“এখানে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) গেলে, যারা কারেন্ট দেয় হ্যাগো কি চাকরি থাকবে?” প্রশ্নটিই তো চমকে ওঠার মতো। পাল্টা প্রশ্ন হিসেবে নিশ্চয়ই মনে আসবে–বিদ্যুৎ সংকট এবং তার ফল হিসেবে লোডশেডিংয়ের এই সময়ে এমন স্বর্গ কোথায়? উত্তর–এই রাজধানীতেই। না, রাজধানীর পুরোটা নয়, একটি নির্দিষ্ট এলাকায়। এলাকাটা ঢাকার মন্ত্রীপাড়া বলে খ্যাত মিন্টু রোড। আর শুরুর ভাষ্যটি ওই এলাকারই এক বাসিন্দার।
গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে চলছে লোডশেডিং। রাজধানীও বাইরে নয়। বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ রাজধানীবাসীর। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও কি এমন ভুক্তভোগীর তালিকায় আছেন? এর মধ্যেও অনেকের প্রশ্ন মন্ত্রীপাড়া বলে পরিচিত রাজধানীর মিন্টো রোড ও আশপাশের এলাকায় কী বিদ্যুৎ যায়?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রাজধানীর মিন্টু রোড ও এর আশপাশের এলাকায় খোঁজ নেয় চরচা। সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এই এলাকায় থাকেন বলে সেটা মন্ত্রীপাড়া বলে পরিচিত। এই নামেই ডাকে সাধারণ মানুষও। সেখানেই রয়েছে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনও। এ ছাড়া রয়েছে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকের বাসভবনসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরকারি বাসভবন বা বাংলো। পাশেই আছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়।
সেখানকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির খোঁজ নিতে গত শুক্রবার মিন্টু রোড ও এর আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে চরচা। তারা জানালেন, সেখানেও বিদ্যুৎ যায়, তবে নামে মাত্র। অবশ্য ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা চরচাকে জানিয়েছেন, এবার লোডশেডিং করা হচ্ছে মন্ত্রী-সচিবদের বসবাসের এলাকাতেও। তবে সেখানে জেনারেটর আছে বলে রক্ষা।
মিন্টো রোডে এক সরকারি কোয়ার্টারে থাকেন গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মচারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, এখানে কারেন্ট যায় না। উল্টো প্রশ্ন করেন, “এখানে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) গেলে, যারা কারেন্ট দেয় হ্যাগো কি চাকরি থাকবে?”
কথা হয় মিন্টো রোডের বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের এক নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে। তিনি বলেন, “এখানে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) খুব একটা যায় না। দিনে মাঝে মাঝে এক দুইবার গেলেও ৫-১০ মিনিট পরই চলে আসে।”
যা বোঝা গেল, মিন্টু রোডে লোডশেডিং হলেও তার দৈর্ঘ্য খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু কতক্ষণ পরপর যায়? এর একটা ধারণা পাওয়া গেল শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ির এক কর্মচারীর কাছ থেকে। তিনি বলেন, “সাধারণত এখানে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) কম যায়। ৭-৮ দিন আগে কারেন্ট গেছিল।”
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনের, যেখানে একসময় অন্তবর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস থাকতেন, সেখানকার এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিনি কখনো সেখানে বিদ্যুৎ যেতে দেখেননি। তার মতে, “গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হয়তো এখনে কম কারেন্ট (বিদ্যুৎ) যায়।”
মিন্টো রোডের পাশের সড়ক বেইলি রোডে রাজধানীর অফিসার্স ক্লাব। সেই ক্লাবের লিফট অপারেটর শহিদুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “আমাদের এখানে সাধারণত কারেন্ট (বিদ্যুৎ) যায় না। তবে যদি কখনো লাইনের কাজ কিংবা অন্য কারণে যায়, তাহলে নোটিশ দিয়ে দেয়। এ ছাড়া এখানে কারেন্ট গেলে ফেস ঘুরিয়ে দেয়। অর্থাৎ, মিন্টো রোডে কারেন্ট গেলে অপজিট লাইন থেকে বিদ্যুৎ আসে, যার নিয়ন্ত্রণ এখানেই আছে। এ ছাড়া এখানে আমাদের নিজস্ব জেনারেটর আছে। যদি কখনো কারেন্ট যায়, সেটা চালু করা হয়।”
রাজধানীর বেইলি রোডের সচিব কোয়ার্টারের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত খোকন জানালেন, ওই এলাকায় বিদ্যুৎ যায় না। গ্যাসও থাকে নিয়মিত। সবিস্তারে জানতে চাইতেই খোকনের পাল্টা প্রশ্ন, “আপনিই কন, এখানে কি কারেন্ট যাইব?”
ডিপিডিসি বলছে ভিন্ন কথা
মিন্টো রোড ও এর আশপাশের এলাকার দায়িত্বে আছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) কাকরাইল জোন। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ওই এলাকায় ৪৮টি বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে।
ডিপিডিসি’র কাকরাইল জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “এবার লোডশেডিংয়ে মন্ত্রী-মিনিস্টার কেউই এর বাইরে নন। কেউ বাদ যাচ্ছে না।”
এই কর্মকর্তা জানান, শুধু হাসপাতালগুলো ছাড়া সব জায়গায় এবার লোডশেডিং হচ্ছে। মন্ত্রী-সচিবদের কোয়ার্টারেও হচ্ছে।
তাহলে মিন্টু রোডের অধিবাসীরা কেন বলছেন যে, সেখানে কারেন্ট যায় না? জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, “বুঝবে কীভাবে? ওখানে তো পিডব্লিউডি’র জেনারেটর আছে। বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই জেনারেটর চালু হয়ে যায়।”
ওই জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে মিন্টো রোডে দিনে কয়বার বিদ্যুৎ যায় জানতে চাইলে তিনি চরচাকে বলেন, “যখন লোডশেডিং হয়, তখন তো এক ঘণ্টা করে হয়।” ওই লোডশেডিংয়ের শিডিউল আগে থেকেই করা থাকে বলেও জানান তিনি।
গত শুক্রবার ডিপিডিসি’র এনওসিএস রমনা জোনের কমপ্লেইন সুপারভাইজার (সিএস) আজাহার আলীর কাছে চরচা জানতে চায় মিন্টো রোডে দিনে কয়বার বিদ্যুৎ যায়। জবাবে তিনি বলেন, “মিন্টো রোডে তো শিডিউল থাকে। অর্থাৎ, লোডশেডিং দেওয়ার আগে নির্ধারিত থাকে যে, কত মেগাওয়াট লোডশেডিং আমরা দেব। তবে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াট কম-বেশি হতে পারে।”
অন্য জায়গার চেয়ে বিদ্যুৎ কি কম যায়–জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, “হ্যাঁ, অন্য জায়গার চেয়ে কম যায়।” তিনি জানান, সেখানে বিদ্যুৎ যাওয়া মেগাওয়াটের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, “আজকে (শুক্রবার লোডশেডিং নেই)।”
মিন্টো রোডে শেষ কবে বিদ্যুৎ গিয়েছে–জানতে চাইলে কিছুক্ষণ নথি দেখে আজহার আলীর উত্তর,“গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুর বেলা বিদ্যুৎ গিয়েছিল; ১ ঘণ্টার জন্য।”