বৃষ্টির মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের সাদাপাথর এলাকা দেখতে প্রতিদিন আসছেন অসংখ্য পর্যটক। সপ্তাহজুড়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত এই পর্যটন কেন্দ্রটি।
সাদাপাথর এলাকায় ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনার পানি এসে মিশেছে ধলাই নদে। এই জায়গায় অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে প্রাণ জুড়ান পর্যটকরা। তবে এই পর্যটনস্থানে নারীদের পোশাক পরিবর্তনের স্থান, যাতায়াত, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অভিযোগও রয়েছে পর্যটকদের।
সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে বাস বা সিএনজি চালিত অটোরিক্সা করে সাদাপাথর পর্যটন এলাকায় যেতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। সিলেট থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের এই সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই অসংখ্য দর্শনার্থী আসে এখানে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ব্যাপক ‘লুটপাটের’ শিকার হয় ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, যেটি স্থানীয়ভাবে সাদাপাথর নামে পরিচিত। অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় দিন রাতে লুটপাট হয়েছিল এই এলাকায়। ফলে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে ওই এলাকা। সেই সময়ে কিছুকাল পর্যটকদের আনাগোনা কমে গিয়েছিল। সরকারি তৎপরতায় পরে পাথর লুটপাট থামলেও শ্রীহীন হয়ে পড়ে ওই এলাকা।
সিলেট সদর থেকে প্রায় সময়ই সাদাপাথরে ঘুরতে যাওয়া এক দর্শনার্থী বলেন, ওই এলাকায় নারীদের পোশাক পরিবর্তনের জায়গা প্রয়োজন। সরকারিভাবে এ বিষয় তদারকিও দরকার।
সুনামগঞ্জ থেকে সাদাপাথরে বেড়াতে এসে দেবব্রত দীপন নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “নৌকা ঘাট থেকে এখানে আসা পর্যন্ত যে ব্যবস্থা, তারপর শৌচাগার ব্যবস্থা, কাপড় রাখার ব্যবস্থা ও সিকিউরিটির ব্যবস্থাগুলো খুবই দুর্বল। মনে হয় এখানে এসে আমাদের যে উচ্ছ্বাস-আনন্দ, সেটা মিটে যায় এখানকার পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানা পেশার ও ব্যবসার মানুষদের আচরণের কারণে।”
নৌকার ভাড়া নিয়ে অনুযোগ করলেন কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “নৌকা ভাড়াটা বেশি হয়ে যায়। তাছাড়া ঘাটের নিয়মে ৮০০ টাকা করে প্রতি নৌকায় আটজন করে যাওয়া-আসার কথা উল্লেখ করা। তবে ২/৩ জন বেশি থাকলে মাঝিকে বেশি টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে অনেকে। এটা যেমন একরকম দুর্নীতি, তেমনি আমাদের সাথে আসা শিশুদেরও মাথাপিছু ভাড়া দিতে হয়, সেটা বেমানান।”
কিছু কিছু পর্যটকের মতে, পাথর এখনও খুব বেশি নেই। অন্তত লুটপাটের আগে যেমন অনেক পাথর ছিল, তেমন অবস্থা এখনও ফিরে আসেনি। আবার পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। চেয়েছেন এমন পর্যটন এলাকায় প্রশাসনের কড়া নজরদারি ব্যবস্থা। তাতে পর্যটকদের হয়রানি কমবে বলে মনে করেন তারা।
তবে দর্শনার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “দেশের নানা জায়গা থাকি তারা ফুর্তি করার আয়। তারা কিতা টাকা পয়সা না নিয়ে আসে কি? অনেক দর্শনার্থী আছে, বিভিন্ন জিনিস কিনতে গিয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে কিপ্টামি করে বা কায়দা-কানুন করতে চায়। তখন তারার লগে একটি পলিসি করলে কইব সাদাপাথর এলাকার লোকজন ভালা না।”
কাপড় রাখার লকারের তদারকিতে থাকা শামসু নামের এক যুবক বলেন, “সপ্তাহের মধ্যে শুক্র ও শনিবারেই শুধু ব্যবসা হয়। অন্য দিনে তো লোক কম আসে, তাই তেমন কিছুই মেলে না। এ জন্য যা ব্যবসা করার শুক্র-শনিবারে করেই পরিবার চালাতে হয়।”
এদিকে, ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সিলেট অংশের সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম চরচা’কে বলেন, “বর্তমান সরকার পাথর উত্তোলনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। তারা নানাভাবে জরিপ করছে। বিষয় হলো- পাথর উত্তোলনের সুযোগ যখনই দেওয়া হয়, তখনই দেখা যায় যারা পাথর লুটতরাজ করে তারা সুযোগটাকে নানাভাবে কাজে লাগায়। পাথর উত্তোলনের অনুমোদন নেই এমন জায়গায় মেশিন ব্যবহার করে পাথর তোলে।” তবে এসব বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ করার সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন তিনি।
নৌকার ভাড়া নিয়ে পর্যটকদের অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহনী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিন মিয়া বলেন, “২০১৫ সাল থেকে নৌকা ভাড়া ৮০০ টাকা। এখন ২০২৫-২৬ সালে এসে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ঠিক হবে না।”
বাচ্চাদের ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “১০ বছরে আসলে কেউ আর বাচ্চা থাকে না। ৫ বছর পর্যন্ত বাচ্চা। তারপর তারা শিশু হয়ে যায়। আপনি বাসের বা ট্রেনের টিকেট কাটেন, সেখানে বয়স সীমা দেওয়া আছে। এক্ষেত্রে যারা ৫ বছরের নিচে আছে তাদেরকে কনসিডার করা হয়।”
নারীদের পোশাক পরিবর্তনের জায়গায় বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, “ব্যবস্থা আছে, তবে ভবিষ্যতে আরও উন্নত করা হবে।”
পাথর উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সাদাপাথরে বা আশপাশের এলাকায় কোনো পাথর উত্তোলন হচ্ছে না। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে।”