স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অংশ নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ দাবিতে বুধবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠকও করেছে দলটি।
নির্বাচন কমিশনের নতুন আইন অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তাদেরকে আগে চাকরি ছাড়তে হবে। প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন এর আগে জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
জামায়াত নেতারা মনে করেন, বিএনপি সরকার আসলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জের’ মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের একটি বড় অংশ শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত, যাদের মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষকরাও রয়েছেন। সমাজে এই শিক্ষকদের বেশ গ্রহণযোগ্যতাও আছে। এ কারণে যদি শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করা যায়, তাহলে জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি ‘সংকট’ তৈরি হতে পারে।
এ কারণটির কথা অবশ্য দলটি নির্বাচন কমিশনে বলেনি। তারা ইসিতে গিয়ে বলেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বাতিল করা হলে, প্রতিটি নাগরিকের রাজনীতি করার যে অধিকারের কথা সংবিধানে বলা আছে, সে অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা হবে।
তবে নাগরিকদের রাজনীতি করার সাংবিধানিক অধিকারের কথা যুক্তি হিসেবে সামনে আনলেও জামায়াতে ইসলামী জানে, তাদের আপত্তির ‘মূল কারণ’ এটাই যে, তাদের দলের সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থীরাই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি সিইসির সঙ্গে জামায়াতের প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ। ছবি: বাসস
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষকদের কেন প্রার্থী হিসেবে চান, সে প্রসঙ্গে যুক্তি তুলে ধরেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বৈঠকের ব্যাপারে পরওয়ার জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কেন প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেটা তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছেন। কী কারণে দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন কী ঘটে গেল– এসব প্রশ্ন তারা কমিশনের কাছে রেখেছেন।
জামায়াত মনে করে, বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত ছিল। কেন দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেটাও নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছে দলটি।
নির্বাচন কমিশন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যুক্তি দেখিয়েছে। তখন জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টি টেনে এনেছে বলে সাংবাদিকদের জানান জামায়াতের সেক্রেটারি পরওয়ার। জাতীয় নির্বাচনে পারলে স্থানীয় নির্বাচনে কেন নয়, কেন এই দ্বৈততা– সেই প্রশ্নও রেখে বিষয়টি রিভিউ করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরের এক নেতা চরচাকে বলছেন, ‘‘এটা (শিক্ষকদের মনোনয়ন) তো এতদিন ছিল। কিন্তু নতুন করে এটা বাদ দেয়া হয়েছে। আসলে সরকারের এমন চিন্তা থাকতে পারে যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকরাই জামায়াতের প্রার্থীদের একটি বড় অংশ। এবং শক্তিশালী অংশ। এটা তো একটা কারণ হতে পারে, এটা অস্বাভাবিক না।”
তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি মনে করছে, শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে জামায়াতের একটি বড় সংখ্যক প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবে না। তারা তো অনেকে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করত। এটা হয়তো সরকার মনে করতে পারে। এরপর নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এ কাজটি করাতে পারে। এটা অস্বাভাবিক না।”
জামায়াতের এই নেতার প্রশ্ন, ‘‘গ্রামে শিক্ষকদের একটি মর্যাদা আছে, সম্মান আছে। এ কারণে সমাজের মূল ধারার নেতৃত্বে তাদেরকে মানুষ ডাকে, অংশগ্রহণ করায়। সেটাই যখন ইউনিয়ন পরিষদে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়, তখন তো সমাজ উপকৃত হয় তাদের দ্বারা। তো শিক্ষিতদের দ্বারা যখন সমাজ উপকৃত হয়, সেটা কেন আমরা বন্ধ করব?”
তবে শিক্ষকরা প্রার্থী হলে জামায়াতে ইসলামীর কী লাভ, জানতে চাইলে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, ‘‘এখানে দলীয় সুবিধার বিষয় না। এটা আমাদের মতামত। যে, শিক্ষকরা তো প্রার্থী ছিল আগে!”
জামায়াতের রাজনীতিতে শিক্ষকরা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বেশ কয়েকটি কারণেই জামায়াতের স্থানীয় রাজনীতিতে শিক্ষকদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারণ হলো, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষকরা অনেক জায়গাতেই সমাজের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তারা মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারেন। এ কারণে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের গুরুত্ব দেয়।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, জামায়াতের রাজনীতিতে শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ পেশাজীবী শ্রেণির প্রভাব বেশি। বিশেষ করে দলটিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মী সংগঠিত করা, সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
তৃতীয় বিষয় হলো, কিছু এলাকায় শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তাদের রাজনীতিতে আনা গেলে দল হিসেবে যে কেউই লাভবান হয়।
দেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ৭ লাখের বেশি শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতের মানুষ। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এমপিওভুক্ত বা নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বা তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। জামায়াতে ইসলামীও শিক্ষকদের দাবির পক্ষেই বিভিন্ন সময়ে থেকেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশেষ করে কিছু মাদ্রাসায় বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রভাব দেখা গেছে, যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে আলোচনাও হয়েছে। তবে এ বিষয়টি অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে ভিন্ন হয়। এই বিষয়টিকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাজে লাগায় জামায়াতে ইসলামী। আর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কমিটি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কাজ করে। ফলে, যে সকল এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বেশি, সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও জামায়াতের প্রভাব প্রতিফলিত হয়।
সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকার বিশ্লেষণ যা বলছে
বিভিন্ন নির্বাচনী তালিকা, স্থানীয় তথ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় মনোনয়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। এরপর রয়েছে ব্যবসায়ী, আইনজীবি, ইমাম, মাওলানা ও আলেম এবং অন্যান্য পেশার মানুষ।
গত ফেব্রুয়ারিতে হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত, এর মধ্যে ২০১ জন উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে ৭৫ জন, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী ছিলেন এমন, যারা বর্তমানে শিক্ষক বা আগে শিক্ষকতা করেছেন। এরপর ছিল ব্যবসায়ীর সংখ্যা– ৬৯ জন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দলটির জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করেই এ তথ্য পাওয়া যায়, যা সে সময় জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থী-তথ্য খতিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি বড় অংশ শিক্ষক– যারা স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। এদের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
যদিও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সব দলের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ছিল। সেই নির্বাচনে প্রথম ধাপের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী প্রায় ১১ শতাংশ, আইনজীবী প্রায় ৬ শতাংশ। শিক্ষক প্রায় ৪ শতাংশ ছিলেন। অবশ্য এটি সব দলের সম্মিলিত চিত্র, শুধু জামায়াতের নয়।
কেন স্থানীয় নির্বাচনে শিক্ষকদের প্রার্থী হিসেবে চায় না সরকার?
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে চাকরিতে থেকে কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। প্রার্থী হওয়ার আগে চাকরি ছাড়তে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষকরা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সমস্যা নেই। কিন্তু পদে থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও নির্বাচনে অংশ নিলে শিক্ষার পরিবেশে ক্ষুণ্ন হবে। কারণ, ওই শিক্ষকরা ফুলটাইম চাকরি করেন, তারা চেয়ারম্যান-মেয়র হলে তো শিক্ষকতা পেশায় সময়ই দিতে পারবেন না!