাক রপ্তানির পুরো আয়ই দেশের নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় নয়। উৎপাদন চালিয়ে নিতে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে রপ্তানি যত বাড়ছে, একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
এই প্রসঙ্গে রেজওয়ান সেলিম বলেন, “এটা তো একটা সংকট আছেই। তবে এর চেয়েও বেশি সংকটে আছি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে। নতুন ব্যবসা বাড়লে তো নতুন করে রপ্তানি বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে আমরা চলমান রপ্তানি নিয়ে সংকটে আছি। জ্বালানি সংকট কবে সমাধান হবে, এটা সরকারও আমাদের বলতে পারছে না। এটা কবে যে ঠিক হবে আমরা বুঝতে পারছি না। এর জন্য বর্তমানে আমাদের ক্রয়াদেশও কমতে শুরু করেছে। ক্লায়েন্টরা আমাদের সংকট বিবেচনা করেই ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ২০ হাজার ক্রয়াদেশ দিত, এখন তারা ১০ হাজার ক্রয়াদেশ দিচ্ছে। তারা মনে করছে, আমরা হয়তো সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারব না। এটাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।”