সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সাথে এক নারীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হয়। এই ঘটনার পর নজরুলকে ‘নৈতিক স্খলনের’ দায়ে বহিষ্কার করে তার দল। তখন থেকেই নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নারী হয়রানি, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং পরকীয়ার অভিযোগ কি বাড়ছে? বিভিন্ন সময় নারীদের নিয়ে জামায়াত নেতাদের বক্তব্যও এই প্রশ্নকে আরও উসকে দিচ্ছে।
নারী-সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জামায়াতের দায়িত্বশীলরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা আসে, তার সবকিছুই সত্য নয়। তবে যদি দলের কেউ ‘নারী কেলেঙ্কারিতে’ যুক্ত থাকেন, তাহলে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না।
জামায়াতের তৃণমূল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ‘নারী কেলেঙ্কারির’ রাজনৈতিক মহলেও জোর আলোচনা উঠেছে। গত ২৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, দলের কর্মপরিষদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ৪২ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে নারী-সংক্রান্ত ঘটনায় দলের নারী কর্মীদের তেমন সরব হতে দেখা যায়নি।
কেন দলের নেতা-কর্মীদের ‘নারী কেলেঙ্কারি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আসছে–জানতে চাইলে দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ চরচাকে বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে আপনারা দলের কেন্দ্রীয় মন্তব্য নিলে ভালো হয়। আমি এখনো এ বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত জানি না।”
মারদিয়া বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো তথ্য ভুলও হতে পারে।’’
গণমাধ্যমের খবরের সত্যতা মিলেছে জানানোর পর জামায়াতের এই নারী সংসদ সদস্যকে প্রশ্ন করা হয়, দলে নৈতিক স্খলন ঘটছে বলেই এমনটা হচ্ছে কি না? জবাবে মারদিয়া বলেন, “এ ব্যাপারে তো জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট। জানার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটাও স্পষ্ট। আর নেতা হলে এক কথায়, তাকে ধরা যাচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সকল (অভিযোগ) আসছে সেগুলো তো ভেরিফাই করার মতো নয়। এখানে তো অন্য দলেরও অনেকের (বিষয়ে অভিযোগ) আসছে।”
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আব্দুল খালেক চরচাকে বলেন, “উনার (গাজী নজরুল) বিষয়টি তো দল থেকে কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হয়েছে। তারপরই তো সিদ্ধান্ত হয়েছে।” তিনি বলেন, “আমি বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে কেন্দ্র এটা পর্যালোচনা করেছে।”
শুধু গাজী নজরুল নন, দলটির আরও অনেক নেতার নারী সম্পর্কিত ‘কেলেঙ্কারি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। এ বিষয়ে আবদুল খালেক বলেন, “আমি সারা দেশের কথা বলতে পারব না। তবে ওই (গাজী নজরুল) ঘটনার বিষয়টি আমি আপনাকে বলেছি।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের গণমাধ্যমগুলোয় জামায়াত ও শিবির কর্মীদের নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তত ৫০টির বেশি ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়। এসব মামলার কয়েকটিতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় অবশ্য সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দলটির নেতা-কর্মীদের ঘিরে ‘নারী কেলেঙ্কারি’ বেড়েছে কি না, জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শবাদী দল। ইসলাম ও নৈতিকতার ভিত্তিতে আমাদের দল কাজ করে। আমাদের গঠনতন্ত্র আছে, কারো যদি কোনো ধরনের পদস্খলন হয়, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।”
এহসানুল মাহবুব বলেন, “যখনই জেনেছি, তখনই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা তাকে বহিষ্কার করেছি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন দলের নেতাদের ‘নারী কেলেঙ্কারির’ খবর আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় তো অনেক কিছু আসে। লোকজন তো অনেক কথাই বলেন। অনেক কথাই লেখেন। অনেক সময় আমরা এর ভিত্তিই পাই না। অনেকে বিরোধিতা করেই ছেড়ে দেন, তারা নিজেরাও জানেন না আসলে বিষয়টা কী।”
‘নারী কেলেঙ্কারির’ যত অভিযোগ
গত দেড় বছরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী নারী, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও একাধিক যৌন কেলেঙ্কারি ও সহিংসতার মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। এই দেড় বছরে জামায়াত নেতাদের কর্মকাণ্ড ও নারীদের নিয়ে মন্তব্য দলের ঘোষিত অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এমনকি দলটির নারী-সংক্রান্ত বিশেষ উদ্যোগগুলো নিয়েও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
গত ১১ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকে আদালত কারাগারে পাঠান। অভিযুক্ত আবদুর রহিমের বয়স ৪০ বছর এবং তিনি চর মোহনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। শিশুটির মা গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্তের বাড়িতে তার মেয়েকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে।
গত বছরের ২৮ অক্টোবর দায়ের করা অন্য একটি মামলায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে দুই দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী নারী বালিপাড়া ইউনিয়নের নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে এই মামলাটি করেন।
তখন উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলী হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, নাসির উদ্দিন আগে জামায়াতের ইউনিয়ন আমির ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২০২৩ সালে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বহিষ্কারের কথা বলা হলেও নাসির এখনো দলের ‘রুকন’ পদে আছেন এবং সম্প্রতি জামায়াতের বিভিন্ন সভা ও কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।
শিশুদের ওপর নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতারা আইনের আশ্রয় না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ১৩ অক্টোবর পিরোজপুরের নাজিরপুরে ৭০ বছর বয়সী মো. দিনু ফকিরের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াত নেতারা সেখানে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে ‘মীমাংসা’ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
গত বছরের ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার খোকসায় তৃতীয় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত জামায়াত কর্মীকে নামমাত্র শাস্তি দিয়ে বিষয়টি ‘নিষ্পত্তি’ করার অভিযোগ ওঠে।
একই বছর ২১ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে জামাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। স্থানীয়রা তাকে জামায়াত কর্মী হিসেবে শনাক্ত করে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তিনি অপরাধ স্বীকার করেছেন।
২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীতে এক জামায়াত নেতার মেয়েকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় শিবির নেতা হামিদুল রহমান আজাদকে (২৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, তিনি উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি।
গত বছরের ৬ জুন নাটোরের বড়াইগ্রামে এক নারীর করা মামলায় অভিযোগ করেন, তাকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করে তালাকনামায় সই নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে বড়াইগ্রাম সদর ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ হারুন খানের নাম রয়েছে।
গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুরে ১০ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্ত মোসলেম উদ্দিন (৪২) স্বরূপপুর ইউনিয়ন জামায়াতের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক। ঘটনার সময় স্থানীয় মানুষ তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং মারধরের পর পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
গত ডিসেম্বরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামের সভাপতি নুরুল্লাহর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়ায় তার পদ স্থগিত করে দল। জানা যায়, তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহারসহ অন্যান্য অভিযোগ ওঠে। দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াত তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়।
একই মাসে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় বাড়িতে যৌনকর্মীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে কুয়াকাটা পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মো. আব্দুল হালিমকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়।
গত ৯ জুলাই সাতক্ষীরায় অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে জামায়াত নেতা মোহাম্মদ ফিরোজ শাহ্কে দলীয় পদ ও সাংগঠনিক সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অব্যাহতি পাওয়া ফিরোজ শাহ জামায়াতে বল্লী ইউনিয়ন শাখার যুব ও ক্রীড়া বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন ঘটনাগুলো নিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, “আমরা তো অভিযোগের সত্যতা থাকলে ব্যবস্থা নেই। নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে আমরা এখনো কোনো আপস করিনি, করব না। কোনো ব্যক্তির দায় জামায়াতে ইসলামী নেবে না।”
নারী সম্পর্কিত কেলেঙ্কারির মধ্যে জামায়াত ষড়যন্ত্র দেখে কেন–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যদি প্রমাণিত হয়, তা হলে তো আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। অপপ্রচার হলে তো অবশ্যই সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা তো দেখি কিছু কিছু বিষয় তিল কে তাল করা হয়।”
নারী নিয়ে জামায়াত নেতাদের মন্তব্যেও হয়েছিল তোলপাড়
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি দলের আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা একটি পোস্ট নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেই পোস্টে লেখা ছিল, “আমরা বিশ্বাস করি যে, আধুনিকতার নামে নারীদের যখন ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। এটি পতিতাবৃত্তিরই আরেকটি রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
অবশ্য ওই রাতেই জামায়াতে ইসলামী দাবি করে যে, তাদের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টটি হ্যাকারদের কবলে পড়েছিল। তবে সমালোচকরা বলছেন, ওই পোস্টের আগেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড জামায়াতের নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল।
একই মাসে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো নারী কখনো জামায়াতের সর্বোচ্চ পদে বসতে পারবেন কি না। তিনি পরিষ্কারভাবে উত্তর দেন যে, সেটি ‘সম্ভব নয়’।
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি বরগুনায় একটি নির্বাচনী সভায় জামায়াতের জেলা সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) সাবেক ‘পতিতালয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পরে দলের সব দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে।