একটা সময় শৈশব ছিল সেই চেনা সুতোর টানে পুতুলের কথা বলায়। স্মৃতির পাতা ওল্টালে আজও কানে বাজে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই জাদুকরী দিনগুলোর কথা। পুতুল চরিত্র পারুল, বাউল ভাই কিংবা শার ভাই—যাদের হাসিকান্নায় শৈশব খুঁজে পেত তার নিজস্ব ভাষা। বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সেই ‘মনের কথা’ কেবল একটি পাপেট শো ছিল না, ছিল এক প্রজন্মের মনের খোরাক।
এরপর এলো ‘সিসিমপুর’—বিদেশি হ্যান্ড পাপেটের ঝলকানি। ইউএইসএইডের সহায়তায় ‘সেসামি স্ট্রিট’-এর বাংলাদেশি সংস্করণ। ১৪ এপ্রিল ২০০৪ পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। ‘সিসিমপুর’–এর জনিপ্রিয় চরিত্র ইকরি, টুকটুকি, হালুম ও শিকুরা যেন গ্রাম বাংলার জীবন্ত শিশুর প্রতিচ্ছবি।
সেখান থেকেই বাঁক বদল। মুস্তাফা মনোয়ারের দেখানো স্বপ্নকে নতুন সময়ের ডিজিটাল ক্যানভাসে এঁকেছেন মিথুন হাসান। জন্ম নিল দুরন্ত টিভির দুই জনপ্রিয় জগৎ—‘খাট্টা মিঠা’ আর ‘অবাক করা গাছের দেশে’। কিন্তু কীভাবে? উত্তরটা দিলেন আজকের দিনের ডিজিটাল পাপেট রূপকার ইউনিভার্সাল পাপেটের স্বত্বাধিকারী মিথুন হাসান নিজেই। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশে পাপেটকে টেলিভিশনে ইন্ট্রোডিউস করেন প্রথম। তার দেখা দেখি বাংলাদেশে পাপেট শিল্পটার বিকাশ ঘটে। তার দেখানো পথ ধরেই এখন আমরা চলতেসি। উনি যেভাবে একটা চরিত্রকে ধরে বাচ্চাদের কাছে পাপেটকে জনপ্রিয় করে তুলে ধরেছিলেন, আমারও আসলে সেরকম একটা স্বপ্নটা ছিল একদম সত্য কথা। টেলিভিশনের জন্য আমাদের দেশের সুতার পুতুল ব্যবহার করে কীভাবে শিশুদের জন্য ক্যারেক্টার বানানো যায়, কীভাবে গল্প তৈরি করা যায়। আমি সেই কাজটাই করে যাচ্ছি।’’
ঐতিহ্যের সুতো থেকে আধুনিক স্ক্রিন—পাপেটের এই যাত্রা থামেনি। মুস্তাফা মনোয়ার যে প্রদীপ জ্বেলেছিলেন, মিথুন হাসান তাতে নতুন তেল জুগিয়েছেন। রঙিন পাপেটের এই মায়াবী জগতের আড়ালেই তো লুকিয়ে আছে আমাদের আগামী প্রজন্মের সুস্থ এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাইতো সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর তাগিদ আর শিশুমনে সুস্থ মানসিক বিকাশের চিন্তা থেকে পথ চলা শুরু মিথুনের। জার্নিটা শুরু হয় ২০১৩/১৪ সালে। মিথুন হাসান বলেন, ‘‘আমার নিজের যখন বাচ্চা হয়, তখন দেখলাম বাচ্চাটা কী দেখে। এর আগেতো বাচ্চাদের সাথে জার্নিটা আমার ছিল না। আমি দেখলাম সে ইন্ডিয়ান, ইংরেজি নানারকম কালচারের যে বাচ্চাদের কার্টুন-কনটেন্ট সেগুলো দেখে। আমি দেখলাম এইগুলা দেখে সে তো এইগুলাই শিখবে স্বাভাবিক। ওদেরতো আমরা খেলার মাঠ থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলো দিতে পারছি না। ওদের একমাত্র মাল্টিমিডিয়া যেমন ফেসবুক ইউটিউব এই জায়গাগুলোই আছে। তখন আমার মনে হলো আমি কিছু বানানো দরকার। কিন্তু কীভাবে? তারপর আমার কাছে পাপেট্রির এই জগৎটা সামনে আসলো। মানুষ দিয়ে কিছু বানানোটা বাচ্চাদের জন্য যতটা আকর্ষণীয় তার চেয়ে পাপেট্রি অনেক বেশি আকর্ষণীয়।’’
‘অবাক করা গাছের দেশে, থাকি সবাই মিলে মিশে’। এ কেবল পাপেট নয়, এ এক রূপকথার রাজ্য! যেখানে গাছ বাঁচাতে লড়াই করে নায়ক ‘সত্য’। পরিবেশ রক্ষায় স্টেথোস্কোপ হাতে তৈরি ডাক্তার ‘কেতলি’। আর অন্যদিকে সবুজ ধ্বংসের চক্রান্তে ব্যস্ত দুই ক্ষতিকর এলিয়েন ‘টোকেন’ ও ‘সিংগু’। গাছের প্রতীকী চরিত্র ল্যাবে তৈরি ‘জিটু’। আর দুই চরিত্র সুর ও তালের প্রতীক ‘তালি-বুলি’ যারা গাছ রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করে গান গেয়ে গেয়ে। আছে মাথায় বুদ্ধি কম রোবটের আদলে বানানো বিশেষ চরিত্র ‘ডিস্টু’।
এই সত্য আর আর কাল্পনিক রূপকথা দিয়ে মিথুন হাসান রচনা করেছেন ‘খাট্টা মিঠা’র ১৫০টি অধ্যায় আর ‘অবাক করা গাছের দেশে’র ৫২টি পর্ব। স্বীকৃতি কিংবা প্রচারের আলো ছাড়াই, শিশুদের মনের গভীর মনস্তত্ত্বকে বদলে দেওয়ার এ এক নীরব মহাযজ্ঞ। মিথুন হাসানের ভাষায়, তুমি মানুষ যখন বানাচ্ছো তার চেহারা দেখে আকৃতি দেখে একটা কোন বৈশ্বিক একটা অঞ্চলের ফরমেটে ফেলতে পারবা। কিন্তু পাপেটের ক্ষেত্রে এইটা একটা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ব্যাপার। পাপেটের যে ভাষা এইটা অটোম্যাটিক ইন্টারন্যাশনাল। সারা বিশ্বে এইটা চলে। আমার একটা স্বপ্ন এই চরিত্রগুলো দিয়ে বৈশ্বিকভাবেই শিশুদের জন্য কনটেন্ট-প্রডাকশন বানানো এবং আমি সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
শিশুদের সুস্থ বিনোদন এবং স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না জানতে চাইলে মিথুন হাসান চরচাকে বলেন, ‘‘আমাদের আসলে এই সেক্টরে কোনো বিনিয়োগ নাই। ব্যবসায়িরা নগদ মুনাফা চায়, যা এইখান থেকে সম্ভব না। কিন্তু ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভাবা রাষ্ট্রেরই একটা দায়িত্ব। আমাদের যারা ছোট শুশু তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাঁদের জন্য এইটা একটা বড় বিনিয়োগ। এর মুনাফা টাকাতে কনভার্ট করা সম্ভব না।’’